মুছাপুর ক্লোজার কোম্পানীগঞ্জের সম্ভাবনাময় প্রকল্প

প্রকাশিত:সোমবার, ০১ আগ ২০১৬ ১০:০৮

মুছাপুর ক্লোজার কোম্পানীগঞ্জের সম্ভাবনাময় প্রকল্প

মেছবাহ উদ্দিন, কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী) থেকেঃ নোয়াখালী কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণাঞ্চল দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট ফেনী নদীর উপর নির্মিত মুছাপুর ক্লোজার (নদীর পানি প্রবাহ বন্ধের বিশেষ ব্যবস্থা) সম্ভাবনাময় এক প্রকল্পের বাস্তবায়ন। এর বাস্তবায়নে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)’র হিসেব অনুযায়ী, বছরে অতিরিক্ত ২লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদন হবে এবং রক্ষা পাবে ১ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর জমি। ক্লোজারের কারণে এ এলাকায় লোনা পানি ঢোকা বন্ধ রয়েছে। ফলে এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটতে চলেছে দ্রুত। গড়ে উঠছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কৃষি খামার, মৎস্য চাষ। কয়েক মাস আগে বসত: ভিটা, কৃষি ও মৎস্য খামার হারিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়া কৃষক ও খামারীরা ঘুরে দাঁড়াতে পূর্বের চেয়েও উদ্যমী হয়ে উঠেছে। যাতায়াত সুবিধার কারণে ইতোমধ্যে এলাকাটি’র সুন্দর্য্যে বিমোহিত হয়ে ছুটে আসছে পার্শ্ববর্তী জেলা উপজেলার শত শত দর্শনার্থী। পাশেই রয়েছে বনবিভাগের ৩ হাজার একরের মুছাপুর ফরেস্ট বাগান নামে নয়নাভিরাম বনাঞ্চল। এ বনাঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির গাছগাছালি’র দৃশ্য মনকে দৌলা দেয়। সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি’র আন্তরিক প্রচেষ্টাই এর সফল বাস্তবায়ন। মন্ত্রী এ কাজ সম্পন্ন করতে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী, সচিব পর্যায়ের লোক নিয়ে বারবার সফর করেন। প্রথম দুই ধাপে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন না হলে ক্লোজার এলাকায় সফরে এসে বক্তব্য দিতে গিয়ে মন্ত্রী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কিন্তু হাল ছাড়েননি। তৃতীয় দফায় ১৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এ ক্লোজার সম্পন্ন হলে কোম্পানীগঞ্জ ও ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার সর্বস্তরের মানুষ সরকারের সড়ক, পরিবতন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
“বঙ্গোপসাগরের একবারে কোল ঘেষে হওয়ায় এখানে সুর্যোদয় ও সুর্যাস্ত দেখার আনন্দই আলাদা। আছে নদীর প্রাকৃতিক দৃশ্য, নৌকা ভ্রমণের অসাধারণ আনন্দ-অভিজ্ঞতা, সকালে শান্ত মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ, রাখালের গান, মাঝির গান, পাখির কিচিরমিচির শব্দ, গুরু-মষি-ভেড়ার পালের সুন্দর দৃশ্য, বিকেলে হিমেল হাওয়া সহ নানা গ্রাম্য ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক দৃশ্য মনকে পাগল করে দেয়। মনের হাজারো যন্ত্রণা যেন দূর হয়ে যায়।” এরকমই জানালেন গত শুক্রবার বিকেলে ঘুরে আসা বসুরহাট বাজারের পাদুকা ব্যবসায়ী তানভীর উদ্দিন।
উপজেলার বন বিভাগ কর্মকর্তা প্রধান বন-সংরক্ষক বরাবর এ ক্লোজারটি পর্যটন কেন্দ্র করার জন্য প্রস্তাবনা ইতোমধ্যে পাঠিয়েছেন। এটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটালে সরকারে রাজস্ব আয়ের নতুন খাত তৈরী হবে। সুযোগ হবে দেশের ও দেশের বাহিরের ভ্রমণপিপাসু মানুষের মনের আনন্দ প্রকাশের। ইতোমধ্যে এ দর্শনীয় স্থানে প্রতিদিন ভ্রমণপিপাসু শত শত মানুষের আগমনে সৃষ্টি হচ্ছে চরম যানজট। হইহুল্লোড় আর আনন্দ উল্লাস যেন কাঁটতে চায় না দর্শনার্থীদের।
যেভাবে পৌঁছতে হয়: উপজেলার বসুরহাট থেকে বাংলাবাজার, দক্ষিণে চৌধুরী বাজার পর ২ কিলোমিটার রাস্তা হয়ে চার রাস্তার মোড় দিয়ে পূর্ব দিকে জনতা বাজার এর পর দক্ষিণে দেড় কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে গেলেই মুছাপুর ক্লোজার।
উল্লেখ্য কুমিল্লার কাঁকড়ী নদী থেকে প্রবাহিত সন্দ্বীপ চ্যানেলে পড়া ৮০ কি.মি. দৈর্ঘ্য, ১৮০ মিটার প্রস্থ ও ৭মিটার উচ্চতার এ ছোট ফেনী নদীর গত কয়েক বছরের তীব্র ভাঙনে মুছাপুর, রামপুর, চরফকিরা, চরএলাহী, চরহাজারী ও চরপাবর্তী ইউনিয়নের শত শত পরিবার ঘর-বাড়ি, ফসলী জমি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে। নদীর অব্যাহত ভাঙন থেকে স্কুল, মক্তব, মসজিদ, মন্দির, কিল্লা, বাজার, ধনী-গরীবের ঘর-বাড়ি কিছুই মুক্তি পায়নি। সবচেয়ে কম ¯্রােতের মাস ফেব্রুয়ারিতেও ভাঙন অব্যাত থাকলে সর্বস্ব হারানো মানুষের কান্নায় ভেঙ্গে পড়ার দৃশ্য সাংবাদিক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সকলকে চিন্তিত করে তোলে। এলাকার সাংবাদিকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ‘ছোট হয়ে আসছে কোম্পানীগঞ্জের মানচিত্র’ ‘নদীর ভাঙনে শত শত পরিবার গৃহহারা’ শিরোনামের মত জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা, টিভি ও অন লাইন পত্রিকায় অসংখ্য সংবাদ প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে বিষয়টি। নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী প্রথমে ২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে আইএইচ-এ্যাটকো-ওয়েল (জেভি) ১৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকার চুক্তিতে এর নির্মাণ কাজ শুরু করে। কিন্তু তারা কাজটি সম্পন্ন করতে পারেনি। পরবর্তীতে ২০১২-২০১৩ অর্থ বছরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ডিজেল প্ল্যান্ট লিমিটেড’ (বিডিপিএল) ৪৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা চুক্তিতে দ্বিতীয় দফায় ক্লোজারের কাজ শুরু করে। ওই সময় ক্লোজিং পয়েন্টে একটি জাহাজ ডোবানো হয়। কিন্তু দ্বিতীয় দফায়ও নির্মাণ কাজটিতে সফল হয়নি। পরে জরুরী ভিত্তিতে ২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরের বাজেটের আওতাভুক্ত করতে আরও ১ কোটি ৮৪ লাখ ৯৭ হাজার টাকার চাহিদা পাঠালে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ১৭৩ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করলে তৃতীয় দফায় কাজ শুরু করে সফল হয়। এখন পর্যটক স্থান ঘোষণার দাবী এলাকাবাসীর। এব্যাপারে সরকারের স্বদিচ্ছার প্রত্যাশায় রইল জনগণ।

এই সংবাদটি 1,253 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ