লকডাউন তুলে দেওয়ার কৌশলগত রূপরেখা

প্রকাশিত: ৬:৪০ পূর্বাহ্ণ, মে ২২, ২০২০

লকডাউন তুলে দেওয়ার কৌশলগত রূপরেখা

আসিফ ইব্রাহিম, নিহাদ কবির, আবুল কাসেম খান, সৈয়দ নাসিম মন্‌জুর, এম মাসরুর রিয়াজ

গত ৩ মে সমকালে লকডাউন এক্সিট পলিসি নিয়ে আমাদের নিবন্ধটি (লকডাউনের ‘এক্সিট প্ল্যান’ এখনই প্রয়োজন) প্রকাশিত হওয়ার পরবর্তী সময়ে সমাজে এবং অর্থনীতিতে কভিড-১৯ সংক্রমণের প্রভাব আরও অনেক দৃশ্যমান হয়েছে। এ সময়ে সরকার এবং সমাজ যখন মহামারিজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন সরকারকে সেবা প্রদানে নিরবচ্ছিন্নতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় মনোযোগ দিতে হবে, বিশেষ করে স্বাস্থ্য এবং আর্থিক খাতে এবং কৌশলগত দিকপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ক্রম হ্রাসমান সীমিত সম্পদকে সমাজের সর্বাধিক কাজে লাগাতে হবে।

আংশিক খুলে দেওয়া, সিদ্ধান্তের দ্ব্যর্থবোধকতা এবং অ-সরল রৈখিক প্রতিক্রিয়া : সরকার মহামারির সংক্রমণ রোধে বা কমিয়ে রাখার জন্য বিভিন্নভাবে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় এখনও কম হলেও দৃশ্যমানভাবে বাড়ছে। কিন্তু এই ক্রান্তিকালীন সময়ে কলকারখানা ও দোকানপাট, মার্কেট এবং অন্যান্য সামাজিক মিলনস্থল খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যদিও বেশ কঠিন শর্তাবলি পালনসাপেক্ষে। আন্তঃজেলা সাধারণ পরিবহন এখনও বন্ধ রয়েছে, তবে পণ্য পরিবহন বাড়ছে। মাঠে কৃষিকাজ চলছে। খাদ্য ও অপরাপর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য খাত, সেই সঙ্গে ঔষধ শিল্প প্রথম থেকেই খোলা রয়েছে। বাস্তবতার নিরিখে সরকারের আরোপিত শর্তগুলো পালন করাও যেমন সহজ হবে না, সেগুলো বলবৎ করা বা নজরদারি করাও কষ্টকর হবে।

এসব সিদ্ধান্ত কিসের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাদের অনুরোধে, তা পরিস্কার নয়। এটা মোটামুটি সর্বজনস্বীকৃত যে, প্রথমদিকের লকডাউন আমাদের অনেকাংশেই আরও বেশি সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করেছে। তবে এটা একেবারেই পরিস্কার যে, কভিড-১৯ সহসাই একদিন উধাও হয়ে যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না কোনো ভ্যাকসিন বা কার্যকর চিকিৎসা আবিস্কৃত হয়। একটা সামগ্রিক কর্মসূচি ও সমাধানের রূপরেখা তৈরি করার সময় এসে গেছে, যেগুলোকে দেশের জন্য প্রয়োজনানুযায়ী বিস্তারিত অথচ পরিবর্তনশীল ‘কভিড-১৯ লকডাউন এক্সিট স্ট্র্যাটেজির’ আওতায় কার্যকর ও ফলপ্রসূভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে এবং যার প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য হবে সুস্বাস্থ্য ও সামাজিক কল্যাণ এবং সেই সঙ্গে অর্থনীতিতে পুনঃপ্রাণসঞ্চালন।

সহনীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে সামগ্রিক কর্মসূচির কাঠামো প্রণয়ন :প্রথমেই একেবারে পরিস্কার হওয়া উচিত যে, কোনো দেশই এমন কোনো নিখুঁত সমাধান খুঁজে পায়নি, যা সব দেশেই ব্যবহারযোগ্য। প্রতিটি দেশের নিজস্বতাকে হিসাবে নিতে হবে। যেমন বাংলাদেশের জনবসতির ঘনত্ব, পরবর্তী মাসগুলোর আবহাওয়া এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা অন্য প্রায় সব, এমন কি আশপাশ দেশের থেকে ভিন্ন। যে কোনো কৌশল নিরূপণ করার সময় এগুলো এবং অন্য আরও অনেক বিষয় মাথায় রাখতে হবে।

লকডাউন থেকে বেরিয়ে আসার অন্তত তিনটি পর্যায় বিবেচনা করতে হবে :১. প্রস্তুতি- লকডাউনের বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার আগে স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সম্পৃক্ত খাতের প্রস্তুতি কোন পর্যায়ে থাকতে হবে? ২. সূত্রপাত- কার্যকর একটি এক্সিটের জন্য কোন কোন কাজের সূত্রপাত করতে হবে? (৩) বাস্তবায়ন- লকডাউন থেকে বেরিয়ে আসার সময় কোন পথনির্দেশ এবং কৌশল অবলম্বন করা উচিত?

লকডাউন থেকে বের হওয়ার কৌশল পাঁচটি মূল বিষয় মাথায় রেখে তৈরি করা যায়। যথা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, জীবিকা, অর্থনীতির পুনঃসঞ্চালন, যাতায়াত বা চলাচলের স্বাধীনতা এবং সুশাসন। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় মূলত কভিড-১৯ সংক্রমণের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখা; পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও সহায়তাকারী, অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও উপকরণের ব্যবস্থার দিকে নজর দিতে হবে। জীবিকার ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য হবে জীবিকার প্রাপ্যতা ও জীবিকার্জনের ক্ষেত্র। সেই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা ও অভিবাসী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

অর্থনীতিতে পুনরায় গতি সঞ্চার করতে হলে যে কোনো দেশকে অর্থনীতির অত্যাবশ্যক খাত যেমন কৃষি, উৎপাদন রপ্তানি এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সেবা খাত জাগিয়ে তোলার জন্য কার্যকর নীতিনির্ধারণ করতে হবে। ব্যবসা সবসময় যেমন হয় তেমনি হবে, এই পূর্বানুমানের ভিত্তিতে গতানুগতিক বাজেট প্রণয়ন কাজে দেবে না। অর্থনীতিতে তারল্য সঞ্চালন করে চাহিদা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যবসা নতুন করে চালু করতে সরবরাহের দিকে নজর দিতে হবে।

বাংলাদেশে পণ্য ও মানুষের চলাচল শুরু হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, স্বল্প মেয়াদে এর ফলাফল কী হয়। মানুষ ও পণ্যের চলাচল প্রযুক্তির মাধ্যমে মানচিত্রায়ণ করে তার সঙ্গে কভিড-১৯ সংক্রমণের আপেক্ষিকতা নির্ণয় করা যায়। এর ব্যবহার করে চলাচল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য ও জীবন বিপন্ন না হয়, তথ্যভিত্তিক এমন প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

আর্থিক পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগ, পানি-গ্যাস-বিদ্যুৎ ইত্যাদি জন-উপযোগ, সরবরাহ ব্যবস্থা ইত্যাদির জন্য সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ব্যবস্থাপনার জন্য অধিকমাত্রায় সুশাসন ও নজরদারি প্রয়োজন। আর্থিক পরিকল্পনা করার সময় অংশীজনদের মতামত নেওয়া একান্ত প্রয়োজন।

লকডাউন এক্সিট স্ট্র্যাটেজিতে অবশ্য বিবেচ্য বিষয় : একটি আদর্শ লকডাউন এক্সিট স্ট্র্যাটেজিতে এসব মৌলিক বিষয় থাকবে : ১. উদ্দেশ্য ও চ্যালেঞ্জ, ২. কেন্দ্রীয়ভাবে বর্তমান পরিস্থিতির মূল্যায়ন ও নিরীক্ষণ, যা স্ট্র্যাটেজি বাস্তবায়নকালে চলমান থাকবে; ৩. প্রস্তুতি মূল্যায়নের জন্য একটি পরিকাঠামো নির্ধারণ করা, যার মাধ্যমে অংশীজনদের প্রতিটি গোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত কাজ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি মূল্যায়ন করা যায়। ৪. স্বাস্থ্য, সামাজিক, অর্থনৈতিক, আর্থিক ও অন্যান্য পরিপ্রেক্ষিতে ঝুঁকি মানচিত্রায়ণ ও ব্যবস্থাপনা করার জন্য একটি পরিকাঠামো তৈরি। ৫. পর্যায়ক্রমিকভাবে লকডাউন থেকে বেরিয়ে আসার খাতওয়ারি কৌশল নির্ধারণের জন্য বিবেচ্য বিষয় পর্যালোচনা যেমন সংক্রমণের পর্যায়, তীব্রতা ও ব্যাপকতা, ভৌগোলিক এলাকাভিত্তিক বিষয়, প্রতিটি এলাকার জনসাধারণ সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট বিষয়াদি, উল্লিখিত খাতের লজিস্টিকস, এবং এ রকম অন্যান্য বিষয়।

বিস্তারিত না গিয়ে পর্যায়ক্রমিকভাবে লকডাউন থেকে বেরিয়ে আসার খাতওয়ারি কৌশল নির্ধারণের বিষয়টি বলি। বলা বাহুল্য, এ জন্য বিবেচ্য বিষয় পর্যালোচনা করতে হবে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে। এই কৌশলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্যে থাকবে- ট্রেনিং ও পরীক্ষা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, কভিড-১৯ রোগীদের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো, পিপিই, ওষুধ ও ভ্যাকসিন (প্রাপ্যতাসাপেক্ষে) ব্যবস্থাপনা, নিরীক্ষণের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার, ভার্চুয়াল স্বাস্থ্য পরিচর্যা প্রশিক্ষণ, কভিড-১৯ পুনঃসংক্রমণ হলে তার জন্য প্রস্তুতি। জীবিকার মধ্যে থাকবে জীবিকার্জনে পুনরায় নিয়োজিত হওয়া, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কর্মস্থলে নিরাপত্তা, ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী ব্যবস্থাপনা, শিশু, মহিলা, প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক মানুষের কল্যাণ, সর্বনিম্ন স্তরের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা, পণ্য ও সেবা, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং মার্কেট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া। সুশাসনের মধ্যে সক্ষমতা-বৃদ্ধির জন্য আবশ্যক উপকরণ, আইনশৃঙ্খলা; ভিড় ব্যবস্থাপনা, উপজেলা ও ইউনিয়ন কাউন্সিলের ক্ষমতায়ন, পাবলিক ফাইন্যান্স ব্যবস্থাপনা, করারোপ ও অর্থনীতির পুনরুত্থান এবং কভিড-১৯ ইন্স্যুরেন্স পলিসি ও ইমপ্যাক্ট ফান্ড। চলাচলের মধ্যে থাকবে দেশে মানুষ ও পণ্য চলাচলের স্বাচ্ছন্দ্য, দেশের বাইরে থেকে মানুষ ও পণ্য চলাচলের স্বাচ্ছন্দ্য, গণপরিবহন ব্যবস্থা, পানি-গ্যাস-বিদ্যুৎ ইত্যাদি জন-উপযোগ, নূ্যনতম জন-উপযোগ, যেমন পানি ও পয়ঃনিস্কাশন এবং শহর এবং গ্রামাঞ্চলে জন-উপযোগ। যোগাযোগের মধ্যে থাকবে- তথ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। কৃষির মধ্যে থাকবে কৃষি খাতে কাজের ধারাবাহিকতা, সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় সাধন এবং ভর্তুকি এবং আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ। শিক্ষার মধ্যে থাকবে প্রযুক্তির ব্যবহার, বিলম্বিত শিক্ষা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। অভিবাসী জনগোষ্ঠী ব্যবস্থাপনার মধ্যে থাকবে বিদেশ থেকে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনকালে শারীরিক অবস্থান নিশ্চিতকরণসহ রোগসংক্রমণের ব্যাপ্তি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন। শিল্পের মধ্যে থাকবে কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনজ্জীবিতকরণ, বিশেষত বস্ত্র, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ইত্যাদি শিল্পের দিকে লক্ষ্য রেখে বৃহৎ শিল্প পুনরুজ্জীবিতকরণ এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ভর্তুকি এবং অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান, আর্থিক এবং অনার্থিক দু’ভাবেই।

আসিফ ইব্রাহিম, চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ; নিহাদ কবির, প্রেসিডেন্ট, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, ঢাকা; আবুল কাসেম খান, চেয়ারম্যান, বিল্ড (বিজনেস ইনেশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট); সৈয়দ নাসিম মন্‌জুর, উপদেষ্টা, লেদার ফুটওয়ার অ্যান্ড গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (এলএফএমইএবি); ড. এম মাসরুর রিয়াজ, চেয়ারম্যান, পলিসি এক্সচেঞ্জ

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •