মুখের জন্য তাবিজ চাই

মঙ্গলবার দুপুর থেকে ফুটপাত ধরে হাঁটছি। এমনিতে নিয়মিতই ফুটপাতে হাঁটি। তখন নজর থাকে বাদামওয়ালার দিকে। খেয়াল রাখি নতুন কোন মওসুমি ফল উঠলো সেদিকে।

 

কখনো কোন মানুষকে চোখে লেগে গেলে মনভরে দেখি। দেয়ালের পোস্টার, লিখন পড়ে যাই । কিন্তু গত দুইদিন ধরে ফুটপাতে তাবিজওয়ালা খুঁজে বেড়াচ্ছি। খুব দরকার।

 

আগেতো মোটামুটি কয়েক গজ পেরোতেই পাওয়া যেতো। ক্যাসেট বাজনা শুনেই তাদের উপস্থিতি টের পাওয়া যেতো। কেউ গান বাজাতেন, কেউ লেকচার বাজাতেন। অডিওর সঙ্গে হাত পা মুখ চালাতেন ইশারা ভাষায়।

 

যার অডিও যন্ত্র কেনার সামর্থ্য নেই তিনি খালি গলায় চিৎকার করে তাবিজের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। কিন্তু এই দুইদিনে গুলিস্তান, ফার্মগেট, নিউমার্কেট, মহাখালী, টঙ্গী, রামপুরা কোথাও ফুটপাতে সেই তাবিজওয়ালা খুঁজে পাচ্ছিনা। আসলে দরকারের সময় প্রয়োজনের জিনিস খুঁজে পাওয়া যে যায় না, এটা সেই প্রচলিত কথারই প্রমাণ। আবার মনে শঙ্কাও দেখা দিয়েছে ব্যবসায় ব্যর্থ হয়ে স্বেচ্ছায় অন্তর্ধানে গেলো না তো?

 

ভাবতে পারেন ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তাবিজওয়ালার খোঁজ করছি। আসলে মোটেও তা নয়। রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্যই খোঁজ করছি তাবিজের। তবে এটাও ভাবছি সঠিক বা কামেল তাবিজওয়ালাকে পাওয়া যাবে কোথায়? ফুটপাতের সবাই যে কামেল মানুষ এমনতো নয়।

 

ওসমানী উদ্যানে একজন তাবিজওয়ালাকে জানতাম, তিনি বেশ কামেল ছিলেন। সচিবালয়ে নানা তদবিরে আসা মানুষ গুলো গেইটের কাছে দাড়িঁয়ে থাকতে থাকতে, করিডোরে হেঁটে জুতোর সুখতলা ক্ষয়করে যখন হতাশ, তখনই ঐ কামেল তাবিজওয়ালার কাছে আসতেন। সেই তাবিজের তদবিরে তাদের মনোবাঞ্ছনা পূরণ হতো বলে শুনেছি বা ফুটপাতে প্রচার রয়েছে। শেষমেষ সেই তাবিজওয়ালার খোঁজ নিয়েও পেলামনা। কি জানি , পার্কে বসে ব্যবসা করতে গিয়ে হয়তো প্রেম পীড়িতির ফাঁদে পড়েছিলেন। সেই প্রেমে ব্যর্থ হয়ে অজানায় পাড়ি দিয়েছেন হয়তো।

 

 

 

বলেছিলাম রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তাবিজ দরকার। জনমঙ্গলে তাবিজ দরকার। কথাটা সত্য। ব্যক্তিগত কোন তদবিরে নয়। রুটি রুজির প্রয়োজনে, পেশাগত বাধ্যবাধকতায় সচিবালয়ের গেইটে, করিডোরে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। সেই সূত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়েও কম বেশি যেতে হয়েছে।

 

এই দপ্তরে যারা যখন দায়িত্বে এসেছেন, তাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সভায়, ব্রিফিং এ বসে শুনতে হয়েছে তাদের বচন। অবাক এবং আশ্চর্য করা বিষয় হলো মানুষ বদলে গেছে, কিন্তু বচনের অমৃত স্বাদের বদল হয়নি। তাদের কথার রসবোধে কোন ঘাটতি দেখছিনা। ভিন্ন ভিন্ন সামিয়ানা থেকে এলেও তারা পৃথিবীকে, সমাজকে এক সরলরেখায় দেখছেন। সহজ ও সরল তাদের জীবন ও সমাজ ভাবনা।

 

জীবন নিয়ে তাদের জটিলতা নেই। কোন কূটকৌশল ও বাঁকা চোখে জীবন ও সমাজকে তারা দেখতে চাননি এবং চান না। তাই সন্ত্রাসীদের ক্রসফায়ারে শিশুর মৃত্যুর পরেও তারা বলতে পেরেছেন-আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে।

 

বিভিন্ন হত্যাকান্ড ও সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসীরা চারপাশে দৃশ্যমান দেখেও তারা বলেছেন-উই আর লুকিং ফর শত্রুজ কিংবা মাটির নিচ থেকে অপরাধী খুঁজে নিয়ে আসবেন। রানাপ্লাজা নকশা বহির্ভূতভাবে নির্মাণের পর ধসে পড়লো। শত শত প্রাণহানি দেখার পর বিচলিত হয়ে তারা বলতে পেরেছেন-কেউ পিলার ধরে ধাক্কা দেবার কারণেই ধসে পড়েছে রানাপ্লাজা।

 

 

 

সাগর-রুনিসহ একের পর এক হত্যাকাণ্ডের পরেও তারা বলতে পারেন-কারো বেডরুমের নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ব তা র বা তাদের নেই। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নিজেদেরই ঘরে ঠিকমতো তালাচাবি দিয়ে বাইরে যেতে হবে। স্বজনদের নিখোঁজ হবার আহাজারী যখন পরিবারে পরিবারে।

 

কেউ লাশ হয়ে ফিরছে, কেউ প্রাণ নিয়ে ফিরলেও মুখের বাক্য হারিয়ে ফিরছেন, আবার অনেক প্রিয়মুখের যখন হদিস নেই, তখনও তারা বলতে পারছেন- প্রেম বা ব্যবসায় ব্যর্থ হয়ে সবাই হারিয়ে যাচ্ছেন। গুম বলে কিছু নেই। এই বচন গুলো শোনার পর মনে হলো আর দেরি করা ঠিক হবেনা। এইবার সচিবালয় পাড়ায় গিয়ে একটি তাবিজ গুঁজে দিয়ে আসতেই হবে। আর সইবার শক্তি নেই যে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *