রমজানের শিক্ষায় প্রভাবিত সমাজ চাই

প্রকাশিত: ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ, মে ১০, ২০২০

রমজানের শিক্ষায় প্রভাবিত সমাজ চাই

মাওলানা মো. আব্দুল মান্নান :
রমজানের শিক্ষায় প্রভাবিত একটি সুন্দর আদর্শ আল্লাহওয়ালা ও সুন্নাতী সমাজ দেখতে চাই। যে সমাজে থাকবে না রমজানের শিক্ষাবিরোধী কোন আচার-আচরণ বা কর্মকান্ড। ‘গোপনে অপরাধ করলেও আল্লাহ তা’য়ালা দেখেন’ এ বিশ্বাসে বিশ্বাসীদের নিয়ে আদর্শ সমাজ গঠন করতে চাইলে প্রথমে প্রভাবশালীদেরকে রমজানের শিক্ষায় প্রভাবিত হতে হবে। তাহলে সেই কাঙ্খিত সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা সহজ ও সম্ভব হবে। রমজান আসে, রমজান যায় কিন্তু আমাদের সমাজের রূপরেখা পরিবর্তন না হয়ে আগের মতই থেকে যায়। গোমূর্খ বা অশিক্ষিতদের কথা বাদ থাক। তারা পরিবর্তন না হলে মানুষ তেমন কিছু মনে করে না। কিন্তু শিক্ষিত, আলেম, বিদ্যালয়ের শিক্ষক অথবা নেতানেত্রী প্রভাবশালী আদর্শবান বলে পরিচিতদের দিকে যদি তাকাই তাহলে কি দেখতে পাব? তারা কি রমজানের শিক্ষায় প্রভাবিত? উত্তর নিশ্চয়ই ‘না’ হবে। তারা রমজানের শিক্ষায় প্রভাবিত হলে, পুরোপুরি সুন্নাতের উপর উঠে আসলে বা আদর্শের মাপকাঠিতে ঠিক হয়ে গেলেই ঠিক হয়ে যেত এ সমাজ। সমাজ যাদেরকে সুশীল আদর্শ মানুষ বা নীতি নির্ধারক হিসেবে মূল্যায়ণ করে, যাদের পথ অনুসরণ করে চলে তারা যদি ‘গোপনে অন্যায় করলেও আল্লাহ দেখেন’ রমজানের এই শিক্ষা নিয়ে চলতো তবে সুদ, ঘুষ, চাল চুরি, এতিম অনাথ বিধবা ও প্রতিবন্ধীসহ গরিবদের মাল ভক্ষণের ঘটনা ঘটতো না এ সমাজে। যারা এসব অপরাধে জড়িত সেসব ভদ্রলোকদের মধ্যে রমজান কি কোন প্রভাব ফেলছে? প্রতি বছর রমজান আসে, রমজান যায় কিন্তু আমাদের প্রভাবশালী মহলে খুব কমই এর প্রভাব পড়ে। রমজানের কারণে তাদের হয় না ব্যাপক কোন পরিবর্তন। রমজান যেন তাদের দিয়ে যায় না নতুন কোন বার্তা। নবী করীম (সা.) বলেন, রমজানকে পেয়েও যে ব্যক্তি তার গুনাহ ক্ষমা করাতে পারলো না সে ধ্বংস হোক। নবীজীর এই বাণী ওদের কানে যেন পৌঁছে না। এবার করোনা ভাইরাসে সারা বিশ্ব কেঁপে উঠলেও অপরাধ জগতের ওইসব নাগরিক কিন্তু থেমে নেই। কিন্তু এভাবে আর কত দিন? কবরে যাওয়ার আগে লাগবে না কি গায়ে পরিবর্তনের কোন হাওয়া? রমজান গায়েবের প্রতি মুমিনের বিশ্বাসকে সুদৃঢ় করে। অন্যায়কারী মনে করে তার অন্যায় কেহ দেখেনি বা বুঝেনি। আর রমজান শেখায় যে, গোপনে অন্যায় করলেও আল্লাহ সব দেখেন ও বুঝেন। তাই রমজানে প্রভাবিত ব্যক্তি গোপনেও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকেন। অনেকে রমজানকে ঘিরে ইসলাহের নিয়্যাত করেন। দাঁড়ি রাখেন, নামায শুরু করেন। মিথ্যা ও অন্যায় কাজ বর্জন করেন। আর যে প্রকাশ্যেই অন্যায় করে বেড়ায়, বুঝতে হবে সে রমজানে প্রভাবিত হয়নি। দেখা যায়, মহানবী (সা.) -এর যে সুন্নাতটুকু বিনা টাকায় বা বিনা খরচে পালন করা যায় এবং এর মধ্যে পরকালীন উপকারিতা ছাড়াও রয়েছে দুনিয়াবি অনেক ফায়দা; সেটাও উপেক্ষা করে চলছেন একদল জ্ঞানীগুণি ব্যক্তি। তারা আবার ওয়াজের ময়দানে সরব। টিভিতে বসে বয়ান করছেন। মাদরাসায় বা বিদ্যালয়ে পাঠ দান করছেন। মদ, জুয়ার বিরুদ্ধে, নারী নির্যাতন ও নিপীড়িত মানুষের অধিকার রক্ষায় তারা সুন্দর সুন্দর কথা বলছেন। তাদের বয়ানে বা কর্মকান্ডে গণমানুষের বিশেষ ফায়দা হলেও তাদের নিজেদের যে তেমন কোন ফায়দা হচ্ছে না তা কিন্তু সুস্পষ্ট। যে বয়ান নিজেকে প্রভাবিত করে না, নিজের মধ্যে পরিবর্তন এনে দেয় না, তা অন্যের মধ্যেও তেমন কোন প্রভাব ফেলতে পারে না। এগুলো বুঝা খুবই সহজ। আমরা কেন বুঝি না? নিজে মিষ্টি খাওয়া ছেড়েই অন্যকে মিষ্টি খেতে নিষেধ করতে হয়। নিজেরা অন্যায় কাজে জড়িয়ে থেকে ছেলেমেয়ে বা অধীনস্থদের অন্যায়ে মানা করলে তেমন ফলপ্রসূ হওয়া যায় না। আমরা নিজেদের সুবিধামত কিছু আইন মেনে চলি আর বাকিগুলো এঁড়িয়ে চলি। তা আল্লাহ কেন, দুনিয়ার কোম্পানীর সাধারণ কোন মালিকও কি মেনে নিবেন? নিবেন না। কোম্পানীতে থাকতে হলে যেমন পুরা রুলস বা নিয়ম মেনে চলতে হয়, তেমনি দীন ইসলামে থাকতে হলেও পুরোপুরি নিয়ম মেনে চলতে হয়। আল্লাহর আইন পুরাপুরি মেনে চলা বিষয়ে আল্লাহ পাক বলেন- ‘ইয়া আইয়্যুহাল্লাজীনা আমানুদ্খুলু ফিসসিলমি কা-ফফাহ্।’ হে ঈমানদারগণ, তোমরা পুরাপুরিভাবে ইসলামে প্রবেশ কর। কোন ব্যক্তি দুনিয়াতে থাকবে এবং সব ধরনের ফ্যাসিলিটিজ বা সুবিধা ভোগ করবে অথচ আল্লাহকে মেনে চলবে না তা কেমন করে হয়? তাদেরকে আল্লাহ পাকের দেয়া অফুরন্ত নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সূরা রহমানের ৩৩নং আয়াতে তিনি বলেন- ইয়া মা’শারাল জিন্নি ওয়াল ইনসি ইনিসতাত্বা’তুম আনতানফুজু মিন আক্বতারিস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি ফানফুজূ লা তানফুজূনা ইল্লা বিসুলতান। ‘হে জিন ও ইনসান, যদি তোমাদের শক্তি সামর্থ্য থাকে তবে আমার আসমান জমিন থেকে বের হয়ে যাও। পারবে না। কারণ, তোমরা যেখানে যাবে সেখানেই রয়েছে আমার রাজত্ব। আমার রাজত্বেই যেহেতু থাকবে তবে আমাকে মেনে চল। কিভাবে মেনে চলতে হবে সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন- ‘ক্বুল ইনকুনতুম তুহিব্বুনাল্লাহা ফাত্তাবিউনী।’ বলুন হে নবী, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাসতে চাও, তাকে মেনে চলতে চাও তবে আমার অনুসরণ কর। যারা নবীকে অনুসরণ করে চলবে তারা যেন পক্ষান্তরে আল্লাহকেই মেনে চলল। সমাজের ভাল বলে পরিচিত প্রভাবশালী মাতাব্বর, আলেম, শিক্ষিত, জ্ঞানী গুণী শ্রেণীর লোকদের আমল ঠিক হওয়া উচিৎ। কিন্তু সেটা কি ঠিক আছে? নেই। রমজান হল ঠিক হওয়ার মাস। ইসলাহের মাস। এই মাসেও কি তারা ঠিকঠাক হতে পারেন না? কিন্তু হননি। দাঁড়িকাটা, মিথ্যা বলা, চোগলখোরী, তোহমদ, সুদ, ঘুষ, পরনিন্দা ছাড়েননি। তারপরও এ সমাজ তাদেরকে আদর্শ, মান্যবর জ্ঞানী গুণী হিসেবে মূল্যায়ণ করে যাচ্ছে। যারা অনাদর্শ তারা তা জানেন। নিজেদের বিবেকই তাদের বলে দেয় যে, তুমি অনাদর্শ। যদিও লজ্জা শরমে মানুষ মুখ ফুটে তা না বলুক। কিন্তু তাদের কি অন্তত: রমজানকে ঘিরেও সংশোধন হওয়া উচিৎ নয়? সময় শেষ হয়ে আসলেও এই অতি উচিৎ কাজটি কিন্তু আমরা করছি না। বড়ই পরিতাপের বিষয়!
দেশের শুধু স্কুল নয় বরং মাদ্রাসাগুলোতেও এমন অনেক মুসলিম শিক্ষক বা পরিচালক রয়েছেন যারা সুন্নাতের ধার ধারেন না। তাদের নিকট থেকে আমাদের সন্তানাদি সুন্নাতী যিন্দেগী শিখতে পারবে কি? পারবে না। সুন্নাত বিষয়ে তারা এঁড়িয়ে যান। সুন্নাত এঁড়িয়ে চলার কোন সুযোগ নেই। নবী করীম (সাঃ) বলেন, আমি তোমাদের জন্য দুটি জিনিস রেখে গেলাম। যে এই দুটি জিনিস অর্থাৎ কুরআন ও আমার সুন্নাহ আঁকড়ে ধরবে সে কখনও পথভ্রষ্ট হবে না। কিন্তু আফসোস! সামান্য দুনিয়া লাভের সুন্নাতের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। সুন্নাতপরিপন্থী বিদ্যাপীঠে ছেলেমেয়ে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে মানুষ। কুরআন সুন্নাহ্ এ সমাজে যেন বড়ই অসহায়! রমজানের শিক্ষা না থাকার কুফল এটা। মুসলিম অধ্যুষিত এই দেশে সরকার আলিয়া মাদরাসাগুলোতে সমমানের নামে যে ফেসিলিটিজ দান করেছেন তাতে স্কুলের তুলনায় মাদ্রাসায় কয়েকগুণ বেশি ছাত্রছাত্রী থাকত যদি ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে পরিপূর্ণ সুন্নাত থাকত। তা কিন্তু নেই। জেনারেল শিক্ষার পাশাপাশি সুন্নাতসহ হাক্কানী আলেম বানানোর ক্ষেত্রে অভিভাবকদের যে প্রত্যাশা তা যে কোন কারণেই হোক না কেন, এখানে অপূরণ থেকে যাচ্ছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী ফলাফল না পাওয়ায় কাঙ্খিত পরিমাণ ছাত্রছাত্রী বা অভিভাবক মাদ্রাসামুখি হচ্ছে না। অথচ রমজান মাস আমাদের আশা আকাঙ্খা পূরণের মাস। কিন্তু যাদের মাধ্যমে আল্লাহ পাক আমাদের আশা পূরণ করবেন তাদেরকে তো অবশ্যই রমজানের শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। খোদাভীরু হতে হবে। আমাদের শিশুদেরকে রমজানের শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। সুন্নাত পরিপন্থী বদদীনি জীবনে অভ্যস্থদের রমজানের ছায়াতলে ফিরিয়ে আনতে হবে। বিশেষ করে প্রভাবশালীদের মধ্যে রমজান প্রভাব বিস্তার করলে খুব সহজেই ঠিক হয়ে যাবে আমাদের এ সমাজ। তাই আসুন, রমজানকে সামনে রেখে নিজে সংশোধন হই ও দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রভাবশালীদের মধ্যে যারা এখনও ঠিক হননি তারা যাতে ঠিক হয়ে যান সেজন্য দোয়া করি। যেমনটি নবী করীম (সা.) করেছিলেন হজরত উমর (রা.)-এর বেলায়। আদর্শ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে প্রভাবশালীরা একটা ফ্যাক্টর। তারা যদি ঠিক হয়ে যান তবে আপসে আপ ঠিক হয়ে যাবে মূর্খসুর্ক ও অশিক্ষিতসহ এই সমাজ।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •