Sun. Nov 17th, 2019

BANGLANEWSUS.COM

-ONLINE PORTAL

শতাধিক পরিবারে সম্ভাবনার হাতছানি

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর মৌডুবীর চরাঞ্চলে নরসুন্দরের কাজ করে জীবনে অভাবে ঘুচাতে পারেননি শুধাংশ চন্দ্র শীল। এই অভাবের মধ্যেও ছেলে সৌরভ চন্দ্র শীলকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন তিনি। শিক্ষা অর্জনের পর সোনার হরিণ সরকারি চাকরির অনিশ্চয়তায় নরসুন্দরের কাজে ঝুঁকছিলেন সৌরভ।

তবে ২৯ জুন পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। এরই মধ্যে ঘটে যায় হৃদয় বিদারক এক ঘটনা। টানা ছয় মাস কিডনি রোগে আক্রান্ত শুধাংশ চন্দ্র শীল ৬ জুলাই পরপারে পাড়ি জমান। এতে ছেলেকে পুলিশের ইউনিফর্ম দেখে যেতে পারলেন না বাবা। কান্না জড়িত কণ্ঠে এসব কথা জানাচ্ছিলেন পুলিশের কনস্টেবল পদে নিয়োগ পাওয়া সৌরভ চন্দ্র শীল।

শুধু সৌরভ নয়, ১৩০ জন নিয়োগপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবলে সবাই হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। সৌরভের মতো চাকরিপ্রাপ্ত আরেক যুবক মো. আসিফ গাজী।

তিনি বলেন, বাবা ফরিদ গাজী পেশায় একজন মেকানিক। কোনোভাবে পরিবারের চাহিদা মেটাতেন বাবা। জেলা সদরের লাউকাঠি ইউপির সরকারি আবাসন প্রকল্পের ৮৯ নম্বরে ঘরে থাকি। নিজস্ব বাড়ি না থাকায় র্দীঘদিন জেলা শহরের ভাড়াটিয়া বাসায় বসবাস করি। এরপর সরকারি সহায়তায় র্দীঘ ১১ বছর যাবত আবাসনে বসবাস করছে আমাদের পরিবার। বড় ভাই আরিফ প্রতিবন্ধী। ছোট ভাই রবিউল অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। বাবা জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম করে আমাকে পড়িয়েছেন। বাবার কষ্ট আজ সফল হয়েছে। এ চাকরির মাধ্যমে তার জীবনের পরিশ্রমের তৃপ্তি ঘটেছে।

আসিফের বাবা ফরিদ গাজী আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন, ছেলেকে লেখাপড়া করেছি। কিন্তু ভাবিনি বিনা টাকায় চাকরি হবে। সমাজে টাকা ছাড়া কিছুই হয় না, সেখানে কি করে বিশ্বাস করি ১০৩ টাকা পুলিশে চাকরি হবে। পটুয়াখালী এসপি স্যারের পক্ষ থেকে এলাকায় ১০৩ টাকায় চাকরির প্রচার হাস্যকর মনে হয়েছিল। আসিফ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে পরীক্ষায় অংশ নেয়। পরে শুনি তার চাকরি হয়েছে। র্দীঘ ৪০ বছর দারিদ্রতার ঘানী টেনে ঘরে আনন্দের সুখ বইছে। এজন্য এসপি স্যারের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করছি। তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করছি।

আরেক নিয়োগপ্রাপ্ত বায়েজিদের বাবা আবুল কালাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্ত্রী মানসিক রোগী। নিজে চায়ের দোকান দিয়ে সংসার চালাতাম। এই অল্প আয় দিয়ে ছেলেকেও পড়াই।  কখনও ভাবিনি ছেলের সরকারি চাকরি হবে।  এ জন্য এসপি স্যার ও প্রধানমন্ত্রী কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

নিয়োগপ্রাপ্ত শাহারা আক্তার বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পর কোনো রকমে সংসার চলতো।  র্দীঘ পাঁচ বছর ধরে দাদীর সঙ্গে বসবাস করছি। এক ভাই ছরোয়ার আনসার সদস্য পদে নতুন যোগ দিয়েছেন। বৃদ্ধা দাদীর কাছে থেকে শত কষ্টের মাঝেও লেখাপড়া চালিয়েছি। কখনো ভাবেনি বিনা টাকায় চাকরি হবে। ভাগ্যের উপর নির্ভর করে আবেদন করি। সৎভাবে চাকরি পেয়েছি। কথা দিলাম, কোনো দিন অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জন করব না।  আমার জীবনে এসপি স্যার একটি অধ্যায় হয়ে থাকবেন। কারণ তার জন্য আমি বাঁচার সুযোগ পেয়েছি।

মির্জাগঞ্জ উপজেলার আন্দুয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর হোসেনের ছেলে মো. রাসেদ সিকদার বলেন, প্রথমে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেই। পরে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেইনি। টাকা লাগবে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে নিষেধ করা হয়। মৌখিক পরীক্ষার দিন পটুয়াখালীর এসপি মইনুল হাসান স্যার ফোন করে পরীক্ষা অংশ নিতে বলেন। তার কথামত পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মাত্র ১০৩ টাকা চাকরি পেলাম। এসপি স্যার নিজে ফোন না করলে হয়তো আমার চাকরিটা হতো না।  এ রকম চরপাড়া এলাকার গাছ ব্যবসায়ী সুলতান গাজীর চেলে রুহুল আমিন, মরিচ বুনিয়ার দিনমজুর  মজনু মাতবরের ছেলে মো. শামীম হোসেন, গলাচিপার পাড়ডাকুয়া হোটেল কর্মচারী ইউসুফ মাতুব্বরের ছেলে রাব্বি মাতুব্বরসহ অন্তত ১১৭ জনের চাকুরি হয়েছে।

পটুয়াখালী পৌর মেয়র মহিউদ্দিন আহম্মেদ জানান, সরকারের উন্নয়নের ধারাবাকিতায় পুলিশ নিয়োগ স্বচ্ছতার আরো একটি দৃষ্টান্ত। এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, এসপি মইনুল হাসানসহ পুলিশ বিভাগকে অভিনন্দন।

এ প্রসঙ্গে পটুয়াখালীর এসপি মো. মইনুল হাসান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আইজিপি স্যারের নির্দেশে পটুয়াখালীতে পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরিতে শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সবাই মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পেয়েছে।

Copyright © Banglanewsus.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.