মোবাইল ফোন সাংবাদিকতা

প্রকাশিত:সোমবার, ১২ অক্টো ২০২০ ১১:১০

মোবাইল ফোন সাংবাদিকতা

আল-আমিনঃ বছর চারেক আগে ক্র্যাবের এক সাবেক সভাপতি ট্রিট করে বললেন, ‘খবর কী’। কোথায় গিয়েছিলে আজ? তোমাদের সাংবাদিকতা! তার কথায় মন খারাপতো দুরের কথা, বরং শ্রদ্ধা আসলো। কারণ কয়েকদিন আগে তিনি আশির দশকের সাংবাদিকতার সংবাদ সংগ্রহের ইতিবৃত্ত শুনিয়েছেন। বলেছেন, তাদের সারথিদের ফেলে আসা খবর সংগ্রহের কষ্টের দিনগুলোর কথা। শুনিয়েছেন, সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কতটা কায়েমী স্বার্থবাদীদের রেষানলে পড়তে হয়েছে। শুনালেন একদিনের অভিজ্ঞতার কথা। তখন রাত ১২ টা। মতিঝিলের সংবাদপত্রের অফিসে এক এক অজ্ঞাত ব্যক্তি ফোন করে বললো যে, মগবাজারের নয়াটোলায় ট্রিপল মার্ডার হয়েছে। ওই খবর যখন অফিসে আসে তখন কাগজ বের হওয়ার সময় হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পরে প্রেসে যাবে। সম্পাদক মহোদয় তখন বার্তা সম্পাদককে একজন রিপোর্টারকে ঘটনা¯লে পাঠাতে বললেন। আর সেখান থেকে অফিসে আসার দরকার নেই। সরাসরি রিপোর্টার যেন প্রেসে চলে যায়। বার্তা সম্পাদকের কথা শুনে রিপোর্টারের মাথায় আগুন উঠে গেছে। কিš, কিছুই করার নেই। পেশার স্বার্থে কথা শুনতেই হবে। রুটি-রুজির বিষয়।

রিপোর্টার চলে গেলেন মগবাজারের নয়াটোলা এলাকায়। ঠিাকানা সমস্যার কারণে যে বাসায় মার্ডার হয়েছে ওই বাসায়টি খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। রাত তখন দেড়টা। বেচারা তিনি অফিসে যেতে পারছেন না। কারণ, খবরটি নিয়ে তাকে সরাসরি প্রেসে যেতে হবে। রাত হয়ে গেছে। পত্রিকা বের করতে হবে। আর ঘটনা¯ল থেকে চলে গেলে কাগজে তিন খুনের কাহেনী প্রকাশ পাবে না। খুব চিন্তা ও টেনশনের মধ্যে পড়লেন তিনি। মোবাইল ফোন ছিল না ওই সময়। যোগাযোগের মাধ্যম ছিল শুধু টিএনডি ফোন। ওই সময় তিনি পাশের এক বিদ্যুৎ লাইনের সঙ্গে একটি টেলিফোনের তার দেখতে পেলেন। শীতের রাতে চিৎকার দিয়ে ডাকতে লাগলেন, ভাই কেউ আছেন, কেউ আছেন। অনেকক্ষণ পর নিরাপত্তারক্ষী রাগান্বিত অব¯ায় গেট খুলে বললেন, কী চান এত্ত রাতে? কেন ফোন করা হবে তা ওই প্রতিবেদক নিরাপত্তারক্ষীকে জানালেন। মানবিক নিরাপত্তারক্ষী ফোন করার সুযোগ দিলেন। এরমধ্যে বাড়িওয়ালা নিরাপত্তারক্ষী ও রিপোর্টারকে দুই কথা শুনালেন। এরপর অফিস থেকে বলা হলো মার্ডারের সঠিক পিও। স্পটে গেলেন তিনি। ওই বাড়ির চর্থুত তলায় দুই শিশু সন্তানসহ মাকে গলাকেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। দুর্বৃত্তরা নিয়ে গেছে বাড়ির স্বর্ণালংকারসহ টাকা পয়সা। খবর নিয়ে চলে গেলেন তেজগাঁও প্রেসে। প্রেস থেকে যখন তিনি বের হলেন তখন ভোরের আলো ফুটেছে কেবল। কথাটি বলে তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে গেলেন। অন্য আরেকটি ঘটনা। উত্তরা এলাকায় এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার হয়েছে। ডিএমপির পিআর থেকে সবাই লিখলেন আত্মহত্যা করেছে ওই গৃহবধূ। ৫ দিন পর রিপোর্টার ভাবলেন যে, বিষয়টি কী- জানা দরকার। চলে গেলেন থানায়। কনস্টেবল কথার ফাঁকে ভুল করে ওই প্রতিবেদকে বলে ফেলেছেন যে, সেটি কোন আত্মহত্যা নয়, গৃহবধূকে তার স্বামীকে হত্যা করেছে স্বাম। দৈনিক বাংলায় ৮ কলাম ব্যাপী ছাঁপা হলো সংবাদটি। চারদিকে হইচই পড়ে গেলো।
পাঠক, ডিজিটাল যুগে পরিশ্রমি সাংবাদিক নেই তা বলছি না। তবে আমিসহ অনেকেই অলচ সাংবাদিকে পরিনতো হয়েছি। নিউজের খনি স্পট। সেই স্পট জার্নালিজম কমে গেছে। এখন কোন মার্ডার হলে সাংবাদিকেরা ঘটনা¯লে যান না। মোবাইলে তথ্য জেনে চীপ রিপোর্টারকে দেন। এতে ক্ষতি হচ্ছে, সঠিক তথ্য যেমন পাঠক পাচ্ছে না। জানতে পারছেন না ঘটনার আদ্যোপান্ত। এতে তারা গুজবে বিশ্বাসী হচ্ছেন। পত্রিকা থেকে মুখ ফিরিয়েং নিচ্ছেন। বিষয়টি যে কত ভয়াবহ তা বুঝতেই পারছেন। একদিন লোকাল বাসে এক যাত্রীকে শুনতে শুনলাম একটি বড় ঘটনা ঘটেছে। অন্য যাত্রী বললেন যে, ফেসবুকে ওই ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে না কী? না পেলে সেটি কোন ঘটনা না। বাসের মধ্যে আমি উপ¯িত। কিš, একজন সাংবাদিক হিসাবে কোন কিছু বলতে পারলাম না। কারণ এরজন্য আমরা সাংবাদিকেরাই দায়ী। তার সব সাংবাদিককে স্পট জার্নালিজমের ওপর নির্ভর হতে হবে। মানুষের কাছাকাছি যেতে হবে। তাদের সুখ ও দু:খ্যকে তুলে ধরতে হবে। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে ঠিকই। কিš, মূল কাজকে ফাঁকি দিয়ে নয়। তাই সবাইকে সেই লড়াকু এবং ক্ষুরধার সাংবাদিকতা করার আহŸান জানাচ্ছি। সকলকে রক্তিম অভিবাদন।

লেখক, স্টাফ রিপোর্টার, (ক্রাইম) দৈনিক মানবজমিন ও ¯স্থায়ী সদস্য (ক্র্যাব)

এই সংবাদটি 1,231 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •