লিটন যদি ভুলের শিকার না হতেন

এবারো হলো না। সুযোগ পেয়েও এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতকে হারাতে পারলো না বাংলাদেশ। থার্ড আম্পায়ার রড টাকারের বির্তকিত সিদ্ধান্ত, মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানদের আত্মহত্যায় বিফলে গেলে লিটন দাসের অসাধারণ সেঞ্চুরি। স্কোর বোর্ডে যথেষ্ট পুঁজি না থাকায় বোলারদের লড়াইও কাজে আসলো না। সাত উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের ছুড়ে দেয়া ২২৩ রান ভারত টপকালো ইনিংসের শেষ ওভারের শেষ বলে। রুদ্বশ্বাস ফাইনালে তিন উইকেটে বাংলাদেশকে হারিয়ে আরেকবার এশিয়া কাপের ট্রফি জিতলো ভারত। এটি এশিয়া কাপে ভারতের সপ্তম শিরোপা। বাংলাদেশের তৃতীয় আক্ষেপ।

অথচ দুবাই ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়ামে অন্য ইতিহাস লেখা হতে পারতো।

ইতিহাস পরিবর্তনের বোলিং করেছিলেন মুস্তাফিজ, রুবেল। অধিনায়ক মাশরাফিও ছিলেন অন্যান্য। সামান্য ২২২ রানের পুঁিজও পরেও ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছেন বোলাররা। খেলা নিয়ে গেছেন শেষ ওভারে। শিরোপা নির্ধারনী শেষ ওভারে ভারতের প্রয়োজন ছিল ছয় রান। মাহামুদুল্লার করা ওই ওভারে শেষ বলে এক রান নিয়ে ভারতের জয় নিশ্চিত করেন কেদার যাদব। আক্ষেপে পুরো বাংলাদেশ। এদিন আক্ষেপটা বাড়িয়েছেন থার্ড আম্পায়ার রড টাকার। অসাধারন সেঞ্চুরি হাকানো লিটন দাসের বিপক্ষে নিউজিল্যান্ডের এই আম্পায়ারের দেয়া বির্তকিত সিদ্ধান্তেই এলোমেলো করে  দেয় সবকিছু। ৪১তম ওভারে ১৮৮/৫ সংগ্রহ নিয়ে বাংলাদেশের বড় পুঁজির সম্ভাবনা তখনও স্পষ্ট। কিন্তু ৪০.৬তম ওভারে স্ট্যাম্পিংয়ের শিকার হয়ে সাজঘরে ফেরেন সেঞ্চুরিয়ান। পপিং ক্রিজে লিটনের পা লাইনের ভেতরই ছিল। এতে বেনিফিট অব ডাউট ব্যাটসম্যানের পাওয়ার কথা। কিন্তু রিপ্লে দেখে আউটের সিদ্ধান্ত দিলেন থার্ড আম্পায়ার রড টাকার। আউট হওয়ার আগে ১১৭ বলে ১২১ রান করেন লিটন কুমার দাস। এতে লিটন হাঁকান ১২টি বাউন্ডারি ও দুটি ছক্কা। দায় ছিল টাইগার ব্যাটসম্যানদেরও। খেলা শুরুর আগেই দেখা গিয়েছিল অস্বাভাবিক ঘটনা। খেলা শুরুর অনেক আগেই মাঠের আম্পায়ার হিসেবে প্রকাশ করা হয় মারাইস এরাসমাসের নাম। কিন্তু দ্বিতীয় আম্পায়ার কে? তা জানা যায়নি খেলা শুরুর এক ঘণ্টা আগেও। পরে এ দায়িত্বে দেখা যায় লঙ্কান আম্পায়ার রুচিরা পালিয়াগুরুগেকে।

২২৩ রানের সহজ লক্ষ্য। পাড়ি দিতে গিয়ে উড়ন্ত সূচনাই করে ভারতীয়রা। রোহিত শর্মা আর শিখর ধাওয়ান মিলে শুরু থেকেই ছিলেন মারমুখি। ৪.৪ ওভারেই দু’জনের ওপেনিং জুটিতে উঠে যায় ৩৫ রান। কিন্তু ৫ম ওভারের ৪র্থ বলে এসে প্রথম ব্রেক থ্রু এনে দেন নাজমুল ইসলাম অপু। মাত্রই দ্বিতীয় ওয়ানডে খেলছেন বাংলাদেশের এই স্পিনার। তার করা আউটসাইড অফের বলটি খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন ধাওয়ান। অষ্টম ওভারেই আম্বাতি রাইডুকে মুশফিকের হাতে ক্যাচে পরিনত করেন মাশরাফি। ২ রান করে আউট হয়ে যান রাইডু। দুই টপ অর্ডারের বিদায়েও দারুন খেলছিলেন রোহিত শর্মা। রুবেল হোসেনের আগের ওভারে হুক করে ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন ভারতীয় অধিনায়ক। এবার শর্ট বল উড়াতে চেয়েছিলেন পুল করতে। কিন্তু পার করতে পারলেন না সীমানা। রুবেলের হাত ধরে এলো ভারত অধিনায়কের দামী উইকেট। কিছুটা দৌড়ে চমৎকার এক ক্যাচ নেন নাজমুল ইসলাম। ৮৩ রানে ৪৮ রান করা রোহিতকে হারিয়ে চাপে পরে ভারত। দিনেশ কার্তিককে সঙ্গে নিয়ে সেই চাপ সামালদেন অভিজ্ঞ ধোনি।

এরা দু’জন চতুর্থ উইকেটে ১০০ রানের জুটি গড়ে ভারতের জয়ের ভীত গড়েদেন। আগের ম্যাচে দারুণ বোলিং করা মাহমুদুল্লাহ ভাঙ্গেন ভারতের প্রতিরোধ গড়া জুটি। ফিরিয়ে দেন দিনেশ কার্তিককে। মিডল স্টাম্প সোজা নীচু ফুলটস ফ্লিক করতে গিয়ে ব্যাটে খেলতে পারেননি কার্তিক। ফিরে যান এলবি হয়ে। ৬১ বলে একটি করে ছক্কা-চারে ৩৭ রানে কার্তিকের বিদায়ে ভাঙে ৫৪ রানের জুটি। কার্তিক বিদায় নিলেও কেদার যাদবকে সঙ্গে লড়াই করছিলেন ধোনি। এসময় মুস্তাফিজকে আক্রমনে আনেন মাশরাফি। বাঁহাতি পেসারের শরীরের বেশ বাইরের বল তাড়া করতে গিয়ে মুশফিকুর রহিমকে সহজ ক্যাচ দিয়ে ফিরেন ধোনি। ৬৭ বলে ৩৬ রান করেন এই কিপার ব্যাটসম্যান। দ্রুত রান নিতে গিয়ে হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পাওয়া কেদার যাদব দৌড়াচ্ছিলেন খুব কষ্ট করে। ৩৮তম ওভার শেষে অধিনায়ক রোহিত শর্মা ইশারা দিলে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে যান এই মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। মাঠ ছাড়ার সময় ২০ বলে ১৯ রানে ছিলেন কেদার। ৩৮ ওভার শেষে ভারতের স্কোর ১৬৭/৫। ক্রিজে রবীন্দ্র জাদেজার সঙ্গী ভুবনেশ্বর কুমার। জয়ের জন্য শেষ ১৩ ওভার আর ৬১ রানের প্রয়োজন ছিল ভারতের। এরপর জাদেজাকে ফেরান রুবেল ও ভুবনেশ্বর কুমারকে মুস্তাফিজ আউট করলে খেলা জমিয়ে তোলে বাংলাদেশের বোলাররা। এসময় আবার মাঠে নামেন ইনজুরি আক্রান্ত কেদার যাদব। শেষ দিকে কুলদিপ যাদবকে নিয়ে নিয়ে শেষ বলে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন এই অলরাউন্ডার।

এর আগে দুবাই ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়ামে ফাইনালে টস জিতে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠান ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা। আর টাইগারদের ব্যাটিংয়ের শুরুটা ছিল স্বপ্নের মতো। দারুণ চমকে লিটন কুমার দাসের সঙ্গে ব্যাট হাতে ওপেনিংয়ে নামেন মেহেদী হাসান মিরাজ। আর ওপেনিং এ দু’জন গড়েন ১২০ রানের জুটি। ২১তম ওভারে দলীয় ১২০ রানে প্রথম উইকেট হারায় বাংলাদেশ। ততক্ষণে চিন্তার ভাঁজ ধোনি-রোহিতদের কপালে। কিন্তু এর পর টাইগাররা দেখায় ঠুনকো ব্যাটিং। পরের ৩১ রানে পাঁচ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যচ্যুত হয় মাশরাফি বাহিনী। ১৭.৫তম ওভারে বাংলাদেশের দলীয় ১০০ রান পূর্ণ হয়। গত দুই বছরে এটি বাংলাদেশের ওপেনিং জুটিতে প্রথম শতরানের ঘটনা। আর ওয়ানডেতে এটা ভারতের বিপক্ষে ওপেনিংয়ে সর্বোচ্চ রানের জুটি। এবারের এশিয়া কাপে বাংলাদেশের ওপেনিং জুটির সংগ্রহ ছিল ১, ১৫, ১৫, ১৬, ৫ রান। গতকাল ৩৩ বলে ৬টি চার দুই ছক্কায় অর্ধশতক পূর্ণ করেন লিটন।

এতে ইনিংসের ১০ ওভার শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ পৌঁছে ৬৫/০-তে। এবারের এশিয়া কাপের শুরুর ১০ ওভারে যে কোনো দলের এটি সেরা নৈপুণ্য। ২০.৫তম ওভারে ব্যক্তিগত ৩২ রানে ভারতীয় স্পিনার কুলদীপ যাদবের বলে উইকেট দেন মেহেদী হাসান মিরাজ। ওয়ানডাউনে প্রমোশন নিয়ে অল্পতে উইকেট খোয়ান ইমরুল কায়েস। পরে ক্রিজে আসা যাওয়ার মিছিলে যোগ দেন মুশফিকুর রহীম ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। ৪ রান করে কুলদীপ যাদবের বলে বুমরাহর হাতে ধরা পড়েন মাহমুদুল্লাহ। আর ব্যক্তিগত ৫ রানে কেদার যাদবের বলে ডিপ মিড উইকেটে বুমরার হাতে ক্যাচ দেন মুশফিকুর রহীম । ৩২.৩তম ওভারে ১৫২/৫ সংগ্রহ নিয়ে চাপ পড়ে টাইগাররা। এর আগে ক্যারিয়ারে প্রথম বারের মতো ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি করেন লিটন দাস। ভারতের বিপক্ষে ফাইনালে ৮৭ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন লিটন। ২ রান করে রান আউটের ফাঁদে পড়েন মোহাম্মদ মিঠুন। বাংলাদেশের ইনিংসে রানআউটে কাটা পড়ে তিন উইকেট।