রিয়েলিটি শোতে দর্শক–আগ্রহ কমেছে

প্রকাশিত: ১:৪১ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৯

রিয়েলিটি শোতে দর্শক–আগ্রহ কমেছে

ভিনদেশের টেলিভিশন চ্যানেলের রিয়েলিটি শো সা রে গা মা পা দেখতে এ দেশের টেলিভিশন সেটের সামনে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন দর্শক। গানের অনুষ্ঠান ভারতের পাশাপাশি কয়েক বছর ধরে এ দেশেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অথচ দেশের টেলিভিশনে ইদানীং যেসব রিয়েলিটি শো প্রচারিত হচ্ছে, সেগুলো দর্শক দেখছেন কম। আয়োজক, প্রতিযোগী আর অনুষ্ঠানসংশ্লিষ্ট ছাড়া কারও খুব একটা আগ্রহ নেই তাতে।

 

নতুন কুঁড়ি থেকে উঠে আসা প্রতিযোগীদের মধ্যে সামিনা চৌধুরী, তারানা হালিম, ঈশিতা, তারিন আহমেদ, তমালিকা কর্মকার, চাঁদনী, মেহের আফরোজ শাওন, অপি করিম, শ্রাবন্তী, নাদিয়া, নসুরাত ইমরোজ তিশারা এ দেশের দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। একইভাবে ‘ক্লোজআপ ওয়ান: তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ’, সেরাকণ্ঠ, ক্ষুদে গানরাজ, পাওয়ার ভয়েজ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দেশে ও দেশের দর্শকের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন নোলক, রাজীব, কোনাল, পুলক, পুতুল, সাব্বির, বিউটি, নওরীন, সালমা, কিশোর, মুহিন, নিশিতা, রন্টি, ঝিলিক, ইমরান, পড়শী, লুইপা, সজল, ঐশী, রেশমী, কর্নিয়াসহ অনেকে। এখন সেভাবে নতুন কারও প্রতি আগ্রহ নেই দর্শকের। কেন এমন হলো? কেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সা রে গা মা পা বাংলাদেশে জনপ্রিয়?

 

বাংলাদেশে সা রে গা মা পা জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে কৌশলগত কারণ আছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কৌশলে এ দেশের প্রতিযোগীকে জায়গা করে দিয়ে এখানকার মানুষের আবেগকে পুঁজি করছে ওরা।

 

সত্তরের দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশ টেলিভিশন ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠান শুরু করে। দুই যুগ ধরে এটি প্রচারিত হয়। দীর্ঘ বিরতির পর বেসরকারি চ্যানেল এনটিভি ‘ক্লোজআপ ওয়ান: তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ’ শুরু করে। নান্দনিক আয়োজনের সেই অনুষ্ঠান দেশের মানুষ দারুণভাবে গ্রহণ করে। এই অনুষ্ঠানের পরিচালক তানভীর খানের কাছে প্রশ্ন ছিল, এখন কেন দেশের রিয়েলিটি শো নিয়ে দর্শকের আগ্রহ খুব একটা নেই? তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই কিন্তু নতুন কুঁড়ি ভেঙে নতুনভাবে যখন শুরু করি, চাকচিক্য, পরিকল্পনা, সৃজনশীলতা যুক্ত হয়। সে কারণে প্রথম কয়েকটা শো উতরে গেছে ভালোভাবে। বাংলাদেশে একটা সংস্কৃতি চালু আছে, কোনো কিছু একবার শুরু হলে সবাই অনুকরণ করতে থাকে। বুঝুক না বুঝুক কিংবা হোক না হোক। মান পড়ে গেলে দর্শকও মুখ ফিরিয়ে নেন। দর্শকেরাও ধরে নিয়েছেন, গানের অনুষ্ঠান মানে একই ধরনের।’

 

রিয়েলিটি শোয়ের ক্ষেত্রে টার্গেট অডিয়েন্স বড় বিষয়। আমাদের এখনকার শোগুলোর ক্ষেত্রে এই বিষয়টা ভাবা হয় না, এমনকি প্রচারণাও বড় ফ্যাক্টর মনে করছেন তানভীর খান। তিনি বলেন, ‘সব ধরনের রিয়েলিটি শো একই ধরনের দর্শকের জন্য নয়। তবে ওদের ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারণার ধরন দারুণ। কোনোভাবে একটি পর্ব দেখা মিস করলেও এমন ক্লিপ দেখে অনুষ্ঠান নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়। নোবেল ও সিঁথির প্রথম দিককার পরিবেশনা কিন্তু কেউই দেখতে পারেননি। ক্রিয়েটিভ দিকে আমরা দুর্বল। প্রতিটা রিয়েলিটি শো মার খাচ্ছে শুধু টেলিভিশন ও ইউটিউবের ওপর নির্ভর করে তৈরি করছে বলে।’

 

গায়ক, সংগীত পরিচালক ও রিয়েলিটি শোর বিচারক পার্থ বড়ুয়া বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ এমনিতে কলকাতার টেলিভিশন একটু বেশি দেখেন। সার্বিকভাবে আমাদের দেশের টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মান পড়ে গেছে। রিয়েলিটি শো দিয়ে দর্শকের বিচার করে লাভ নেই। রিয়েলিটি শো একটা টেলিভিশনের ছোট্ট একটা অংশ। পুরো টেলিভিশন অনুষ্ঠানে দৈন্যদশা চলছে।’

 

ভাবনা আর পরিকল্পনার জায়গায় বড় ঘাটতি আছে বলে মনে করেন পার্থ বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘আগে একটি টেলিভিশন দিয়ে সব হতো। এখন অনেক চ্যানেল, দর্শকও ভাগ হয়েছে। অনুষ্ঠান নির্মাতাদেরও ভাবনার জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে। ভাবনার জায়গা থেকে কোনোভাবে এগোতে পারছি না, এটা আমাদের ব্যর্থতা। প্রচারের মাধ্যমটাও বদলে গেছে। আগে যেকোনো জিনিস ব্র্যান্ডিং শুধু টেলিভিশন দিয়েই হয়ে যেত। এখন ওই জায়গায়ও গুরুত্ব দিতে হবে।’

 

ক্লোজআপ ওয়ান, সেরাকণ্ঠ এবং ক্ষুদে গানরাজ তিনটি রিয়েলিটি শোতে যুক্ত ছিলেন কুমার বিশ্বজিৎ। তাঁর মতে, একটি শো দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার ক্ষেত্রে শো ডিরেক্টর সব। অনুষ্ঠানের পরিচালক কে বা কারা হচ্ছেন, এটা ভালোভাবে দেখতে হবে। অনুষ্ঠান প্রচারের পর প্রতিযোগী ও বিচারকদের নিয়ে জরিপ করতে হবে।

 

বাঙালি আবেগপ্রবণ, আনন্দে থাকতে পছন্দ করেন উল্লেখ করে কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, ‘আমাদের কিন্তু সৃজনশীলতার জায়গায় অনেক ঘাটতি আছে। রিয়েলিটি শো শুধু গান নয়, আবেগ উসকে দেওয়ার ব্যাপার। রিয়েলিটি শোতে রিয়েল বিষয়টা তুলে আনতে হবে।’

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •