রাণীনগর গুচ্ছগ্রাম ঘর তৈরীতে নানা অভিযোগ

প্রকাশিত:রবিবার, ১৩ সেপ্টে ২০২০ ০৫:০৯

রাণীনগর গুচ্ছগ্রাম ঘর তৈরীতে নানা অভিযোগ

 

তমাল ভৌমিক, নওগাঁ প্রতিনিধি :
নওগাঁর রাণীনগরে চামটায় গুচ্ছগ্রামে ঘর প্রতি দেড় লাখ টাকা ব্যায়ে ঘর নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের (পিআইও) আওয়াতায় এক বছর আগে নামমাত্র ঘর নির্মাণ শেষে টাকা উত্তোলন করা হলেও এখন পর্যন্ত ঘরের মেঝে ও বন্ধু চুলা তৈরী করা হয়নি। ঘরের মেঝে তৈরী না করায় ভূমিহীনরা অধিকাংশ ঘরেই উঠতে পারছেন না। এদিকে গুচ্ছগ্রামের উদ্বোধন না করায় নিয়ে জনমনে নানান প্রশ্ন উঠেছে। পিআইও’র বিরুদ্ধে অনিয়মগুলো দ্রুত ক্ষতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জানা গেছে, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান ২০১২ সালে ৩০ সেপ্টেম্বরে যোগদান করেন রাণীনগর। ইত্যে মধ্যে তার বেশ কয়েকবার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পের অনিয়ম বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়েছে।
দূনীতি দমন কমিশনের তার পেইজে থেকে জানা গেছে, গত বছর মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে কাবিখা, টিআর, কাবিটাসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অনিয়মের অভিযোগ দূনীতি দমন কমিশনের (দুদক) এনফোর্সমেন্ট ইউনিটে দেওয়া হয়। অভিযোগ দুদকের রাজশাহীর একটি এনফোর্সমেন্ট টিম পিআইও অফিসে ঘটনা তদন্তে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং দুটি প্রকল্প পরিদর্শণ করে চলে যান। তারপরও বহাল তবিয়তে রয়েছে তার চাকুরি। দীর্ঘ ৯ বছর থেকে রাণীনগর চাকুরী করায় কাউকে ধার ধরেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাণীনগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস (পিআইও) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে উপজেলার বড়গাছা ইউনিয়নের চামটা গ্রামের পাশের্^ টুনিপুকুর, হরিতলা ও কুলাগাড়ী পুকুর পাড়ে ৭০টি গুচ্ছগ্রাম নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। গুচ্ছগ্রাম নির্মাণে প্রতি ঘরে বরাদ্দ দেওয়া হয় দেড় লাখ টাকা। গুচ্ছগ্রামের ঘর নির্মাণের কাজের সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সদস্য সচীব সহকারি কমিশনার (ভূমি), পিআইওকে সদস্যকে ৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। ঘর নির্মাণের কাজের কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়নি। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান গুচ্ছগ্রামের ঘর নির্মাণের দায়িত্ব নেন। এক বছর আগে ঘর তৈরির কাজ শেষ এবং টাকাও উত্তোলন করা হয়েছে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিউল আলম শফুর জানান, প্রায় চার বছর আগে ওই গ্রামে সরকারি খাস জমিতে ১শ’ ৩০ ঘর নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হয়। স্থানীয় এক ব্যক্তি দক্ষিণের অংশে ঘর নিমার্ণ করতে দেবেন না বলে উচ্চ আদালতে মামলা করায় ৬০ ঘর নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। তবে উত্তর অংশে ৭০টি ঘর নির্মাণে কিভাবে, কত টাকা নির্মাণ করা হয়েছে এবং প্রকল্পের কমিটিতে কাকে কাকে রাখা হয়েছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাকে জানানো হয়নি।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, প্রতিটি ঘর তৈরিতে দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ঘরে তৈরির কাজে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। নি¤œমানের টিন, লোহার রড়, নি¤œমানের সিমেন্টের পিলার দিয়ে ঘর তৈরি করা হয়। ফলে টিন, লোহাতে জাং ধরে গেছে। সিমেন্টের পিলার বেশি ভাগই ফেটে গেছে। ঘরের মেঝে পাকা করণ করার নিয়ম থাকলেও মাটিও কেটে দেওয়া হয়নি। এছাড়া প্রতিটি ঘরের সাথে বন্ধু চুলা দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়নি চুলা। গুচ্ছগ্রামের ঘরের কাজে নয় ছয় করার অভিযোগ উঠেছে ঘর তৈরিকারী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। দ্রুত ঘটনায় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এদিকে ৭০টি ঘরের ঘরের মধ্যে প্রায় ৫০টি ঘর স্থানীয়রা তাই দখল করে বসবাস শুরু করছেন। এখনো ২০টি ঘর ফাঁকা রয়েছে। সেই ঘরে নীচে ফাঁকা থাকায় কেউ বসবাস করতে পারেন না। সেই ঘরের মধ্যে আগাছা জন্মে শিয়াল, সাপ, পোকা-মাকড় বসবাস করে। এমন ঘটনা ঘটলেও দেখেও দেখন না উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা। এছাড়া তো গুচ্ছগ্রামের ঘর হস্তান্তর বা উদ্বোধনের কোন খেঁাঁজ নেই।
গুচ্ছগ্রামে বসবাসরত জামাল হোসেন, আছিয়া বিবিসহ আরো অনেকেই সাথে কথা বললে তারা জানান, আমাদের জায়গা জমি নেই তাই আমরা এখানকার ঘরে বসবাস করছি। আমরা যখন ঘরে উঠেছি তখন আমরা ঘরের মেঝেতে দেড় ফিট থেকে ২ফিট উঁচু করে মাটি কেটে ঘরে বসবাস শুরু করেছি। মাটি কাটতে তাদের ঘর প্রতি ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে।
তারা আরো অভিযোগ করে বলেন, সবগুলো ঘরের মেঝে পাকাকরণ করার নিয়ম থাকলেও মাটিও কেটে দেওয়া হয়নি। এখনি ঘরের মেঝের দিকের টিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া বন্ধু চুলা দেওয়ার কথা আমরা শুনেছি। কিন্তুু দেওয়া হয়নি চুলা। কর্মকর্তারা ঘর তৈরি করে রেখে চলে গেছেন। যেভাবে ঘরগুলো তৈরি করা হয়েছে এতে করে গুচ্ছগ্রাম নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
নারগিস, ফাইমা, বুলিসহ অন্যরা জানান, পিআইও অফিস থেকে মাত্র ১০/১২টি ঘরে শুধু মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়া হয়েছে। গুচ্ছগ্রামের ঘর তৈরিতে নি¤œমানের নির্মাণ সামগ্রী টিন, লোহা, সিমেন্টের পিলার ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে সিমেন্টের পিলার অনেকগুলো ফেটে গেছে। টয়লেট নির্মাণেও নি¤œমানের সামগ্রী দেওয়া হয়েছে। এই গুচ্ছগ্রাম নির্মাণে সব মিলে কাজে নয় ছয় করেছেন ঘর তৈরিকারীরা। দ্রুত ঘটনায় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পিআইও মেহেদী হাসান বলেন, গুচ্ছগ্রামের নির্মাণে কোন অনিয়ম করা হয়নি। কাজের সিডিউল অনুযায়ী ঘর তৈরি করা হয়েছে। আর চুলা ঘরে লোকজন উঠার পর দেওয়া হবে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এই কর্মকর্তা।
নওগাঁ জেলা ত্রাণ ও পূণবাসন কর্মকর্তা কামরুল আহসান জানান, তিনি নতুন যোগদান করেছেন। বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখে অনিয়মের পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চামটা গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের সভাপতি ও রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল মামুন বলেন, তিন/চার বছর আগের প্রকল্প। সে সময় মূলত ঘর নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তারপরও অনিয়মের বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখা হবে জানিয়েছেন ইউএনও।
রাণীনগর উপজেলা পরিষদ সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন হেলাল জানান, পিআইও মেহেদী হাসান দীর্ঘ ৯ বছর থেকে একই উপজেলা চাকুরি করছেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও রহস্যজনক ভাবে উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষ কার্যত: কোন ব্যবস্থা গ্রহণ দেখা যায়নি। তার অনিয়মের অভিযোগে দুদক রাজশাহী থেকে কর্মকর্তারা এলেও তার তদন্ত কি হয়েছে তা জানা নেই।

এই সংবাদটি 1,230 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •