যে আশংকা ‘আতংকময়’

অয়েস খসরু :এবারের বিজয় দিবসে একাত্তরে নিহত শহীদদের দুর্ভাগা সন্তানদের একটি আশংকা- বিএনপি গিলে ফেলেছে। এখন আওয়ামী লীগে ঢুকছে রাজাকার, আল বদরের দোসররা। আর এই অনুপ্রবেশকে তারা রীতিমত ‘আতংকময়’ বলে অভিহিত করেছেন। তাদের এই আশংকা দেশের মানুষের মনের ভেতরে গহীন শূন্যতার জন্ম দিচ্ছে। অনেক রক্ত, অনেক ত্যাগ ও অনেক বিসর্জন। যে ত্যাগের কোনো তোলনা হয় না, ৪৫ বছরেও হয়নি- কখনো তা হবেও না। বুকের গহিনে অপার শূন্যতার উপর ভিত্তি করে জন্ম হলো আমাদের দেশের। এখন চোখ ভিজে অনেক সন্তানের। আর এতো দিন মা তার ছেলের জন্য কেঁদে কেঁদে পড়পাড়ে বিদায় নিয়েছেন। স্বামীহারা স্ত্রীরা হৃদয়কোনে যন্ত্রনা বেধে সন্তানদের নিয়ে পথ চলেছেন। ভাই হারা বোনেরা ছলছল চোখে গ্রহন করে বিজয়ের স্বাদ। যন্ত্রনা কমেনি। এই যন্ত্রনার আগুন যেনো চিরায়ত সুপ্ত। ধুকে ধুকে জ্বলেপুড়ে অঙ্গার করে গোটা জীবন।- এতো কিছুর পরও একটি অপেক্ষা ছিল ‘স্বাধীনতাময়’ বাংলাদেশ হবে। থাকবে না কোনো মতান্তর। যারা ক্ষমতায় থাকবে তারা থাকবে একাত্তরের কান্ডারী। আবার যারা বিরোধীদলে থাকবে তারাও হবে একাত্তরের পতাকাবাহী। আমরা ১৬ কোটিই বা কেনো একসঙ্গে একাত্তরকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারি না। কিংবা এতো দিন পারিনি। অনেকেই বলেন- অতীত ভুলে যাওয়াই ভালো। কিন্তু অনেক ত্যাগ, অনেক বিসর্জন তো আর ভুলা যায় না। সকালের মিষ্টি রোদে স্কুলের মাঠে কচি কচি প্রাণ যখন একটি লাল সবুজের পতাকাকে সামনে রেখে ‘আমার সোনার বাংলা গায়’ তখনও দেখি কচিপ্রাণের বুকের কোনে এক বেদনার আকুতি। ইতিহাস জানে না। এরপরও জানে বিসর্জনেই অর্জিত হয়েছে স্বাধীন পতাকা। এই অতীত ভুলার নয়। ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১। মেধাশূন্য করার এক পরিকল্পিত নারকীয় হত্যাযষ্ণ। হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন আমাদের সুর্য সন্তানরা। এটা এই দেশ। যে দেশের মুক্তির জন্য হাসি মুখে প্রাণ দিয়েছেন ওরা। ৯ মাসে তারা অকাতরে বিলিয়েছেন জীবন। দু:খবোধ থেকেই যায়। স্বাধীনতার এক সেনা নায়ক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের হাতেগড়া দল বিএনপিকে গিলে খেল রাজাকার আলবদরের দোসররা। তাদের কাধে বন্ধুক রেখে একাত্তরকে পদদলিত করার গভীর ষড়যন্ত্র চালানো হয়। বিএনপি এখণ ধুকছে সেই যাতনায়। মনে হয় বিএনপির ভেতরে এখন বোধোদয় হয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই- মাঠের বিএনপি অনেক আগে থেকেই এই বোধোদয়ে ছিল। এখন আওয়ামী লীগেও নাকি একই ভুত। রাজাকার, আলবদরের দোসররা ঠাই নিচ্ছে এই দলে। দেশের বেশিরভাগ মানুষ রাজনীতি করে না। আওয়ামী লীগ, বিএনপি করে না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে মগজে মননে বিশ্বাস করে। পহেলা বৈশাখে আনন্দে মাতে। মসজিদে আযান হলে নামাজ পড়ে। সাম্যর বাংলাদেশ রচনা করছে এ দেশের মানুষই। অসাম্প্রাদায়িকময় বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এরপরও ঘটছে রামু, নাসিরনগরের ঘটনা। সাওতালদের কান্না দেখছি। সামাজিক যুদ্ধ বন্ধ হয়নি। সমাজের স্রেতের সঙ্গে মিশে যাওয়া রাজাকার, আল বদরের দোসররা ঘাপটি মেরে আছে। সুযোগ পেলেই ছোবল মারছে। আর তাই বলেই তো ঘটছে হলি আর্টিজানের ঘটনা। পেশাজীবি সংগঠনগুলোতেও বিভক্তি ধরানো হয়েছে। কৌশcল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আঘাত করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে অনেক বিভক্তি। সাংবাদিক, সাহিত্যকরাও নেই এক কাতারে। সবখানে গড়ে তোলা হয়েছে বিভক্তিময় সমাজ। এই বিভক্তিময় সমাজ যে কৌশলে গড়ে তোলা হয়েছে সেটিই এখন অনুধাবনের সময়। কেন এই বিভক্তি। একাত্তরেই তো ফয়সালা হয়ে গেছে বাংলাদেশের। একাত্তর তো বলে দিয়েছে পরবর্তী বাংলাদেশের ভবিষ্যত। রাজনীতিবিদরা বিভক্তির সুযোগ নিতেই পারেন। ক্ষমতার জন্য তারা বাঘের গালেও চুমু খান। কিন্তু এ দেশের সাধারন মানুষ তা করতে পারে না। ৪৫ বছরে ভুলা যায়নি হারানোর বেদনা। এমপি, মন্ত্রী হতে চায় না এদেশে সাধারন মানুষ। চাওয়া শুধু একটাই- একাত্তরময় বাংলাদেশ। মতের বিপরীত মতও হবে একাত্তরের। আর সেই সমাজ বির্ণিমান করতে না পারলে ৪৫ নয় ৪৫০০ হাজার বছরেও বাংলাদেশে স্বাধীনতার প্রকৃত মুক্তির স্বাদ খুঁজে পাওয়া যাবে না।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *