লন্ডনে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ পুলিশ: বর্ণবাদের যাতাকলে ৩০ বছর

প্রকাশিত: ১০:২১ পূর্বাহ্ণ, মে ২০, ২০২০

লন্ডনে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ পুলিশ: বর্ণবাদের যাতাকলে ৩০ বছর

ডেস্ক রিপোর্ট, ঢাকা: নরওয়েল রবার্টস লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৬৭ সালে। তিনি ছিলেন ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ পুলিশ ফোর্সের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সদস্য। প্রতিষ্ঠানের বর্ণবাদি দুর্নাম ঘোচানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া সংস্কারের অংশ হিসাবে এই কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে চাকরি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চাকুরীতে ঢোকার পর দশকের পর দশক ধরে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তো বটেই, তার সহকর্মীদের কাছ থেকেও তাকে নিত্যদিন বর্ণবাদি আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে। নরওয়েল রবার্টস সেই অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন বিবিসির অ্যালেক্স লাস্টের কাছে। চাকরির ইন্টারভিউতে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল কেন তিনি পুলিশে যোগ দিতে চান। “আমি বলেছিলাম, আমি মানুষকে সাহায্য করতে চাই, তাছাড়া পুলিশের চাকরি স্থায়ী এবং নিরাপদ।” তবে কাজে ঢুকে এমন ঝক্কি যে তাকে পোহাতে হবে তা স্বপ্নেও ভাবেননি যুবক নরওয়েল। কেউ যদি আমাকে সাবধান করতো আমি হয়তো এই চাকরি নেওয়ার আগে দুইবার ভাবতাম। আমি সহ্য করে গেছি, কিন্তু আমার প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কখনই নয়।” নরওয়েল রবার্টস ৯ বছর বয়সে বিধবা মায়ের হাত ধরে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চল আ্যাঙ্গুইলা থেকে ইংল্যান্ডে এসেছিলেন। তারা ছিলেন কথিত উইন্ডরাশ প্রজন্ম যাদেরকে যুদ্ধবিধ্বস্ত ব্রিটেনের পুনর্গঠনে ক্যারিবিয় অঞ্চলে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলো থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। প্রচুর সংখ্যায় আসা কৃষ্ণাঙ্গ এই অভিবাসীদের তখন চরম বৈষম্য এবং বর্ণবাদি আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে। চাকরি বা বাসস্থান পাওয়া তাদের জন্য অত্যন্ত দুরূহ ছিল। লন্ডনে নেমে নরওয়েলের মা গৃহকর্মীর কাজ নিয়েছিলেন।

তারা দুজন লন্ডনের কাছে কেন্ট এলাকার ব্রমলি নামের একটি ছোটো শহরে বাসা নিয়েছিলেন। তারাই ছিলেন ব্রমলির প্রথম এবং একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ পরিবার। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর, উঁচু ক্লাসের কজন ছাত্র একদিন আমার মাথায় আঘাত করলো। তারা দেখতে চেয়েছিল আমার রক্তের রং কেমন। এখনও আমার মাথায় সেই দাগ রয়ে গেছে।”নতুন স্কুলে ভর্তি হলাম। সেখানে বেশ কিছু কৃষ্ণাঙ্গ ছেলে-মেয়ে ছিল, এশীয় ছেলেমেয়ে ছিল। পরিবেশ পরিস্থিতি বেশ ভালোই ছিল। আমি জীবন উপভোগ করতে শুরু করলাম। তার বয়স যখন ১৬ নরওয়েলকে বাড়ি ছাড়তে হলো। কারণ সৎ বাবা তাকে পছন্দ করতেন না। কিশোর নরওয়েল তখন একটি ল্যাবরটরিতে টেকনিশিয়ানের কাজ নিলেন। সে সময় একদিন সংবাদপত্রে পুলিশের চাকরির একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়ে তার। নরওয়েল বললেন তিনি আবেদন করেছিলেন কিছুটা মজা করতে। কারণ তিনি জানতেন লন্ডনের পুলিশে কোনো কৃষ্ণাঙ্গ নেই এবং সেখানে তার কোনোদিনও চাকরি হবেনা। আমি বিজ্ঞাপন দেখে ভেবেছিলাম – দেখিনা আবেদন করে চাকরিটা হয় কিনা। অবশ্য আমি স্বপ্নেও ভাবিনি যে আমাকে নেওয়া হবে। কিন্তু লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ চাকরি হলো নরওয়েল রবার্টসের। তাকে হেন্ডন পুলিশ ট্রেনিং কলেজে পাঠানো হলো। সেসময় তার ঐ নিয়োগের কথা বড় করে ব্রিটেনের রেডিও-টিভি সংবাদপত্রে প্রচারিত হয়েছিল।
যে ১৩ সপ্তাহ আমি প্রশিক্ষণ কলেজে ছিলাম, সেসময় কয়েকবার আমাকে সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি করা হয়েছে। কারণ আমি ছিলাম লন্ডনের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ পুলিশ। একরকম সেলিব্রিটি হয়ে উঠেছিলাম। প্রশিক্ষণ শেষে তাকে লন্ডনের বো স্ট্রিট পুলিশ স্টেশনে নিয়োগ দেওয়া হলো। তখন ১৯৬৭ সাল। ২১ বছরের নরওয়েলের জীবনে সেদিন থেকে শুরু হলো দু:স্বপ্নের কাল। প্রথম দিন খুবই রোমাঞ্চ বোধ করছিলাম। কিন্তু আমি যখন যোগদানের জন্য আমার সিনিয়র অফিসারের কাছে গেলাম, তিনি আমাকে আমার গায়ের রং অর্থাৎ এন অক্ষর দিয়ে শুরু শব্দ দিয়ে আমাকে সম্বোধন করলেন। বললেন, তিনি নিশ্চিত করবেন আমি যেন আমার প্রবেশন পিরিয়ড না উৎরোতে পারি। ক্যান্টিনে আমার সহকর্মীরা তাস খেলতো, তাকে নেওয়া হতোনা। একবার খেলার সুযোগ পেয়ে বেশ জুয়া ধরে কিছু পয়সা খুইয়েছিলেন। “কিন্তু আমি অখুশি হইনি। মনে হয়েছিল কিছু পয়সা হারিয়েছি, কিন্তু ওরা তো আমাকে অন্তত খেলতে দিয়েছে। সেসময় পুলিশের সাথে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক ছিল খুবই খারাপ। সে কারণে অনেক জায়গায় তার শ্বেতাঙ্গ সহকর্মীদের চেয়ে নরওয়েলের গ্রহণযোগ্যতা ছিল অপেক্ষাকৃত বেশি।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ