যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আকায়েদ উল্লাহ’র বিচার শুরু

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টার অভিযোগে আটক আকায়েদ উল্লাহ’র বিচার শুরু হয়েছে। তার বিরুদ্ধে গত বছর একটি সাবওয়ে স্টেশনের কাছে পাইপ বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেকে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ এনেছে কর্তৃপক্ষ। তবে মঙ্গলবার ম্যানহাটনের আদালতে আকায়েদের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের সঙ্গে তার কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই। তারা তাকে একজন হতাশ ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

২৮ বছরের আকায়েদ উল্লাহ ব্রুকলিনের একজন সাবেক ক্যাব ড্রাইভার। আইএসের হয়ে আত্মঘাতী হামলা চেষ্টার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে তার। আড়াই সপ্তাহ ধরে তার বিচারকাজ চলবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

আদালতে দেওয়া সূচনা বক্তব্যে আকায়েদ উল্লাহ’র আইনজীবী ওই বিস্ফোরণে তার মক্কেলের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেননি। তবে আকায়েদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস’কে সমর্থনের যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

আকায়েদ উল্লাহ’র আইনজীবী জুলিয়া গাটো বলেন, এটি আমাদের দেশে একটি বিদেশী সন্ত্রাসী সংগঠনের তৎপরতা সংক্রান্ত মামলা নয়।হতাশ আকায়েদ উল্লাহ দুনিয়াজুড়ে মুসলিমদের প্রতি বাজে আচরণ সম্পর্কে ইন্টারনেটে বিকৃত টেক্সট বা মেসেজ পেয়েছিলেন বলে জানান জুলিয়া গাটো।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ অবশ্য আকায়েদ উল্লাহ’র চালানো ওই বিস্ফোরণকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে দেখছে। জিজ্ঞাসাবাদে সে নিজেও স্বীকার করেছে যে, ‘আইএসের জন্যই আমি এ কাজ করেছি।’আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জিজ্ঞাসাবাদে আকায়েদের দেওয়া এ স্বীকারোক্তি তুলে ধরেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রেবেকাহ দোনালেস্কি বলেন, আকায়েদ উল্লাহ’র কম্পিউটার তল্লাশি করে সেখানে আইএসের প্রপাগান্ডা সামগ্রী পাওয়া গেছে। সেখানে বলা হয়েছে, আইএসে যোগ দিতে ভ্রমণে যেতে সক্ষম নয় এমন ব্যক্তিরা যেন তাদের বসবাসের স্থানে একাকী হামলা চালায়। এমনকি হামলা চালানোর আগে সে ফেসবুকে বলেছিল, ‘ট্রাম্প, তুমি তোমার জাতিকে রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছ।’

ছয় বছর আগে বাংলাদেশে থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যান আকায়েদ উল্লাহ। চাচার মাধ্যমে ভিসা পান তিনি। তার চাচা ডিভি লটারি জিতে মার্কিন নাগরিকত্ব পান। ম্যানহাটনে হামলার পরপরই আকায়েদকে গ্রেফতার করা হয়। বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয় তাকে। তখনও তদন্তকাজ চলছিল। সে সময়ই ৯ ভোল্টের ব্যাটারির খোঁজ মেলে তার পকেটে। তার জ্যাকেটে পাওয়া যায় দুটি প্লাস্টিক জিপ, লোহার পাইপের অংশ এবং ক্রিসমাস ট্রি লাইট।

ব্রুকলিনে নিজের বাসায় বসেই বোমা তৈরি করে আকায়েদ। একটি ধাতব পাইপের মধ্যে বিস্ফোরক ভর্তি করে। তার, ব্যাটারি ও ক্রিসমাস ট্রি-এর বাতি ব্যবহার করে। বোমার ভেতরে স্ক্রু বসানো ছিলো যেন সর্বোচ্চ ক্ষতি করা যায়। জিপ টাই দিয়ে শরীরের সঙ্গে বোমা আটকে রাখে সে।আকায়েদ নিজেই পুলিশকে জানান, মার্কিন সরকারের মধ্যপ্রাচ্য নীতির কারণেই তার হামলা। উদ্দেশ্য ছিল আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়া। এজন্যই কর্মদিবসে হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ফেডারেল গোয়েন্দারা দাবি করেন, ২০১৪ সালে আকায়েদ আইএস দ্বারা অনুপ্রাণিত হতে শুরু করেন। আইএস থেকে ভিডিও বার্তায় জানানো হয়, যেই সমর্থকরা দেশ পাড়ি দিয়ে আইএস যোগ দিতে পারছেন না তারা যেন নিজ দেশেই হামলা চালায়। এই ভিডিওতে অনুপ্রাণিত হয়ে আকায়েদ ইন্টারনেটে খুঁজতে শুরু করেন কিভাবে বোমা তৈরি করা যায়।

আকায়েদের বাড়ি থেকে অনেকগুলো পাইপ, ক্রিসমাস ট্রি লাইট ও স্ক্রু পাওয়া গেছে। অনেকগুলো হাতে লেখা নোট ছিলো। সেখানে লেখা। ‘আমেরিকা নিজের আগুনেই মরবে তুমি।’ম্যানহাটনের ওই হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির ফলাফল হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন অভিবাসন নীতিতে আত্মীয় স্বজনের বদৌলতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। ওই হামলাকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প কংগ্রেসকে সেই সুযোগ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

কংগ্রেসের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘পরিবারভুক্তদের অভিবাসী হওয়ার সুযোগ নিয়েই (ফ্যামিলি চেইন নীতি) এই সন্দেহভাজন জঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে সক্ষম হয়েছে। এটা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আমেরিকার অবশ্যই অভিবাসন নীতিকে সুরক্ষিত করা উচিত। এই নীতির কারণেই খুবই ভয়াবহ ব্যক্তিরা নির্বিচারে যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশে সক্ষম হয়।’নিউ ইয়র্ক সিটি ট্যাক্সি এবং লিমোজিন কমিশন জানিয়েছে, ‘আকায়েদ ট্যাক্সিচালক হিসেবে কাজ করতো। ২০১২ সালের মার্চ থেকে ২০১৫ সালের মার্চ পর্যন্ত তার নামে ট্যাক্সির লাইসেন্স করা ছিল।’