মাথার ওপরের ছাদ চলে গেল

প্রকাশিত:সোমবার, ১৬ নভে ২০২০ ১২:১১

মাথার ওপরের ছাদ চলে গেল

চারপাশের চেনা জগৎটা আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। মানিকদা (সত্যজিৎ রায়), মৃণাল সেন কাকু, তপন সিনহাদের মতো চেনা মানুষগুলো সবাই চলে যাচ্ছেন।

এরপর কাদের সঙ্গে পুরনো দিনের স্মৃতি নিয়ে কথা বলব? এবার তো আমার মাথার ওপর থেকে ছাদটাই চলে গেল। আসলে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, যতটা না আমার সহ-অভিনেতা ছিলেন তার চেয়ে অনেক বেশি অভিভাবক ছিলেন।

 

আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল। দুই পরিবারেই সদস্যদের একই ধরনের নানা সমস্যা নিয়ে আমরা লড়াই করেছি। উনার ছেলে, আমার বোনের একইরকমের অসুস্থতা ছিল।

তাই সেই অভিজ্ঞতা শেয়ার করে ট্রিটমেন্টে কাজে লেগেছে। সংকটে, সমস্যায় তো মানুষ একে অপরের কাছে আসে। উনার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। ভেবেছিলাম, অনেক লড়াইয়ে উনি জিতেছেন, এবারও জিতে ফিরে আসবেন।

তা আর হল না। এ ক্ষতি শুধু আমার নয়, গোটা বাংলা সংস্কৃতি জগতের। অভিনয় করতে গিয়ে পরিচয় হলেও উনি আমাকে ‘বড় ডিরেক্টর’ বলে খেপাতেন।

বলতেন, ‘এই যে বড় ডিরেক্টর, তুমি চলে গেলে আমাদের জুটি তো ভেঙে গেল। আর আমায় তো তোমার ছবিতে কাজই দাও না। কিছু কাজকর্ম করার সুযোগ দাও।’

পরে অবশ্য ওকে ‘পারমিতার একদিন’ ছবিতে নিয়েছিলাম। দুর্দান্ত অভিনয় করেছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের ‘সমাপ্তি’ ছবিতে আমরা প্রথম একসঙ্গে কাজ করেছিলাম।

এক সময় ‘সৌমিত্র কাকা’ বলতাম। পরে সেই কাকাই কবে যে বন্ধু হয়ে গেল বুঝিনি। ভীষণ রুচিশীল, সংস্কৃতিবান ও সাহিত্যচর্চা করা একজন খাঁটি বাঙালি মানুষ ছিলেন।

সত্যজিৎ রায়ের ছবির পর অনেক বছর ওনার সঙ্গে কাজ করা হয়নি। বহু বছর পর সুমন ঘোষের ‘বসু পরিবার’-এর হাত ধরে ফের একসঙ্গে অভিনয় করেছি ‘বহমান’ ছবিতে।

ছবির জন্য আমরা পার্কস্ট্রিটের অক্সফোর্ড বইয়ের দোকানে শুটিং করছিলাম। একটি বই দেখিয়ে ওর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ‘এই বইটি তুমি পড়েছ?’ উত্তর দিল, ‘না পড়া হয়নি।’

আমি ছুটে গিয়ে বইটা কিনে এনে দিলাম। পরে সুমন ঘোষকে বলেছিল, ‘মেয়েটা খুব পড়াশোনা করে। তাই তো আমায় বই কিনে দিল।’

সৌমিত্রর সঙ্গে শুটিংয়ের মজা ছিল, কোথা থেকে সময় চলে যেত বুঝতে পারতাম না। কাজের আনন্দ ছিল। জুনিয়র শিল্পীদের কীভাবে সাহস জোগাতে হয়, কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় সেই ভূমিকায় এই মানুষটি ছিলেন অনুকরণীয়।

আমি জীবনে প্রথমবার যখন ওর সঙ্গে কাজ করতে গিয়েছি, একবারও মনে হয়নি, প্রথম কাজ করছি ওর সঙ্গে। এতটাই আন্তরিক ছিল, এতটাই প্রাণবন্ত ছিল। কোনোদিন কাউকে শুনিনি যে, সৌমিত্র অহমিকা প্রকাশ করেছে।

এটাই ছিল ওর অনবদ্য পারফরম্যান্স। শুটিংয়ে গিয়ে সময় কাটাতে কতবার সেটে আমি জীবনানন্দ বলছি, তো উনি রবীন্দ্রনাথ বলছেন। শুটিংয়ের মধ্যেই নানা ধারার চর্চা হতো, অজস গল্প বলতেন।

কথা শুরু করতেন, ‘সেবার কী হল জানিস, বলে।’ এবার আর কেউ এমন করে পুরনো গল্প বলবেন না, শোনাবেন না বাংলার সংস্কৃতির নানা জগতের কথা।

আসলে উনি যেমন মঞ্চে স্বচ্ছন্দ ছিলেন, তেমনই ছবি আঁকা, আবৃত্তিকার হিসেবে তো সেরার সেরা। ওর ওই গলা আর কেউ কখনও নকল করতে পারবে না।

ওটা ছিল ইউনিক, অদ্বিতীয়। এমন নানা কথা, স্মৃতির পাতায় এত ভিড় করছে যে বলে শেষ করা যাবে না।
লেখক : অভিনেত্রী ও চিত্রপরিচালক

এই সংবাদটি 1,228 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ