যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসের প্রকোপ এত বেশি কেন?

প্রকাশিত:বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২০ ০২:০৬

যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাসের প্রকোপ এত বেশি কেন?

সাঈদ ইফতেখার আহমেদ:১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে বিশ্বে একক পরাশক্তির দাবিদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সর্ব সাম্প্রতিক রাশিয়ার পুনরুত্থান এবং গণচীনের উত্থানের আগ পর্যন্ত বেশ দীর্ঘ একটা সময় সামরিক, বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক বা প্রযুক্তিগতভাবে এ রাষ্ট্রটিকে চ্যালেঞ্জ করবার মত কেউ ছিল না। শীতল যুদ্ধের সময়ও এ দেশটি প্রতিদ্বন্দ্বী সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে নানাভাবে এগিয়ে ছিল বলে মনে করা হত। বর্তমানেও জিডিপির হিসাবে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এবং একই সাথে সবচেয়ে ঋণী রাষ্ট্রও।

এ ধনী রাষ্ট্রটিতে বিশ্বের সর্বাধুনিক চিকিৎসা পরিষেবা রয়েছে বলে মনে করা হয়। বিশ্বের নানা প্রান্ত, বিশেষত উন্নয়নশীল দেশ থেকে প্রতি বছর বহু মানুষ এ দেশটিতে বিপুল অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন। জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাবার বিধান থাকবার ফলে বাংলাদেশসহ অনেক দেশ থেকে কিছু উচ্চবিত্ত নারীকে সন্তান জন্ম দেবার সময় আমেরিকা ছুটে আসতে দেখা যায়।

মনোজগতে ঔপনিবেশিক মানসিকতা আমাদের মত দরিদ্র দেশগুলিতে অনেকেই ধারণ করেন। এ মানসিকতার ধারক সমাজের উচ্চ থেকে নিম্নবিত্ত যেমন রয়েছে, তেমন রয়েছে চেতনাগতভাবে সবচেয়ে অগ্রসর দাবীদার বুদ্ধিজীবী সমাজের মাঝেও।

এ চেতনার ধারকরা পাশ্চাত্যেকে সর্ব বিষয়ে “স্বর্গ” জ্ঞান করেন। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন থেকে মানবিকতা, গণতন্ত্র, চিকিৎসা পরিষেবা, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ পাশ্চাত্যের হেন কোন বিষয় নেই যা তাদের বিস্মিত করে না। তাদের কাছে পাশ্চাত্যের সব কিছুই ভালো, আর প্রাচ্যের প্রায় সবই খারাপ। পাশ্চাত্যের নেতৃস্থানীয় দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান মনে করে তারা দেশটিকে অনেকটা স্রষ্টার পরেই স্থান দেন।

পাশ্চাত্যের মূল ধারার প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া তাদের এ মানসিকতা বাঁচিয়ে রাখবার জন্য এ সংক্রান্ত ধারণার ক্রমাগত উৎপাদন এবং পুনরুৎপাদন করে থাকে। ফলে শুধু বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের জনগণই নয় ইউরোপীয়দের মাঝেও মার্কিনিদের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে জোরালো ধারণা বিদ্যমান। এমনকি খোদ মার্কিনিরাও নিজেদের সম্পর্কে এভাবে ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে।

দীর্ঘদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে দেখেছি, এ ভাবনাটা শুধু ডান বা দক্ষিণপন্থী ধারার লোকজনই ধারণ করেন তা কিন্তু নয়। বাম, প্রগতিশীল বা মার্কসবাদী হিসেবে যারা নিজেদের পরিচয় দেন, তারাও অবচেতনভাবে নিজেদেরকে অন্য দেশের জনগোষ্ঠীর তুলনায় শ্রেষ্ঠ ভাবেন।

বস্তুত এ ধরনের মানসিকতার ফলেই বিশ্বের অনেকে এটা ধরে বসেছিলেন যে, করোনাভাইরাস যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমিত হলেও তারা সেটা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারবে। গণচীনের মত বেগ তাদেরকে পেতে হবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল এর বিপরীত চিত্র।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে সবচেয়ে অগ্রসর দাবীদার দেশটির করোনা সংক্রমণের সংখ্যা এবং হার বিশ্বের যে কোন দেশের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু এক নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যেই যে পরিমাণ মানুষ করোনাতে আক্রান্ত হয়েছেন, সে পরিমাণ মানুষ বিশ্বের অন্য কোন দেশে হননি। মৃত্যুর সংখ্যা এবং হারের দিক থেকেও এ দেশটি এখন অন্যদেরকে অতিক্রম করে গেছে।

সরকারের ঘোষিত হারের চেয়ে প্রকৃত মৃত্যুর হার আরো অধিক বলে অনেকের ধারণা। কেননা, হাসপাতালগুলি আক্রান্তের চাপ মোকাবেলা করতে না পেরে অনেককে সুস্থ হবার আগেই বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এরা যখন বাড়ীতে যেয়ে মারা যাচ্ছেন তখন তাঁদেরকে আর এ মৃত্যুর তালিকায় রাখা হচ্ছে না। এদের মধ্যে অন্তত ছয়জন বাংলাদেশী অভিবাসী রয়েছেন, যারা সুস্থ্য হবার আগেই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাসায় যেয়ে মারা গেছেন। এদেরকে ধরে এ পর্যন্ত করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন  কমপক্ষে ১৪০ জন বাংলাদেশী।

এ বাংলাদেশিদের কয়েকজন বাদে সবাই ছিলেন নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা। দেখা যাচ্ছে জনসংখ্যার সংখ্যানুপাতে অধিক হারে আক্রান্ত হচ্ছেন বাংলাদেশি এবং কৃষ্ণাঙ্গরা। অনুমান করা হচ্ছে কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ হাজার বাংলাদেশি কোভিড ১৯ এ আক্রান্ত হয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ার আরো দুটি দেশ ভারত এবং পাকিস্তানি অভিবাসীদের বাংলাদেশীদের তুলনায় আক্রান্ত এবং মারা যাবার সংখ্যা এবং অনুপাত কম। শতাধিক বাংলাদেশীর বিপরীতে ভারতীয় এবং পাকিস্তানিদের মৃত্যুর সংখ্যা এ নিবন্ধ লেখাকালীন সময়ে যথাক্রমে ৪৫ এবং ১১৫।

নিউ ইয়র্কে আনুমানিক কয়েক লাখ বাংলাদেশীর বাস। এদের বড় অংশটিই থাকেন দরিদ্র অঞ্চলগুলিতে। দেখা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যারা কোভিড ১৯ এ আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের বড় অংশটি হয় দরিদ্র অথবা দরিদ্র অঞ্চলের বাসিন্দা।

কল্পনার স্বপ্নের দেশ আমেরিকার বাস্তবতা হল এ দেশে আগমনকারী ৯০ শতাংশ বাংলাদেশিকে বেঁচে থাকবার জন্য কঠিন জীবন সংগ্রামে লিপ্ত থাকতে হয়। এ জীবন সংগ্রামটি তারা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে করেন না। প্রছন্ন বর্ণ বৈষম্যবাদের প্রবল উপস্থিতি দেশটির সর্বত্র। ফলে দেশটির সমস্ত সুযোগ সুবিধাই এখন পর্যন্ত শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী কেন্দ্রিক।

দেশটিতে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থেকে চাকরি সব জায়গাতে আবেদনপত্রের সাথে যুক্ত করতে হয় তিনটা সুপারিশপত্র। সুপারিশপত্র যুক্ত করতে না পারলে একজন চাকরি প্রার্থী বা ছাত্র যতই যোগ্য হন না কেন, তার আবেদনপত্র অসম্পূর্ণ গণ্য হয়ে বাতিল হয়ে যায়।

চাকরি বা ভর্তি ইতাদির ক্ষেত্রে দেখা যায় যার সুপারিশপত্রের জোর বেশি তিনি অগ্রাধিকার পান। শিক্ষা, ব্যবসা, চাকরি, রাজনীতি সব জায়গাতেই শ্বেতাঙ্গদের একচেটিয়া প্রাধান্যের ফলে শ্বেতাঙ্গ প্রার্থীরা সুপারিশপত্র পাবার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে থকেন। এতে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক অশ্বেতাঙ্গ এবং অভিবাসী ভালো চাকরি পান না, বা তাদের ছেলেমেয়েরা ভালো কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেন না।

এ ব্যবস্থায় অনেক অযোগ্য ব্যক্তি শুধু সাদা গাত্র বর্ণ ধারণ করবার জন্য ভালো পদে আসীন হয়ে যান বা ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ভর্তি হতে পারেন। অর্থাৎ নিয়োগ, ভর্তি ইত্যাদির ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতিকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছে, যার সুবিধাভোগী হল শ্বেতাঙ্গরা।

তুলনামূলক বিচারে সুবিধাভোগী শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় বাংলাদেশি অভিবাসীসহ অশ্বেতাঙ্গ দরিদ্র হওয়ায় তাঁদের উল্লেখযোগ্য অংশের পক্ষেই এ দেশে স্বাস্থ্য সেবা পাওয়া দুরুহ। পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ বিকশিত এ দেশটিতে চিকিৎসা এবং শিক্ষাকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসাবে গণ্য করা হয়না। ফলে, এ খাত দুটি এখানে মুনাফা অর্জনের ক্ষেত্র।

চিকিৎসা ব্যবস্থা পুরোটাই এখানে পরিচালিত হয় কর্পোরেট ব্যবস্থাপনায়। পাশাপাশি চিকিৎসকদের কাছ থেকে চিকিৎসা সেবা নেবার ব্যবস্থার পুরোটাই ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর হাতে জিম্মি। বীমা কোম্পানিগুলো মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় খুবই শক্তিশালী এবং এদের সাথে মূলধারার মিডিয়া এবং রাজনীতিবিদরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে এখানে কোনও রাজনীতিবিদ বা মিডিয়া, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর হাত থেকে মুক্ত করে, সমস্ত জনগণের স্বাস্থ্য সেবা পাবার অধিকার নিশ্চিত করবার কথা বলে না। বার্নি স্যান্ডার্স সাহস করে স্বাস্থ্য খাতকে জাতীয়করণ করবার কথা বলাতে তাকে নানা কৌশলে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবার দৌড় থেকে বাদ দেওয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে একজনকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা সেবা পেতে হলে তাকে তিনটা ইন্স্যুরেন্স কিনতে হয়—তার শরীরের জন্য একটা, বাকি দুটো চোখ এবং দাঁতের জন্য। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তিকে এখানে প্রতি মাসে তিনটা ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম দিয়ে যেতে হয়।

অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর পক্ষে পরিবারের সব সদ্যস্যের জন্য তিনটা ইন্স্যুরেন্স কেনা সম্ভব হয় না। অনেকে এখানে শুধু সন্তানদের জন্য ইন্স্যুরেন্স কেনেন, নিজেরা ইন্স্যুরেন্সবিহীন অবস্থায় ভাগ্যের উপর নির্ভর করে থাকেন। দেশটিতে প্রায় তিন কোটি লোক আছেন, যাদের কোনও রকম ইন্স্যুরেন্সই নেই।

এ ইন্স্যুরেন্স না থাকবার ফলে প্রথম যখন করোনাভাইরাস সংক্রমণ ছড়াতে থাকে, তখন অনেকে লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা করাতে যেতে পারেননি। পরে যখন সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করতে থাকে, তখন পরীক্ষা ফি মওকুফ করে দেওয়া হয়। কিন্তু, মওকুফ করা হয়নি চিকিৎসা ফি। ফলে অনেকেই টাকার অভাবে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হন নাই। আবার হাসপাতালগুলোতে যখন রোগী উপচে পড়তে শুরু করল, তখন কম লক্ষণযুক্ত রোগীদের হাসাপাতালে না এসে বাসায় বসে চিকিৎসা নিতে বলা হয়।

কৃষ্ণাঙ্গ, অভিবাসীসহ আমেরিকাতে যারা দরিদ্র, তারা ছোট বাসায় এক সাথে অনেকে বাস করেন। কেননা, উচ্চহারে বাসা ভাড়া দেবার সামর্থ্য তাদের নেই। এছাড়া গৃহহীন মানুষদের জন্য যে সমস্ত আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে, সেখানেও ছোট জায়গায় এক সাথে অনেককে রাখা হয়। আবার অনেকটা বস্তির মত, আমেরিকানরা যেটাকে বলেন “ঘেটো,” সেখানেও অনেকে অল্প জায়গায় গাদাগাদি করে থাকেন। ফলে, অপেক্ষাকৃত কম লক্ষণযুক্ত আক্রান্তদের যখন বলা হল বাসায় থেকে চিকিৎসা নেবার জন্য, তখন তাদের অনেকের পক্ষেই হোম কোয়ারেন্টিন বা সেলফ আইসোলেশনের নিয়ম মেনে চলা সম্ভব হয়নি। এতে, দাবানলের মত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে ছড়িয়ে পড়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সিয়াটলে প্রথম শনাক্ত হবার পর করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা এক হাজারে উন্নীত হতে সময় লেগেছিল ৫০দিন। এ ৫০দিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্রমাগত বলে গেছেন সব কিছু তাঁর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সব কিছু সহসা ঠিক হয়ে যাবে। এক সপ্তাহ পরেই ১ হাজার সংখ্যাটি ৫ হাজার হয়ে যায়। এরপর করোনাভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ফলে, সমন্বয়হীন মার্কিন প্রশাসনের নিয়তির উপর ভরসাই করোনাভাইরাসের নিয়ন্ত্রণের একমাত্র স্ট্র্যাটেজি হয়ে দাঁড়ায়। অদক্ষ প্রশাসনের পক্ষে প্রাথমিক অবস্থায় গণচীনের উদাহারণ থাকা সত্ত্বেও, করোনার মাত্রার ভয়াবহতা এবং ব্যাপকতা বোঝা সম্ভব হয়নি।

আর বুঝতে না পারবার ফলেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, গভর্নর এবং মেয়ররা এ বিস্তারের জন্য একে অপরকে দায়ী করে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে চাচ্ছেন। অন্যদিকে, ফেডারেল বা কেন্দ্রিয় সরকারের সাথেও দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে রাজ্য সরকারগুলির। পাশাপাশি সংকট মোকাবেলার ব্যর্থতা চাপান হচ্ছে গণচীনের উপরেও। মূলধারার মিডিয়া আবার এর সাথে সুর মিলাচ্ছে।

চীনের বিষয়ে প্রধান অভিযোগ হল তারা করোনাভাইরাসে মৃত্যু এবং সংক্রমণের সঠিক সংখ্যা জানায়নি। সংক্রমণের সঠিক সংখ্যা জানা থাকলে ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারত। অর্থাৎ, ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে অল্প সময়ের মধ্যে  চীনে ৩ হাজারের অধিক লোকের প্রাণহানি কোন বড় বিষয় নয়। দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হলে সংখ্যাটা আরো বড় হওয়ার দরকার ছিল। তাহলে, চীনের সরকারী তথ্যের উপর ভিত্তি করেই থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, কিউবা, কম্বোডিয়া, লাওসসহ আরো কিছু দেশ করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সফল হল কী করে, এ প্রশ্ন মূলধারারা মিডিয়া এবং রাজনীতিবিদরা তুলছেন না।

যে সংখ্যা নিয়ে এত প্রশ্ন সে সংখ্যাটা তাহলে কত? সে সংখ্যাটাও বলে দিচ্ছে মার্কিন মিডিয়া। ওয়াশিংটন পোস্টের মতে কম করে হলেও চীনে ৪৭ হাজার লোক মারা গেছে। এ সংখ্যাটা সঠিক ধরে নেওয়া হয়, আক্রান্তের সংখ্যা তাহলে চীন সরকার ঘোষিত ৮২ হাজারের চেয়ে আরো অনেক বেশি হবার কথা। আর তাই যদি হয়ে থাকে, চীন এত অধিক সংখ্যক আক্রান্তকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে দ্রুত দেশকে অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসতে পারলেও আমেরিকা কেন পারছে না, এ প্রশ্নটি সেখানে উত্থাপন করা হচ্ছে না। পাশাপাশি এটাও জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে না, চীন সংক্রমণের বিস্তার মোটামুটি হুবেই প্রদেশে সীমাবদ্ধ রাখতে পারলেও যুক্তরাষ্ট্রে কেন সেটি সব অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। মূলধারার মিডিয়া এবং সিভিল সোসাইটির লোকজন অবাক হচ্ছেন এ ভেবে যে, বিশ্বের “শ্রেষ্ঠ” চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও পাশ্চাত্যের দেশগুলির তুলনায়—যাদের দেয়া তথ্য তাঁরা বিশ্বাস করেন—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যু এবং আক্রান্তের হার এত অধিক কেন!

সংক্রমণের বিস্তার যত ঘটছে মার্কিন অর্থনীতি নিমজ্জিত হচ্ছে তত সংকটে। এরই মধ্যে চাকরি হারিয়েছেন ১ কোটি ৭০ লাখের এর অধিক নাগরিক। স্যুপ কিচেন বা লঙ্গরখানার সামনে খাদ্যহীন মানুষের সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘায়িত হচ্ছে। অপরদিকে, বাজারে সরবরাহ না করতে পেরে কৃষকরা নষ্ট করে ফেলছেন শস্য। দুগ্ধ খামারিরা ফেলে দিচ্ছেন দুধ। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশটিতে প্রবল খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে বলে অনেক মনে করছেন।

বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের কিছুটা ঘাটতি থকালেও মূল ঘাটতি চিকিৎসা সামগ্রীর। ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার বাজার থেকে সম্পূর্ণ উধাও। হাসপাতালগুলোতে ভেন্টিলেটর, পিপিই, গ্লাভস, মাস্ক এসবের প্রচণ্ড অভাব। ফলে সহস্রাধিক স্বাস্থ্যকর্মী ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন কোভিড ১৯ এ। অন্য যেকোনও রাষ্ট্রের চেয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অতি উচ্চ মৃত্যু হারের মূল কারণ হাসপাতালগুলোর আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে না পারা, বিশেষত ভেন্টিলেটরের প্রচণ্ড সংকট থাকা।

হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী না থাকবার কথা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথমে বিশ্বাস করেন নাই। তিনি মনে করেছেন, হয় ডাক্তাররা মিথ্যা কথা বলছেন, নাহয় তারা নিজেরাই সেগুলি পাচার করে দিয়েছেন। এদিকে দেখা যাচ্ছে, চিকিৎসা সামগ্রীর প্রচণ্ড সংকট মোকাবেলা করবার জন্য, আমেরিকার মত শিল্পোন্নত দেশ সেগুলি উৎপাদন করে চাহিদার জোগান দিতে পারছে না। বিশ্বের সবচেয়ে বিকশিত পুঁজিবাদী অর্থনীতির এ দুরাবস্থা, সংকট সময়ে এ অর্থনীতি গণমানুষের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম কিনা, এ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসছে।

সংকট উত্তরণের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২ ট্রিলিয়ন ডলারের উপর প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। এ প্যাকেজের সিংহভাগটাই যাবে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলির পকেটে। জাতীয় দুর্যোগকে এ প্রতিষ্ঠানগুলি দেখছে রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বাগিয়ে নেবার মওকা হিসেবে। মার্কিন রাষ্ট্রযন্ত্রকে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলি এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে, সরকারের পক্ষে তাদেরকে সুবিধা না দেওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্পও নেই। মার্কিন রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলি এরকম একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্য, যুক্তরাষ্ট্রে বাম ধারার রাষ্ট্রচিন্তকরা আমেরিকাতে গণতন্ত্রের নামে আসলে “কর্পোরেট ফ্যাসিজম” চালু আছে বলে মনে করেন। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলি প্রণোদনা প্যাকেজের সিংহভাগ সুবিধা পেলেও কোন সুবিধা পাবেন না “অবৈধ” অভিবাসীরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের অভিবাসীর সংখ্যা কমপক্ষে ১ কোটি ২০ লাখ। এ দুর্যোগের সময়ে সবচেয়ে খারাপ আছেন এ অভিবাসীরা।

রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাটিক দুটি রাজনৈতিক দলই দশকের পর দশক ধরে এ বিপুল জনগোষ্ঠীর অসহায়ত্ব নিয়ে রাজনীতি করে গেছে কর্পোরেট আমেরিকার স্বার্থে। নিউ ইয়র্কসহ আমেরিকার অনেকগুলি শহরকে এদের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে “Sanctuary city” হিসাবে, যেখানে তারা কাজ করতে পারবেন। এজন্য পুলিশ বা কেন্দ্রীয় সরকার তাঁদের কোন ঝামেলা করবে না।

এ সমস্ত শহরে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের “অবৈধ” অবস্থার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত স্বল্প মজুরিতে তাদেরকে কাজে নিয়োগ করে বিপুল মুনাফা করে যাচ্ছে। বস্তুত এ সমস্ত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিকে সুবিধা দেবার জন্য, “অবৈধ” অভিবাসীদের বিষয়ে দশকের পর দশক ধরে কোন সরকারই সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে অনেক মার্কিন রাষ্ট্রচিন্তক মনে করেন। এ সমস্ত অভিবাসীদের চিকিৎসা সামর্থ্য না থাকা এবং স্বল্প পরিসরে অনেকে এক সাথে থাকবার ফলে এদের মাঝে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঘটছে খুব দ্রুত।

এ দ্রুত বিস্তার ঘটবার আরো কারণ হল মার্কিন জনগোষ্ঠীর একটা উল্লেখযোগ্য অংশের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখবার বিধান মেনে না চলবার প্রবণতা। এ প্রবণতা মার্কিনিদের পাশাপাশি নিউ ইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি অভিবাসীদের মাঝেও দেখা গেছে। এটি করোনাভাইরাসের জনসংখ্যার অসমানুপাতিক হারে বাংলাদেশিদের অধিক আক্রান্তের কারণ বলে অনেকে মনে করছেন।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে শুরু থেকেই মার্কিন প্রশাসনকে সিদ্ধান্তহীনতা,পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে না পারা, এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা ইত্যাদি নানা সমস্যায় ভুগতে দেখা যাচ্ছে। এর পাশাপাশি লকডাউন মডেল চীন উদ্ভাবিত বলে এ সম্পর্কে একটা উন্নাসিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে মার্কিন প্রশাসনের। নিউ ইয়র্কের ডেমোক্র্যাটিক দলের গভর্নর এবং মেয়র উভয়েই লকডাউন মডেলের বিরুদ্ধে শুরুতে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। ট্রাম্পকে এ ধরনের কোনও পদক্ষেপ নেবার বিরুদ্ধে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে তাঁদেরকে সেই লকডাউন মডেলই অনুসরণ করতে হয়, যদিও নিউ ইয়র্কসহ কোনও শহরেই উহানের মত কঠিন লকডাউন মডেল অনুসরণ করতে পারছে না। ফলে করোনাভাইরাসের এ ব্যাপক বিস্তারকালেও সামাজিক দূরত্ব মানবার বিষয়গুলো সেভাবে থাকছে না। এতে মৃত্যু হার সেখানে ব্যাপক হারে বেড়েই চলছে।

এ লকডাউন মডেল বাস্তবায়ন করতে না পারবার মূল কারণ হল, একদিকে চীনের মত কর্তৃত্ববাদী সরকার কর্তৃক জনগণকে নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি যুক্তরাষ্ট্রে না থাকা; অপরদিকে, এ ধরনের মডেল বাস্তবায়নের জন্য জনগণের চাকরি, খাদ্য, বাসস্থানসহ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা। এ না পারবার ব্যর্থতা জনগণকে সেখানে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কায় গভীর উদ্বিগ্নতায় নিমজ্জিত করেছে।

শুধু লকডাউন মডেল অনুসরণ করে কোন রাষ্ট্রের পক্ষে করোনাভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সে সমস্ত রাষ্ট্র লকডাউন মডেল সফল ভাবে প্রয়োগ করতে পেরেছে, যারা একই সাথে অন্তরীণ থাকাকালীন সময়ে জনগণের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়টাও নিশ্চিত করতে পেরেছে। এর পাশাপাশি আরো যে দুটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ সেটি হল, একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবার উপস্থিতি এবং জনগণের সে পরিষেবার সুবিধা নিতে পারবার সক্ষমতা।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, একটি রাষ্ট্র কতটা সফলভাবে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে তা নির্ভর করছে চারটি উপাদানের উপর- ১) লকড ডাউন, ২) ‘লকডাউন’ সময়ে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা,৩) উন্নত স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এবং ৪) জনগণের সে কাঠামো ব্যবহার করতে পারবার সক্ষমতা।

উপরোক্ত চারটি বিষয়ের মাঝে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শুধু একটি উপাদান অর্থাৎ, উন্নত স্বাস্থ্য পরিকাঠামো বিদ্যমান। ফলে, করোনাভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে এ চারটি উপাদানেরই রয়েছে প্রবল অনুপস্থিতি।

পাশ্চাত্যের রাষ্ট্র তাত্ত্বিকরা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের-যাদেরকে তারা হেয় করে তৃতীয় বিশ্ব বলেন—তাদের আর্থ- সামাজিক, রাজনৈতিক সূচককে মাথায় রেখে “ব্যর্থ রাষ্ট্র” ধারণার জন্ম দিয়েছেন।এ  ব্যর্থ রাষ্ট্রের ধারণা যে করোনা উত্তরকালে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হবে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় । এতে যে দুইটি সূচকের উপর জোর দেওয়া হবে সেগুলি হল: ১) রাষ্ট্রের জনগণকে মহামারী মত দুর্যোগ থেকে রক্ষা করতে পারবার সক্ষমতা, এবং ২) রাষ্ট্রের জনগণকে উন্নত স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবার সক্ষমতা।এ দুটি সূচকের আলোকে যখন মূল্যায়ন করা হবে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রসমূহ ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসাবেই পরিগণিত হবে।

CORONA আমেরিকায় করোনাভাইরাস করোনাভাইরাস কোভিড-১৯

সাঈদ ইফতেখার আহমেদশিক্ষক, স্কুল অব সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিস, আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেম, পশ্চিম ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

এই সংবাদটি 1,232 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •