শিক্ষাবান্ধব নিয়োগবিধি ও জীবনের স্বপ্ন

প্রকাশিত:রবিবার, ০৯ আগ ২০২০ ০১:০৮

শিক্ষাবান্ধব নিয়োগবিধি ও জীবনের স্বপ্ন
মোঃ শহীদ উল্লাহ
সভাপতি
বাংলাদেশ উপজেলা শিক্ষা অফিসার কল্যাণ সমিতি।
প্রতিটি মানুষই স্বপ্ন দেখে । নিদ্রিত অবস্থায় মানুষ শ্বাস প্রশ্বাস ছাড়া আর যে কাজটি করতে পারে তা হচ্ছে স্বপ্ন দেখা। মানুষ নানা রকম স্বপ্ন দেখে । কিছু স্বপ্ন আনন্দদায়ক আর কিছু ভয়ঙ্কর বেদনাদায়ক । আবার স্বপ্ন রোমান্টিক হয় । নিদ্রিত অবস্থায় মানুষ নানা রকমের স্বপ্ন দেখলেও জাগ্রত অবস্থায় কেবল উন্নত জীবনের স্বপ্নই দেখে। অবসর সময়ে মানুষ তার কল্পনায় উন্নত জীবনের যে ছবি হৃদয় পটে আঁকে তা তাকে সামনে এগিয়ে যাবার পথ দেখায়। জীবনকে আরো সুন্দর করতে অনুপ্রাণিত করে । মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। একজন মানুষ ভবিষ্যৎ জীবনের যেরূপ স্বপ্ন দেখে তার কর্ম ও মানসিকতা তেমনি হয়। অন্তত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। ভবিষ্যত জীবনের স্বপ্ন বড়দের চেয়ে ছোটরাই বেশি দেখে। শিশু মন বড়ই কল্পনাবিলাসী। তারা কল্পনা করতে পছন্দ করে।
স্বপ্ন তৈরীর মানুষ হচ্ছেন শিক্ষক । বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকগণ শিশুদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখতে উদ্বুদ্ধ করেন। তারা শিশুমনে স্বপ্ন তৈরি করেন । প্রাথমিক শিক্ষার জাতীয় লক্ষ্যেও বাংলাদেশের শিশুদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করতে বলা হয়েছে। কাজেই প্রাথমিক শিক্ষক কেবলই শিক্ষক নন তারা শিশুদের স্বপ্নের স্রষ্টা।
যে শিক্ষক শিশুকে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখাবেন সেই শিক্ষকেরই নেই নিজের জীবনের স্বপ্ন। শিক্ষক তো আজীবনই শিক্ষক। চাকরির সীমিত সুযোগের জন্য অনেক উচ্চশিক্ষিত মেধাবী শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। এমনই একজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তার স্বপ্নভঙ্গের কাহিনী । তার উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষার কর্ণধার উপজেলা শিক্ষা অফিসার তার ছাত্রের সহপাঠী। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও শিক্ষকতায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও উচ্চপদে তাদের পদোন্নতি না দিয়ে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। প্রকারান্তরে ছাত্রদের দ্বারা শিক্ষককে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ২০-২৫ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শিক্ষকের কাজ অনভিজ্ঞ কর্মকর্তার দ্বারা তত্ত্বাবধান করা হচ্ছে। সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শিক্ষকের পাঠদান পর্যবেক্ষণ করে পাঠের মান উন্নয়নে কী পরামর্শ দেবেন তা বোধগম্য নয় ।প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বিদ্যমান । একজন উচ্চ যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষক দক্ষতার সাথে ৪/৫ বছর পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনার পর তারই সমযোগ্যতা সম্পন্ন সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত একজন ইন্সপেক্টর এর কাছে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।এ বিষয়গুলো শিক্ষকদের ওপর নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলে।
তার কাছ থেকে আরো জানতে পারি , শিশুর মনে স্বপ্ন তৈরি করতে গিয়ে শিক্ষক কিভাবে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। তিনি একদিন শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করলেন – “তোমরা বড় হয়ে কি হতে চাও ” ?
শিশুরা তাকে প্রশ্ন করে কী কী হওয়া যায়?
ডাক্তার ,ইঞ্জিনিয়ার, জজ, ব্যারিস্টার, বিমানের পাইলট , অধ্যাপক, বিজ্ঞানী ইত্যাদি তিনি বললেন।
কেমন করে এসব হওয়া যায়, শিশুরা তাও জানতে চাইল।
তিনি বললেন, এসব কিছু হওয়ার জন্য ভালো করে পড়তে হবে । বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বড় ডিগ্রী নিতে হবে । অনেক লেখাপড়া করতে হবে।
শিশুদের আবার প্রশ্ন — স্যার আপনাদের সবচেয়ে বড় অফিসার কে?
শিক্ষক বললেন, মহাপরিচালক।
স্যার, আপনি কবে মহাপরিচালক হবেন ?
না ,আমি হবো না।
তাহলে কি হবেন, স্যার ?
না ,কিছু না।
তাহলে বুঝি আপনি ভাল করে লেখাপড়া করেননি?
শিক্ষক খানিকটা বিব্রত হয়ে ক্ষীণ গলায় বললেন, আমার সময় নেই।
কেন নেই ,স্যার?
তখন শিক্ষক বিদ্যালয়ের সামনে একটি ছোট রেইনট্রি দেখিয়ে বললেন , “আমরা যদি গাছটির চারপাশে বেড়া দেই এবং তার গোড়ায় নিয়মিত পানি ও সার দেই, যথাযথ পরিচর্যা করি তাহলে গাছটি দ্রুত বড় হবে , তাই না”?
জি ,স্যার।
আবার লক্ষ্য করো তোমাদের বসার বেঞ্চটিও গাছ কেটে তৈরি করা হয়েছে। সেটিও একদিন গাছ ছিল। কিন্তু এখন যদি আমরা বেঞ্চের গোড়ায় পানি ও সার দেই , যথাযথ পরিচর্যা করি তাহলে কি এটা বড় হবে?
না স্যার।
তোমরা হলে চারা গাছের মতো ।যত বেশি পরিচর্যা করা যাবে তোমাদের জীবন ততই উন্নত হবে। আর আমি গাছ দিয়ে তৈরি আসবাবপত্রের মতো। যার কোন পরিবর্তন ও পরিবর্ধন নেই । আমাদের নেই কোনো স্বপ্ন। আমরা স্বপ্ন দেখি না ।স্বপ্ন দেখাই । আমাদেরও তোমাদের মত জীবনে অনেক স্বপ্ন ছিল। শিক্ষকতা পেশায় এসে হারিয়ে ফেলেছি সব স্বপ্ন -সাধ।
একই রকম হতাশা রয়েছে ২৫-৩০ বছর যাবৎ কর্মরত সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের মাঝেও । AUEO হতে UEO পদে বিদ্যমান পদন্নোতির কোটা ২০ % । যা AUEO এর মোট পদের ৪% এরও কম। ১৯৮৯ সালে যোগদানকৃত AUEOদের অনেকেই ইতোমধ্যে স্বপদে থেকে অবসরে গেছেন। আবার তাদের কিছু সংখ্যক UEO পদে চলতি দায়িত্বে আছেন। ৩০ বছরেও তাদের ভাগ্যে একটি পদোন্নতি জুটেনি । শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর, অপর দিকে সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারগন দক্ষ শিক্ষক তৈরীর কারিগর । তারা শিক্ষকদের বিভিন্ন ইন -সার্ভিস প্রশিক্ষণ পরিচালনা , শ্রেণি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা দান ও উদ্বুদ্ধ করনের মাধ্যমে শিক্ষকদের আরো দক্ষ করে গড়ে তোলেন। তাই তাদের সবার জন্য পদোন্নতির সুযোগ তৈরি করা আবশ্যক । যাতে তাদের মাঝে কর্ম উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরাধীন আরো অনেক পদ রয়েছে যেগুলো বিদ্যমান নিয়োগ বিধির অন্তর্ভুক্ত নয়। একই পদে চাকরি করাই তাদের তাদের নিয়তি। তাই তাদের সবার জন্যও পদোন্নতি সুযোগ তৈরি করা আবশ্যক ।
যাতে তাদের মাঝে সৃষ্টি হয় কর্ম উদ্দীপনা, দূর হয় হতাশা। বৃদ্ধি পায় কাজের মান ও পরিমাণ।
শিক্ষকগণের মত অফিস স্টাফদের ভাগ্যেরও কোন পরিবর্তন নেই। একজন অফিস স্টাফ সারা জীবন অফিস স্টাফ হিসেবেই কাজ করে অবসরে যান। AMO এর বহু পদ বছরের পর বছর ধরে শূন্য রয়েছে। অফিস স্টাফদের সহকারী মনিটরিং অফিসার পদে পদোন্নতিসহ বিভাগীয় কার্যালয় ও অধিদপ্তরে তাদের পদোন্নতির জন্য পদ সৃষ্টি করা আবশ্যক। অফিস ব্যবস্থাপনায় তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য । তাদেরও পদোন্নতির সিঁড়ি থাকা অপরিহার্য । অন্যথায় তাদের মাঝেও তৈরি হবে হতাশা । কাজে আসবে স্থবিরতা ।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক , শিক্ষা কর্মকর্তা ও অফিস স্টাফদের দেখাতে হবে উন্নত জীবনের স্বপ্ন। স্বপ্নহীন মানুষ মৃত মানুষের মত। তারা আকন্ঠ হতাশায় নিমজ্জিত । হতাশাগ্রস্ত মানুষের কাছ থেকে উচ্চ প্রত্যাশিত ফল আশা করা যায় না । সবার মাঝে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও অনুপ্রেরণা তৈরির পদক্ষেপ নেয়ার এখনই সময়। সবার মাঝেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের গর্বিত অংশীদার হওয়ার বাসনা রয়েছে। তাদের এ আকাঙ্ক্ষাকে বেগবান করতে হবে।
শিশুদের কাছে শিক্ষকের মর্যাদা অনেক বড় । আমাদেরও শিক্ষককে বড় ভাবতে হবে । দিতে হবে তাদের যোগ্য মর্যাদা। তাদের জন্য তৈরি করতে হবে শিক্ষা বান্ধব নিয়োগ বিধি। শিক্ষক হতে উর্দ্ধতন সকল পদে শতভাগ পদোন্নতির বিধান রাখতে হবে । যে নিয়োগ বিধির বলে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের মহাপরিচালক পর্যন্ত সকল পদ পর্যায়ক্রমে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকদের দ্বারা পূরণ করা হবে। যে নিয়োগবিধি প্রাথমিক শিক্ষায় কর্মরত সকল শিক্ষক , কর্মকর্তা ও স্টাফদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণে সহায়ক হবে।
বহুল প্রত্যাশিত সেই নিয়োগবিধি প্রাথমিক শিক্ষায় কর্মরত সবাইকে উজ্জীবিত করতে পারে। তাদের দেখাবে ভবিষ্যত জীবনের স্বপ্ন । তাদের কর্মে জোগাবে উৎসাহ-উদ্দীপনা । দূর হবে হতাশা । হতাশাগ্রস্ত একজন মানুষের চেয়ে উৎসাহ প্রনোদিত মানুষের কাজের মান ও পরিমাণ দু’টোই বেশি।
সম্প্রতি আমাদের সকলের প্রিয় পরম শ্রদ্ধাভাজন সিনিয়র সচিব জনাব মোঃ আকরাম-আল-হোসেন ও মহাপরিচালক জনাব মোঃ ফসিউল্লাহ স্যার স্বপ্নহীন শিক্ষক ,কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্বপ্নের কথা বলেছেন । স্বপ্ন দেখিয়েছেন । তাঁরা আমাদের স্বপ্নের দুয়ার উন্মোচিত করে ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন – এমনটিই আমাদের সবার প্রত্যাশা।

এই সংবাদটি 1,229 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ