মানিকগঞ্জে বন্যায় ৩০ হাজার মানুষ পানি বন্দি, যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত

প্রকাশিত:শুক্রবার, ২৯ জুলা ২০১৬ ০৫:০৭

manikgonj-2

শহিদুল ইসলাম সুজন //
গত কয়েক দিনে থেমে থেমে বৃষ্টি যমুনা – ধলেশ্বরী নদীতে বন্যার পানি বৃদ্ধির ফলে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার বাচামারা, বাঘুটিয়া,চরকাটারী, জিয়নপুর, খলশী,চকমিরপুর,ধামস্বর,কলিয়া এই ৮ টি ইউনিয়নের ৪০ টি গ্রামের নি¤œ অঞ্চল প্লাবিত হয়ে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানি বন্দি,বোনা আমন ১ হাজার হেক্টর,রোপা আমন ৪ হেক্টর,বীজ তলা ১ হেক্টর তলিয়ে গেছে । এদিকে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে বাচামারা, বাঘুটিয়া,চরকাটারী, জিয়নপুর ইউনিয়নের ২৬ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৩ হাজার পরিবারের বাড়ি ঘরে হাটু-কোমড় পানিতে তলিয়ে গেছে । বন্যায় প্লাবিত এলাকায় মানুষের খাদ্য,বিদ্ধ পানি,জ্বালানী লাকড়ি,গো-খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে ।যমুনা ও ধলেশ্বরী নদীতে গত কয়েক দিনে বর্ষার পানি বৃদ্ধি ও নদীর করাল গ্রাসে ভাঙ্গনে ফলে প্রায় ৮ শতাধিক বাড়ি-ঘর ও পাচুরিয় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ,আবাদি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। যমুনা চরাঞ্চলের চরকাটারী ইউনিয়নের নদীর ভাঙ্গনের শিকার এলাকার খেটে খাওয়া মানুষ ঘর বাড়ি জিনিস পত্র নৌকা যোগে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে।ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থ লোক জন যমুনা নদীর চরে নিজের ভিটে মাটি হারিয়ে অন্যের জমির উপর বাড়ি ঘর জিনিস পত্র নিয়ে খোলা আকাঁশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছে। গত এক মাসে যমুনার ভাঙ্গনে দৌলতপুর উপজেলার বাচামারা ইউনিয়নের চুয়াডাঙ্গা,বাচামারা ঘোষপাড়া, কল্যানপুর ,বাচামারা উওর খন্ড,সুবুদ্দিয়া, চরকাটারী ইউনিয়নের কাঠাল তলি, লালপুর ,চরকাটারি ডাক্তার পাড়া, বাগপাড়া, মন্ডলপাড়া, কামার পাড়া, বাঘুটিয়া ইউনিয়নের মুন্সিকান্দি,রাহাত পুর , কাশিদারামপুর ,ব্রামনদী, পুড়ান পাড়া, পারুরিয়া,জিয়নপুর ইউনিয়নের বরটিয়া, লাউতারা, বৈন্যা, আমতলী,আবুডাঙ্গা, খলসী ইউনিয়নের রোহা, পাররোহা,চকমিরপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর,কালিকাবাড়ি এই ২০ টি গ্রামের প্রায় ৮ শতাধিক পরিবারের বসত ভিটা আবাদি জমি জমা বাড়িঘর নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে । সেই সাথে বাচামারা-দৌলতপুর সড়কের বৈন্যা নামক স্থানে প্রায় ৫ শত ফুট পাকা সড়ক নদী গর্ভে বিলীন হওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে- বাচামারা চুয়াডাঙ্গা,বাচামারা ঘোষপাড়া, কল্যানপুর ,বাচামারা উওর খন্ড,সুবুদ্দিয়া ,জিয়নপুর ইউনিয়নের বৈন্যা,চরকাটারী ইউনিয়নের কাঠাল তলি, লালপুর ,চরকাটারি ডাক্তার পাড়া, বাগপাড়া, মন্ডলপাড়া, গ্রামে গত কয়েক দিন যাবৎ নদী পানি বৃদ্ধির ফলে বাড়ি-ঘরে হাটু-কোমড় পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বাড়ি উঠানে মাচা পেতে ও কলাগাছের ভেলায় বাড়ির উঠানে অনেক গৃহবধুকে রান্না করতে দেখা গেছে । পার্শ্ব বর্তী নাগরপুর উপজেলার ফৈজপুর, মাইজাইল সহ চরে আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া যাদের টাকা পয়সা দিকে সচ্ছল তারা নৌকা যোগে আশ্রয়ের খোজে শহরের বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছে।
বাচামরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ জানান- চুয়াডাঙ্গা,বাচামারা ঘোষপাড়া, কল্যানপুর ,বাচামারা উওর খন্ড,সুবুদ্দিয়া গ্রামের ৮ শতাধিক বাড়ি-ঘরে হাটু-কোমড় পানিতে তলিয়ে গেছে । বাচামারা আমেনা খাতুন বালিকা বিদ্যালয়,বাচামরা উচ্চ বিদ্যালয়,বাচামারা বি.বি.সি কলেজে আশ্রয় কেন্দ্রে খোলা হয়েছে । এআশ্রয় কেন্দ্রে কয়েক শত নারী-পুরুষ গরু-ছগল নৌকা যোগে উদ্ধার করে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে । ইতিপূর্বে উপজেলা প্রশাসন বাড়ি ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থ লোকদের ঈদের আগে কিছু চাল বিতরন করেছে । এছাড়া বন্যার পানিতে প্লাবিত পরিবারের বাড়িঘরের নামের তালিকা দেওয়া হয়েছে । তিনি সরকারী-বেসরকারী সংস্থাদের বন্যার্তদের পাশে এগিয়ে আসার আহবান জানান ।
জিয়ন পুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো:বেলায়েত হোসেন জানান- বৈন্যা,আবুডাংগা,ধুলট,বড়টিয়া,লাউতারা এই কয়েকটি গ্রামের বাড়ি ঘরে হাটু-কোমড় পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় ৫ শত পরিবারের মানুষের খাদ্য,বিদ্ধ পানি,জ্বালানী লাকড়ি,গো-খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে ।তিনি আরো জানান- বাচামারা-দৌলতপুর সড়কের বৈন্যা নামক স্থানে প্রায় ১ হাজার ফুট পাকা সড়ক নদী গর্ভে বিলীন হওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে । এদিকে আমতুলী হাই স্কুল,আমতুলী গরু হাট,আমতুলী প্রাথমিক বিদ্যালয়,বৈন্যা পাকা রাস্তা,২/৩টি ব্রীজ ভাঙ্গনের সম্মুখিন হয়ে পরেছে ।
চরকাটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল বারেক জানান- পানি বৃদ্ধির ফলে কাঠাল তলি, লালপুর ,চরকাটারি ডাক্তার পাড়া, বাগপাড়া, মন্ডলপাড়া, কামার পাড়া,এই গ্রামের বাড়ি ঘরে কোমড় পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় ১ হাজার পরিবারের মানুষের খাদ্য,বিদ্ধ পানি,জ্বালানী লাকড়ি,গো-খাদ্য অভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছে । এদিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: খলিলুর রহমান জানান-ন্দ,বোনা আমন ১ হাজার হেক্টর,রোপা আমন ৪ হেক্টর,বীজ তলা ১ হেক্টর তলিয়ে গেছে ।
এছাড়া উজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো: লুৎফর রহমান জানান-নদী ভাঙ্গনের ফলে পাচুরিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে । ২৬ টি স্কুলের ঘরের ভিতর কোড়তে পানিতে তলিযে যাওয়ায় বন্ধ রয়েছে ।
এদিকে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিউর রহমান জানান- বন্যায় নি¤œ অঞ্চল প্লাবিত হওয়ায চরকাটারী,জিয়নপুর এই ২ ইউনিয়নে বন্যার্তদের সাহায্যর্থে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ পেয়েছি । স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে আলাপ করে চার ইউনয়নের আরো ১ হাজার পরিবারের বাড়ি ঘরে পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার তালিকা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছেআরিচায় বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার উপরে যমুনার পানি
যমুনা নদীর মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার আরিচাঘাট পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৪ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এনিয়ে এই পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদী তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে ভাঙন এবং প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চলের ফসলি জমিসহ নতুন নতুন এলাকা। রাস্তা-ঘাট ভেঙ্গে ও ডুবে গিয়ে এসব এলাকার হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বাড়ি-ঘর ডুবে নিম্নাঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির অভাবে পড়েছে অনেক পরিববার। স্থানীয় কৃষকেরা ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।
শিবালয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ রিডার (জিআর) রিমন শিকদার জানান, যমুনা নদীর এ পয়েন্টে গত কয়েকদিন ধরে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত মঙ্গলবার ১৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা (৯.৪০ মিটার) পৌছে।বুধবার আরো ১৪ সেন্টিমিটার এবং বৃহস্পতিবার ১৬ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পায়। এরপর শুক্রবার সকাল নয়টা থেকে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৪ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে ৯.৮৪ মিটারে পৌছেছে।
নদী তীরবর্তী এলাকার জনপ্রতিনিধিরা জানায়, গত ক’দিনে যমুনায় পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে এর শাখা নদী ইছামতি, কালিগঙ্গা, ধলেশ্বরীতে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে দৌলতপুর উপজেলার চরকাটারী, বাঁচামারা, বাঘুটিয়া, জিয়নপুর ও খলসী ইউনিয়নের ইসলামপুর, বাসাইল, মুন্সিকান্দি, জোতকাশি, বেপারীপাড়া, ফকিরপাড়া, রাহাতপুর, চুয়াডাঙ্গা, হাজিপাড়া, কাচারীপাড়া, উত্তরখন্ড, অহেল আলীর পাড়া, গোবিন্দপুর, নকের আলী মাদবরপাড়া, বাঘপাড়া, মন্ডলপাড়া, বড়টিয়া, আমতলী, কাটাখালি ও বৈন্যা এলাকায় কম-বেশি ভাঙন দেখা দিয়েছে। শাখা নদী তীরবর্তী শ্রীধরনগর, কুস্তা, ঘিওর, মাইলাগি, জাবরা, তরা, বেউথা, নয়াকান্দিসহ প্রভৃতি নতুন নতুন এলাকাও পড়েছে ভাঙনের মুখে। অনেক স্থানে বাঁধ ভেঙ্গে নদী তীরবর্তী এলাকাসমূহে পানি ঢুকে পড়েছে। নিমাঞ্চলের অনেক বাড়ি-ঘর ইতোমধ্যেই ডুবে গেছে। ফসল ক্ষেতও প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার দুর্গতদের জন্য সরকারিভাবে কোন ত্রাণ সাহায্যে আসেনি বলেও জানান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
মানিকগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আলিমুজ্জামান মিয়া জানান, বর্ষার পানি এমনিতেই জমির উর্বরা শক্তি বাড়ায়। এই পানি ফসলি জমিতে আসায় পাটের জন্য ভালো হয়েছে। তবে, এই পানিতে রোরো-আমন ধান এক হাজার হেক্টর, রোপার বীজতলার তিন হেক্টর ও পাঁচ হেক্টর শাকসবজি’র জমি ডুবে গেছে। এক সপ্তাহের বেশি এসব ফসল পানিতে ডুবে থাকলে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
মানিকগঞ্জ ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মজিবর রহমান সাংবাদিকদের জানান, নদীসমূহের পানি বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এখনও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। তারপরও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের দুর্গতদের তালিকা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে দ্রুতই দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হবে।#

এই সংবাদটি 1,226 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •