রোহিঙ্গাদের নির্যাতন বন্ধে চুপ থাকা যায় কি ?

EDITORS NOTE: Graphic content / TOPSHOT – A Rohingya refugee reacts while holding his dead son after crossing the Naf river from Myanmar into Bangladesh in Whaikhyang on October 9, 2017. A top UN official said on October 7 Bangladesh’s plan to build the world’s biggest refugee camp for 800,000-plus Rohingya Muslims was dangerous because overcrowding could heighten the risks of deadly diseases spreading quickly. The arrival of more than half a million Rohingya refugees who have fled an army crackdown in Myanmar’s troubled Rakhine state since August 25 has put an immense strain on already packed camps in Bangladesh.
/ AFP / INDRANIL MUKHERJEE
মাহফুজ আদনান : বিশ্বের বুকে চলমান অনেক ঘটনা মানবমনে নাড়া দেয় । দেবে বা কেন আমরা সবাই যে রক্ত মাংস গড়া মানুষ । প্রশ্ন থাকতে পারে তাহলে গত মাস যাবত মায়ানমার সেনাবাহীনি সাধারণ বেসামরিক মানুষের উপর যে হত্যা-নির্যাতন, ধর্ষণ করছে তারা কি মানুষ ? আসলে এসবের হিসাব কষতে হলে ফিরে যেতে পুরনো ইতিহাসে । আসলে এরা মানুষরুপি পশু । আদিমযুগের সকল বর্বরতাকে তারা হার মানিয়েছে । তা না হলে কিভাবে পারে  পিতার চোখের সামনে মেয়েকে ধর্ষণ, অবুঝ শিশুকে কেটে টুকরো টুকরো করা, জীবন্তু মানুষকে পুড়য়ে ফেলা । আবার গুলি করে মেরে মৃত শরীরকে টুকরো টুকরো করা । মানব ইতিহাসের এক চরম ঘৃন্য নির্যাতনে মেতে উঠেছে মায়ানমারের সেনাবহিনী । না এই সব কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব ঈমানি দায়িত্ব । সেই দায়িত্ব পালনে ইতি মধ্যে প্রতবাদী হয়ে উঠেছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রবাসী অধ্যুষিত শহর গুলোতে । সবাই যে যার অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করে যাচ্ছেন।  আমরা বাঙ্গালীরা হত্যা, নির্যাতনকে উপলদ্ধি করি একটু বেশি কেননা আমাদের উপর যে গেছে অনেক নির্যাতন । সেটা  ১৯৭১ । একাত্তরের কথা আমরা কি ভুলতে পারি ? পারবো না । বাঙ্গালীরা তাই আমরা প্রতিবাদ করি, করছি । এই প্রবাসের ব্যস্ত সময়ে তাই বাংলাদেশের সকল সংগঠন গত দু সপ্তাহ যাবত করে যাচ্ছে প্রতিবাদ । কিন্তু নিষ্ঠুর মায়ানমার সরকার প্রধান অং সান সুচির হৃদয়ে এতটুকু মানবতাবোধ থাকলে তার নিরব অবস্থান থাকতো না । নির্যাতনের দৃশ্য বিশ্বের চলমান সকল মিডিয়র কল্যাণে প্রত্যক্ষ করে । কেউ কি চুপ থাকতে পারে  ?  প্রতিবাদের পাশাপাশি নিউইয়র্কসহ প্রবাসের অনেক শহর থেকে রোহিঙ্গাদের সহযোগীতা প্রদানের কথা উঠে আসছে । তাদেরকে আর্থিক সহযোগীতা করা অনেকের মানবিক দায়িত্ব । বাংলাদেশে সীমান্তবর্তী ঐ মরণফাদ থেকে যেসব রোহিঙ্গা মৃসলিম ফিরে আসছেন, সেই সব শিশূ, মহিলা, বৃদ্ধদের সহযোগীতার হাত প্রসারিত করা উচিত বলে অনেকের মত । সেই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রবাস থেকে সহযোগীতা প্রদান করা হতে পারে ।

 

বাঙালির মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রতি মায়া জাগিয়ে তুলছেন কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তাদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ইতিহাস। গ্রহণযোগ্যতা আছে আবার নেইও। একসময় মিয়ানমারের আশেপাশে কারেন, শান, কাশিনসহ আরো অনেকগুলো প্রদেশ ছিল। ব্রিটেন দখল করে নিয়ে সবগুলো প্রদেশকে এক করে ফেলে। ১৮২৮ সালে একত্রিত হওয়া প্রত্যেকটা প্রদেশ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করে। কেবল রোশান/রোহিঙ্গা প্রদেশটি থেকে যায় মিয়ানমারের সঙ্গে। ১৮২৮ সালের শেষের দিকে পরপর বাংলাদেশের নোয়াখালী ও কুমিল্লা অঞ্চল থেকে বেশ কিছু বাঙালি পরিবারকে রোশান/রোহাঙ্গ প্রদেশের বিরান ভূমিতে বসবাসের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্যাতিত এই রোহিঙ্গাদের আদি পুরুষ আসলে বাঙালি। আবার কেউ কেউ বলছেন রোহিঙ্গা ঐতিহাসিকভাবে মিয়ানমারেরই অধিবাসী। প্রায় দুশ বছর আগের কেচ্ছা-কাহিনী শুনিয়ে এদেশে নিজের অধিকার পেতে চাওয়া একেবারেই অযৌক্তিক। মানবাধিকার গ্রুপগুলো দাবি করছে, ‘দুই মাসে প্রায় ২১ হাজার ৯০০ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে।’ এই অণুপ্রবেশ নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে যেমন মত দিচ্ছেন অনেকেই । কিন্তু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের উচিত পাশে দাড়ানো । আর এই পরিস্থিতি উত্তাল হওয়ার জন্য গণমাধ্যমকে দায়ী করেছেন রাষ্ট্রীয় পরামর্শক ও শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চি।

 

অনেকেই তাকে লেডি হিটলার বলে উপাধি দিচ্ছেন । কিন্তু নোবেল বিজয়ী সুচির এই সব কিছুতেই যায় আসে না ।

 

জাতিসংঘ চুপ কেন ? সেটা আমরা জানি না । কিন্তু আমাদের রাখাইন রাজ্যের হামলা বন্ধে এবং পর্যবেক্ষণে জাতিসংঘ উপদেষ্টা কমিশনের প্রধান ও সাবেক জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনান সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞস্থলে গিয়েছিলেন । তিনি সেখানে থেকে পর্যবেক্ষণ করে কট্রর বৌদ্ধদের প্রতিবাদের সম্মুখিন হয়েছিলেন । রাজ্যে চলমান সহিংসতা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি অতি দ্রুত শান্ত করতে মিয়ানমার সরকারকে পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহবান জানিয়েছেন।

 

রাখাইন রাজ্যে ৭ দিনের সফরের পর মঙ্গলবার ইয়াঙ্গুনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি মিয়ানমারের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের বিষয়ে উদ্বিগ্নতা ব্যক্ত করে বলেন, ‘সেখানে ভয়, অবিশ্বাস এবং আতঙ্ক বাড়ছে কিন্তু তা প্রশমনের জন্য উপায় খুঁজতে হবে। বৌদ্ধ ও মুসলিমদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করতে হবে।’

 

জাতিসংঘের এই মহাসচিব দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারে নির্যাতিত রোঙ্গিদের নিয়ে কাজ করে আসছেন। এই সময় মি.আনান মানবাধিকার কর্মী ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা নাগরিকদের সম্পর্কে উদ্বিগ্নতা ব্যক্ত করেন। আনান বলেন, আমরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবেদন নিয়ে চিন্তিত। সেনাবাহিনীর উচিত নাগরিকদের সুরক্ষা করা এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সৈন্যদের অবশ্যই আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে হবে।

 

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজ্জাক রোহিঙ্গাদের উপর চালানো সহিংসতাকে ‘গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করেছেন। কফি আনান বলেন, আমি এটাকে সেভাবে দেখতে চাই না, যেমনটি কেউ কেউ দেখছেন। আমি মনে করি, সেখানে উত্তেজনা আছে, যুদ্ধ চলছে।

 

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সৈন্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, খুন, হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, ঘরবাড়ির পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ আনেন। মিয়ানমার সরকার এই অভিযোগ কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে।

 

নিষ্ঠুর মায়ানমার সরকার আর নিষ্ঠুর এই নারীর প্রত্যাখান । আর জাতিসংঘের নিরবতা সবাইকে হতবাক করেছে । পৈশাচিক এই নির্যাতন কবে বন্ধ হবে আমরা কেউ জানি না । কিন্তু আমাদের উচিত প্রতিবাদ করা । রোহিঙ্গাদের সহযোগীতা করা । তা না হলে যে কোন দেশ, যে কোন গোত্রের উপরে নেমে আসতে যে কোন শক্তির নির্যাতন ।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.