মায়ানমারের হত্যাযজ্ঞে প্রতিবাদী নিউইয়র্কের প্রবাসী বাঙ্গালীরা

প্রকাশিত:শনিবার, ০৩ ডিসে ২০১৬ ০৪:১২

মায়ানমারের হত্যাযজ্ঞে প্রতিবাদী নিউইয়র্কের প্রবাসী বাঙ্গালীরা

jackson-heights-human-chainফয়জুল ইসলাম চৌধুরী নয়ন : ::

মায়ানমারে গণহত্যার প্রতিবাদে নিউইয়র্কের প্রবাসী বাঙ্গালীরা প্রতিবাদী হয়ে উঠেছেন । প্রায় প্রতিদিনই জ্যাকসন হাইটসসহ সিটির বিভিন্ন প্রান্তে নানান কর্মসূচি পালন করেন প্রবাসী বাঙ্গালীরা । বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে মানববন্ধন, পথসভা, দােয়া মাহফিলসহ বিক্ষোভ র্কমসূচি আয়ােজন করছেন, করেছেন । মায়ানমারের সরকার এবং সেনাবাহীনি কর্তৃক গত বেশ কয়েক সপ্তাহ যাবত সেদেশের হত্যা, নির্যাতন, র্ধষণসহ বিকৃত অত্যাচারের প্রতিবাদ করছেন তারা । এসব র্কমসূচিতে কমিউনিটির বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দ ছাড়াও ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবি, ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণী পেশার ব্যক্তিরা অংশ নিচ্ছেন । থেমে নেই মহিলাদের প্রতিবাদও । প্রায় প্রতিটি কর্মসূচিতে মহিলাদের উপস্থিতি ছিলো লক্ষণীয় । প্রতিবাদী কর্মসূচিতে তাদের সকলের দাবি, “একটি বন্ধ করা হউক আধুনিক মানব ইতহিাসের চরম বিকৃত অত্যাচার ।” “কেড়ে নেয়া হউক শান্তিতে নােবেল বিজয়ী মায়ামনার সরকার প্রধান অং সান সুচির নােবেল ।” প্রতিটি কর্মসুচিতে রোহিঙ্গা মুসলিম নারী, পুরুষ, শিশুদের উপর মায়ানমারের সেনাবাহিনীর সময়ের জঘণ্যতম নির্যাতনে নিরব ভুমিকা পালন কারী মায়ানমারের সরকার প্রধানকে আর্ন্তজাতিক বিচারের দাবি জানানো হয় । শান্তিতে নোবেল বিজয়ীর নিষ্ঠুর নিরবতা সবাইকে হতবাক করেছে ।

গত ৩০ নভেম্বর বুধবার দুপুরে নিউইয়র্কের মায়ানমার দুতাবাসের সামনে বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে শত শত প্রবাসী বাঙ্গালীরা মানববন্ধন এবং প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন । বৃষ্টিতে ভিজে আবার ছাতা ব্যবহার করে মায়ানমার সেনাবাহীনি এবং সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন । হাতে নানা দাবি সংবলিত ব্যানার, সাইনবোর্ড, প্ল্যাকার্ড নিয়ে শত শত বাঙ্গালীরা সময়ের জঘণ্যতম হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদ করেন । বাংলাদেশ সোসাইটির বিভিন্ন নেতৃবৃন্দসহ উক্ত প্রতিবাদ কর্মসূচিতে কমিউনিটির নানা শ্রেণীপেশার শতাধিক প্রবাসী উপস্থিত ছিলেন । প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বাংলাদেশ সোসাইটির বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বক্তব্য রাখেন, আইনজীবি মোহাম্মদ এন মজুমদার, সাংবাদিক ইমরান আনসারী প্রমুখ ।
বক্তারা তাদের বক্তব্যে বলেন, মানবতার চরম বিপর্যয় আজ মায়ানমারে । নারী, পুরুষ, শিশু হত্যা, ধর্ষণসহ কোন ঘৃণিত কাজ বাদ রাখেনি মায়ানমার সেনাবাহীনি । মায়ানমারের সরকার প্রধান অং সা সুচির শান্তিতে নোবেল বাতিল করার দাবি করে বক্তারা বলেন, বিশ্ব বিবেককে আজ জাগ্রত হতে হবে । তা না হলে এরকম ঘটনা আরো ঘটবে । দেশে বিদেশের সকল শ্রেণীপেশার জনগণকে যে যার অবস্থান থেকে এর প্রতিবাদ করতে হবে । নিরীহ রােহিঙ্গাদের উপর মায়ানমারের সেনাবাহিনীর বর্বরতা আর হামলাকে এই সময়ের জঘন্যতম, নিকৃষ্ট বলে উল্লেখ করেন ।

mayanmar-consulate-office-2-1আইনজীবি মোহাম্মদ এন মজুমদার বলেন, মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর ওপর সে দেশের বৌদ্ধ মৌলবাদী, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা বর্বর কায়দায় যে গণহত্যা, গুম, অত্যাচার, লুটপাট, জ্বালাও পোড়াওসহ সহিংসতা অব্যাহত রেখেছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও নিন্দনীয়। আমরা জাতিসংঘের সঠিক হস্তক্ষেপ কামনা করি ।

এদিকে মায়ানমার সেনাবাহিনীর এই হত্যা নির্যাতনের প্রতিবাদে জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজার সামনে গত রােববার ২৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় এক বিশাল মানববন্ধন এবং পথসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে । র্নথবঙ্গেল ফউন্ডশেন ইউএসএ ইনক এই পথসভার আয়োজন করে ।

বগুড়া ডিস্ট্রক্টি এসােসিয়েশন ইউএসএ, পাবনা সমিতি ইউএসএ, দিনাজপুর জেলা সমিতি ইউএসএ, প্রবাসী সিরাজগঞ্জবাসী, সিলেট বিভাগ উন্নয়ন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদসহ র্নথবেঙ্গলের ১৬ জেলার প্রায় ২০টি সংগঠন সরাসরি অংশ নেয়। কমিউনিটির প্রায় ৩০ জন অ্যাক্টিভিস্ট প্রতিবাদী বক্তব্য রাখেন।

এতে বাংলাদেশ সােসাইটির বেশ কয়েকজন নেতৃবৃন্দসহ অংশগ্রহণকারী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন । বক্তারা তাদের বক্তব্যে বলেন, মানবতার চরম বির্পযয় আজ মায়ানমারে হচ্ছে । নারী, পুরুষ, শিশু হত্যা, র্ধষণসহ কােন ঘৃণতি কাজ বাদ রাখনি মায়ানমার সেনাবাহীনি ।
সংগঠন সভাপতি আতোয়ারুল আলমের সভাপতিত্বে এতে পরিচালনা করেন, প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এম. আবুল কাশেম। সমাপণী বক্তব্য রাখেন কবি-কথাকার-সাংবাদিক সালেম সুলেরী।

সভায় বিশেষ আলোচক ছিলেন নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রতিনিধি মহিউদ্দিন আহমদ। মিয়ানমারে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি কঠোর আচরণের প্রামাণ্য চিত্র তুলে ধরেন তিনি। বলেন, আরাকানে ১০ লাখ এবং মিয়ানমারের অন্যত্র পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম রয়েছে। মিয়ানমারের মতো পৃথিবীর কোথায়ও আজ ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা এভাবে নিগৃহিত হচ্ছে না। নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্ত সরকার প্রধান এই ন্যাককারজনক কর্মটি ঘটাচ্ছেন। তাই বিশ্ববাসীর দ্রুত শান্তি-পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যার বিচারও করতে হবে। ইসলাম শান্তির ধর্ম। মুসলমানরা হিটলার মুসোলিনীর মতো যুক্তিহীন হত্যাকাণ্ড চালায় না। মায়ানমারে গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী দূর্বার আন্দোলনের আহ্বান করেন তিনি ।

পরদিন ২৮ নভেম্বর সোমবার একাধিক সংগঠন জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজার সামনে প্রতিবাদী মানববন্ধন করে । এতে বক্তারা বলেন, মায়ানমারের মুসলিমদের গণহত্যার বিরুদ্ধে ওআইসি এবং জাতিসংঘ তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য ও সহযোগিতা করুক। কিন্তু জাতিসংঘের এই বিমাতাসূলভ আচরণ মানবাধিকার পরিপন্থি। আজকে সারা বিশ্বে মুসলমানদের জঙ্গিবাদ নাম দিয়ে চিহ্নিত করা হচ্ছে, যার কোন সত্যতা ও ভিত্তি নেই।

mayanmar-genocide-2016-nov-world-human-rightsএদিকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের গণহত্যা ও বর্বরোচিত নির্যাতনের প্রতিবাদে ২৬শে নভেম্বর শনিবার বাদ মাগরিব এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
জ্যামাইকার মসজিদ মিশন (হাজী ক্যাম্প মসজিদ) আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় মাওলানা আতাউর রহমান জালালাবাদীর সভাপতিত্বে ও উক্ত মসজিদের ইমাম ও খতীব হাফেজ রফিকুল ইসলাম পরিচালনায় সভা অনুষ্ঠিত হয় । শুরুতে কুরআনে কারিম থেকে তেলাওয়াত করেন হাফেজ শাহাদাত হোসাইন ও হাফেজ আবদুল কাদির। সূচনা বক্তব্য রাখেন জনাব খুরশিদ আলম।
বক্তব্য রাখেন মাজলিসে শূরা নিউইয়র্ক এর সভাপতি বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা মুহাম্মদ ফায়েক উদ্দীন। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন ইউনাইটেড ইমাম-উলামা কাউন্সিল অফ ইউএসএ ইনক এর চেয়ারম্যান মাওলানা রফিক আহমদ রেফাহী,ব্রুকলীন মসজিদ বেলাল এর খতীব মুফতী মুহাম্মদ আবদুল মালীক,হিউম্যানিটি ক্লাব অফ আমেরিকা ইনক এর উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার শাব্বীর আহমদ, প্রফেসর মুহাম্মদ সালাহ উদ্দীন, ওয়ার্ল্ড রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন ইনক এর প্রেসিডেন্ট মহিউদ্দীন মুহাম্মদ ইউসুফ, মসজিদ মিশন এর সভাপতি জনাব আবদুস সাত্তার, মুনার লিডার জালাল উদ্দিন, হিউম্যানিটি ক্লাব অফ আমেরিকা ইনক-এর প্রেসিডেন্ট রশীদ আহমদ, জামান উদ্দীন ও আবুল কালাম আজাদ।
এছাড়াও আরো উপস্থিত এখন সময় পত্রিকার সম্পাদক কাজী সামছুল হক,ইউনাইটেড ইমাম-উলামা কাউন্সিল এর এসিস্টেন্ট ফাইনেন্স সেক্রেটারী মাওলানা মাসুক আহমদ, মাওলানা মানজুরুল করীম, ইয়র্ক বাংলা’র সহকারী সম্পাদক সাংবাদিক মামুন হাসান,মাওলানা আবদুর রহীম ও মাওলানা মামুনুর রশীদ মারুফ প্রমূখ। প্রতিবাদ সভায় বক্তারা বিশ্বের সকল মানবতাবাদী সংগঠন, সংস্থা ও বিবেকবান মানুষকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিষয়ে প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়ার এবং জনমত তৈরি করার জোর দাবী জানান।সাথে সাথে জীবন নিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলমানদের আশ্রয় দানের জন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্র সমুহ বিশেষ করে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি উদাত্ব আহবান জানান। বক্তারা বলেন, অবিলম্বে মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর ওপর বর্বর অত্যাচার, হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে হবে।

২৮শে নভেম্বর সন্ধ্যায় জ্যাকসন হাইটসে ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস এন্ড ডেভলপমেন্টের প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে । সভায় কমিউনিটির বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ছাড়া আয়োজক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন । বক্তারা বলেন, মায়ানমারের গণহত্যা, কাশ্মীর এবং সিরিয়ার মুসলমানদের নিধনের বর্বর চিত্র, যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদী হামলা সারা বিশ্ববাসীকে মর্মাহত করছে। আমাদের সভ্য জগতে যখন আমরা মঙ্গল গ্রহে বসবাসের চিন্তা করছি, আদিম যুগের বর্বরতাকে মুছে ফেলে মানুষ মানুষের জন্য শ্লোগান দিয়ে একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসার মর্ম বাণী প্রকাশ করছি। সেখানে মায়ানমারের গণহত্যা, কাশ্মীরের মুসলমানের উপর বর্বর অত্যাচার, সিরিয়ায় আইএসআইএস এবং রাশিয়ার বিমান বাহিনী যেভাবে সিরিয়ার হাসপাতালে বোমা মেরে নীরহ-নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করছে, সেই করুন, বর্বর হত্যাজজ্ঞের বিরুদ্ধে আমরা দৃঢ় কণ্ঠে প্রতিবাদ ব্যক্ত করছি। আমরা প্রতিবাদ করছি স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদের বিরুদ্ধেও বিশ্বব্যাপী দূর্বার আন্দোলন, মানব বন্ধন এবং শান্তিপূর্ণভাবে মিছিলের মাধ্যমে এই বর্বরতার অবসান চাই। আমরা উল্লেখ করতে চায় যে, মায়ানমারের মুসলিমদের গণহত্যার বিরুদ্ধে ওআইসি এবং জাতিসংঘ তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য ও সহযোগিতা করুক। কিন্তু জাতিসংঘের এই বিমাতাসূলভ আচরণ মানবাধিকার পরিপন্থি। আজকে সারা বিশ্বে মুসলমানদের জঙ্গিবাদ নাম দিয়ে চিহ্নিত করা হচ্ছে, যার কোন সত্যতা ও ভিত্তি নেই।

এই সংবাদটি 1,228 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ