মধু মামুন হয়ে ওঠার গল্প

প্রকাশিত:সোমবার, ০৪ জানু ২০২১ ০৭:০১

মধু মামুন হয়ে ওঠার গল্প

 

জাহাঙ্গীর হোসেন জুয়েল কুষ্টিয়া :
সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নানা প্রতিভার অধিকারী মামুনার রশীদ ওরফে মামুন (৪৬)। পিতার নাম মৃত মসলেম উদ্দীন মন্ডল। বাড়ী কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলার ফুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের গেটপাড়া গ্রামে। মামুন যাত্রাপালা, চাপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত গম্ভীরা,পথ নাটক, একক নারী-পুরুষ কন্ঠের গান, হিজড়া অভিনয়ে তার জুড়িমেলা ভার।
মামুনের মেঝ ভাই আর্টিষ্ট জাকিরের হাত ধরেই ক্লাস ওয়ানে পড়ার সময় সাগর সেচা মানিক নাটকে শিশুশিল্পী হিসাবে অভিনয় করার মধ্যদিয়ে তার সাংস্কৃতিক জগতে প্রবেশ ঘটে। সে সময় রাজশাহীর চারুকলায় বড়ভাই জাকিরের অধ্যায়নরত চারুকলার রক্ত গোলাপ নাটকেও শিশুশিল্পী হিসাবে অভিনয় করেছেন। মামুন নাচ মহল এই পৃথিবী টাকার গোলামসহ বেশ কয়েকটি যাত্রাপালায় অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। এরমধ্যে চলতি বছরের ১২ মার্চ কুষ্টিয়া শিল্পকলা একাডেমীতে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগীতামুলক যাত্রাপালায় নাচ মহল ছবিতে অসামান্য অভিনয় করেন। ১৯৮৯ সালে পিতার মৃত্যুর পর মামুনের পড়ালেখা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ সময় সে ব্র্যাকের প্রায় পাঁচ শতাধিক পথ নাটকে অসামান্য অভিনয়শৈলী প্রদর্শণ করে। পথ নাটক থেকে উপার্জিত অর্থদিয়ে পড়ালেখার খরচ যোগাতেন। জীবনের নানা চড়াই উতরায় ডিঙ্গিয়ে অর্থকষ্টকে সঙ্গী করেই মামুন ১৯৯৮ সালে কুষ্টিয়া সরকারী কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে বাংলায় মাষ্টার্স সম্পন্ন করেন। এডুকেশনাল উচ্চতর সনদ হাতে নিয়ে মিরপুরের এক কলেজে প্রভাষক হতে গিয়েও উৎকোচ দেবার অভাবে চাকুরী হয়নি। পরে সে ২০০২ সালে এনজিও দিশায় ক্রেডিট অফিসার পদে যোগদান করেন। পরে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হিসাবে পদন্নতী পেয়ে প্রায় ১০ বছর চাকুরী করেন। সাথে চলতে থাকে পার্টনারশীপে মধু ব্যবসা। ২০১১ সালে চাকুরীকালীন কিডনীতে পাথর দেখা দিলে মামুন ডাঃ মুস্তানজীদের শরনাপন্ন হয়। ডাঃ মুস্তানজীদ তাকে অপারেশনের পরামর্শ দিলে তার অধীনেই মামুনের কিডনীতে পাথর অপারেশন করা হয়। কিন্তু চিকিৎসক মুস্তানজিদের বিরুদ্ধে মামুনের অভিযোগ অপারেশন শেষে পেটের ভিতর গজ ব্যান্ডেজ রেখেই সেলাইকাজ সম্পন্ন করে। ভুল চিকিতসায় মামুন দিনে দিনে যমদুতের দুয়ারের দিকে এগোতে থাকে। পরে দীর্ঘদিন প্রচুর অর্থব্যায়ে কিছুটা উন্নতি হলে দিশার চাকুরী ছেড়ে পুরোপুরিই মধু ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। মামুন বিবাহিত এবং মুন (১১) নামের এক পুত্র ও মিষ্টি (১৪) নামের এক কন্যা সন্তানের জনক। মামুনের স্ত্রী রাশিদা আক্তার মিনুও খুলনা বেতারের আধুনিক ও পল্লীগীতির তালিকাভুক্ত শিল্পী।
অনেকটা শখের বশে মাত্র চারটি মধুর বাক্স কিনে সরিষা ক্ষেতে রাখেন। কিছুদিন পর থেকে তিনি মধু সংগ্রহ শুরু করেন। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকভাবে শুরু করেন মৌ চাষ। এখন তার খামারে কয়েকশ’ মৌমাছির বাক্স। গড়ে তুলেছেন ‘মিষ্টি মৌ-খামার’।
একই সাথে মামুন ও তার বাড়ীর লজিং ছাত্র ঈশ্বরদীর চরকাদিম পাড়ার শাজাহানের সাথে যৌথভাবে ১৯৯৭ সালে গড়ে তোলেন বিশুদ্ধ মধু খামার। মধু সংগ্রহ ও বাজারজাত করে নাম উঠিয়েছেন মধু ব্যবসায়ীর তালিকায়। মধু ব্যবসার সাথে জড়িত হওয়ার কারনে এলাকায় মামুনকে অনেকেই ডাকেন মধু মামুন হিসাবে। ২০১৫ সালে মামুন যৌথ ব্যবসা থেকে বেরিয়ে এসে মেয়ের নামানুসারে গড়ে তুলেছেন মিষ্টি মৌ খামার। শুধু তাই নয় ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারী বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-সাধারন সম্পাদক মাহাবুব-উল-আলম হানিফ এমপির সুপারিশে ও বদান্যতায় মাত্র ৫৮ টাকায় কোন প্রকার উৎকোচ প্রদান ছাড়াই লাভ করেন বিসিকের মধু বাজারজাত করণের লাইসেন্স। মামুনের মিষ্টি মৌ খামারের উৎপাদিত মধু এখন দেশেই ব্যপকভাবে বাজারজাতের পাশাপাশি তার মধু বিদেশেও রপ্তানী হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মামুন বলেন, ‘কৃষি অফিসার আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছে। আমাকে কুষ্টিয়া, চলনবিল, মাদারীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মধু আহরণে যেতে হয়। তাদের কাছ থেকে মৌ বাক্সসহ রানী মৌমাছি এবং মধু আহরণের জন্য একটি পিকআপ পেয়েছি। এছাড়াও উন্নতমানের বাক্সসহ বিভিন্ন সময়ে নানান সুযোগ সুবিধা পেয়েছি।’
মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘উপজেলার মডেল মৌ-খামারি মামুন মধুর চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তার সাফল্য দেখে আরও অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে মধু চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। সাধারণ উপায়ে মধু সংগ্রহ করতে গেলে মান ৪০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। আর মামুনের খামারে প্রযুক্তির ব্যবহার করায় মধুর মান অক্ষুন্ন থাকে।
গত বছর সাড়ে এগারশ’ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছিল। এবছর বারোশ’ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে।
মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিংকন বিশ্বাস বলেন, মিরপুর উপজেলায় তামাকের চাষ ছিল অনেক বেশি। তবে এখন তামাক চাষ কম লক্ষ্য করা গেছে। এখন মাঠজুড়ে হলুদ সরিষা দেখে প্রাণ জুড়িয়ে যায়।

এই সংবাদটি 1,232 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •