Mon. Sep 16th, 2019

BANGLANEWSUS.COM

-ONLINE PORTAL

মহেশখালীতে উন্নয়নের মহাযজ্ঞ

1 min read

কক্সবাজারের উত্তর-পশ্চিমে চকরিয়া উপজেলা পেরিয়ে মহেশখালী দ্বীপ। দ্বীপের তিন দিকে বঙ্গোপসাগর, একদিকে কোহেলিয়া নদী। নদীর ওপর বদরখালী সেতু। সেতুটি দ্বীপকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে বেঁধেছে।

 

মহেশখালীর গা-লাগোয়া অনুদ্বীপ মাতারবাড়ীতে সমুদ্রবন্দর হচ্ছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে মহেশখালী-মাতারবাড়ীর পুরো চেহারা পাল্টে যাচ্ছে—এসব কথা শুনে গত ডিসেম্বর ও মে মাসে দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলাম। সেতু পেরিয়ে অল্প দূরে চালিয়াতলী বাজার। আমার হাতে কাগজ-কলম, সঙ্গীর হাতে ক্যামেরা। চায়ের দোকানে বসতেই মাঝবয়সী একজন দৌড়ে এসে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনারা কি সাংবাদিক?’

 

‘হ্যাঁ’ ঝোঁকে মাথা নাড়তেই ভদ্রলোক পাশে বসে পড়লেন। হাত নাড়িয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে আঞ্চলিক ভাষায় গড়গড়িয়ে বলে চললেন, ‘আমরা এই দ্বীপের আদি বাসিন্দা, জাতে নাথ সম্প্রদায়ের। আমাদের দ্বীপে আমরা থাকতে পারছি না। বড় বড় রাস্তা হচ্ছে, পাহাড় কেটে সমান করা হচ্ছে। বন কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। আমাদের বাড়িঘর সব চলে যাচ্ছে।’

 

উত্তেজিত মানুষটির নাম সুভাষ নাথ। হাজারখানেক বছর আগে পূর্ব ভারতে নাথ সাধনধারা ও সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন বৌদ্ধ আচার্য। মহেশখালীর আদিনাথ মন্দিরের বয়স কয়েক শ বছর। আদি বাসিন্দার দাবিটি সুতরাং জোরালো।

 

সুভাষের পায়ে পায়ে এলেন নুরুল ইসলাম, আকরাম হোসেনসহ আরও কয়েকজন। তাঁদের কথায় একই ক্ষোভ। এসব মানুষের জীবিকা পান, লবণ, বাগদা চিংড়ি, ভেটকি মাছ বা কাঁকড়া চাষ। কিন্তু এখন দ্বীপজুড়ে চলছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়নের মহাযজ্ঞ। চাষের জমি, বাসের জমি—দুই-ই সরকার অধিগ্রহণ করছে।

 

সুভাষ থাকেন মহেশখালীর উত্তর নলবিলা গ্রামের বড়ুয়াপাড়ায়। রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য তাঁর এবং আত্মীয়-পরিজনের ২৪টি ভিটা সরকার অধিগ্রহণ করবে। একটি বেসরকারি সংস্থা পরিবারগুলোর তালিকা করেছে, বলেছে সরকার ক্ষতিপূরণ দেবে। দ্বীপেরই একপাশে তাঁদের পুনর্বাসিত করা হবে। এঁরা কিন্তু ভিটা ছাড়তে চান না।

 

মহেশখালী উপজেলার বড় অংশটিই এই দ্বীপ। দ্বীপজুড়ে বড় রাস্তার দুই পাশে চোখে পড়ে বাগদা, ভেটকি ও কাঁকড়ার ঘের, পানের বরজ আর লবণখেত। বাংলাদেশ লবণ প্রস্তুতকারক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, দেশে বছরে লবণের চাহিদা ১৭ লাখ টন। এর প্রায় অর্ধেক আসে মহেশখালী থেকে। বাদবাকি লবণও আসে কক্সবাজার থেকেই।

 

বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা অঞ্চলটিতে মহেশখালী চ্যানেল, বাঁকখালী, মাতামুহুরি আর কোহেলিয়া নদীর পানি লবণাক্ত। তা দিয়ে বছরে ছয় মাস চলে লবণ উৎপাদন আর বাকি ছয় মাস হয় মাছ-কাঁকড়ার চাষ। মহেশখালীর মিষ্টি পান বিখ্যাত। বেশির ভাগই বিদেশে যায়। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প সংস্থার (বিসিক) হিসাবে, বছরে রপ্তানি হয় প্রায় আড়াই শ কোটি টাকার পান।

 

কিন্তু যেতে যেতে দৃশ্যপট পাল্টে যেতে থাকে। দ্বীপের উত্তরবিলা পাহাড়ের সারি একসময় ঢাকা ছিল ঘন বনে। সে এলাকা এখন ট্রাক আর আজদাহা সব খননযন্ত্রে সরগরম। পাহাড় কেটে রাস্তা হচ্ছে, ভবন উঠছে। অজগরের মতো গ্যাসের পাইপ স্তূপ হয়ে আছে। দেশের একমাত্র এই পাহাড়ি দ্বীপবনে হচ্ছেটা কী?

 

উন্নয়নের মহাযজ্ঞ

দ্বীপে জমি আছে ৮৬ হাজার একর। গত নভেম্বরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সাড়ে ১৯ হাজার একর জমি অধিগ্রহণের হিসাব দিয়েছিল। এর অর্ধেকের বেশি বেজার জন্য। আর অর্ধেকের কিছু কম জমি নিচ্ছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত চারটি সংস্থা। গত জুনের প্রথম সপ্তাহে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেজার একজন শীর্ষ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ইতিমধ্যে বেজার অধিগৃহীত জমিই প্রায় তিন গুণ বেড়ে ২৭ হাজার একর হয়েছে। এসব জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

 

সরকারের বিদ্যুৎবিষয়ক মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪১ সাল নাগাদ সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে মহেশখালীতে—কয়লাভিত্তিক ১২টি, বায়ুভিত্তিক ১টি ও সৌরশক্তির ২টি। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি স্থল টার্মিনাল হবে।

 

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি এখানেই তৈরি করছে দেশের সবচেয়ে বড় তেলের ডিপো। পেট্রোবাংলার একটি প্রতিষ্ঠান (জিটিসিএল) নির্মাণ করছে মহেশখালী ও আনোয়ারা গ্যাস সঞ্চালন লাইন।

 

দ্বীপটির এক-দশমাংশের কিছু বেশি এলাকাজুড়ে বেজা পাঁচটি অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ করছে। তিনটির জন্য জমি অধিগ্রহণ চলছে। মূলত ভারী শিল্পকারখানা হবে। এসব কারখানার কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের থাকার জন্য হবে আবাসিক এলাকা।

 

প্রকল্পগুলোতে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, কুয়েত ও থাইল্যান্ড থেকে বিনিয়োগ আসছে। জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার আওতায় বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট (বিগ-বি) উদ্যোগের আওতায় ইতিমধ্যে মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে বড় দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরু হয়েছে। একটি সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজও এগিয়ে চলেছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ২০২৪ সালে সেটা চালু করার পরিকল্পনা আছে।

 

Copyright © Banglanewsus.com All rights reserved. | Developed By by Positive it USA.

Developed By Positive itUSA