শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের অঙ্গীকার

মো. আকতারুল ইসলাম : ‘সুস্থ শ্রমিক, নিরাপদ জীবন-নিশ্চিত করে টেকসই উন্নয়ন’’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ পালিত হচ্ছে জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস। এ বছর নিয়ে তৃতীয়বারের মতো জাতীয়ভাবে এ দিবসটি পালন করছে সরকার। পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি নীতিমালা-২০১৩ এর নির্দেশনা অনুযায়ী পেশাগত স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এ দিবসটি পালিত হচ্ছে।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি হলো শ্রমিক-মালিক ও বিভিন্ন পর্যায়ের শ্রমজীবী মানুষ। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উন্নয়নের মহাসড়কে প্রবেশ করেছে। বর্তমান সরকার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য টেকসই শিল্পায়নের কোনো বিকল্প নেই। টেকসই উন্নয়নের অগ্রযাত্রার লক্ষ্যে জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য যথার্থ।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ২০১৩ সালে মর্মান্তিক রানা প্লাজা দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি সংকটে পড়ে। বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার ২০১৩ সালে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ২০০৬ সালের বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধন করে কর্মক্ষেত্রে পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো যুগোপযোগী করে।

সরকার ওই বছরই কর্মক্ষেত্রে পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটির গুরুত্ব, স্টেকহোল্ডারদের ভূমিকা ও দায়িত্ব স্পষ্ট করে জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে কারখানা পরিদর্শন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সময়ের চাহিদায় মাত্র নয় মাসের মধ্যে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরকে অধিদপ্তর করা হয়। বিগত পাঁচ বছরে এ সংস্থায় প্রায় এক হাজার জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার বিষয়ে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে।

কারখানার কর্মপরিবেশ, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক স্থাপন, শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, শ্রমিকের অধিকার আদায়ে সর্বোপরি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎপাদন বৃদ্ধিতে কলকারখানা অধিদপ্তর অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কলকারখানা পরিদর্শন কার্যক্রমে গতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা আনয়নের জন্য লেবার ইন্সপেকশন ম্যানেজমেন্ট এপ্লিকেশন-লিমা (খধনড়ঁৎ ওহংঢ়বপঃরড়হ গধহধমবসবহঃ অঢ়ঢ়ষরপধঃরড়হ -খওগঅ) অ্যাপস চালু করা হয়েছে।

শ্রম পরিদর্শকগণ মালিক-শ্রমিকের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে। পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আইন করে শ্রমিকদের শিশুদের জন্য ৪ হাজার ২শ’ ৪৩ কারখানায় ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। শ্রমিকের জন্য এখন পর্যন্ত যে কয়টি ভালো এবং গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকের চিকিৎসার জন্য তিনশ’ শয্যার একটি হাসপাতাল নির্মাণ করা হচ্ছে। এ হাসপাতালে একশ’ শয্যা শ্রমিকদের জন্য সংরক্ষণ করা হবে। নামমাত্র মূল্যে বিশেষায়িত এই হাসপাতালে শ্রমিকরা চিকিৎসা সুবিধা পাবেন।

পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটির বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে ৩৮টি কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে তৈরি পোশাকশিল্প এবং চিংড়িশিল্পকে শতভাগ শিশুশ্রম মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এ বছরের মধ্যে আরো ১১টি সেক্টরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিশুশ্রম নিরসনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

সম্প্রতি দু’টি খাত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি পাথর কোয়ারী এবং অন্যটি নির্মাণশিল্প। কখনো কখনো পাথর কোয়ারিতে শ্রমিক মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। অন্যদিকে কোথাও না কোথাও নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। নির্মাণ শ্রমিকদের একটু অসতর্কতার জন্য তাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। হেলমেট আর সেফটি বেল্ট ব্যবহার করলে অনেকাংশে নির্মাণ শ্রমিকরা অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা এড়াতে পারেন। পাথর কোয়ারী এবং নির্মাণশিল্পের সাথে পাথরভাঙ্গা শ্রমিকদের সচেতনতা বৃদ্ধিও দিনে দিনে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এসব বিষয় আমলে নিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি বিষয়ক নীতিমালাসমূহের যথাযথ বাস্তবায়ন, কর্মক্ষেত্রের উন্নয়ন এবং পেশাগত রোগ শনাক্তকরণ প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিষয়ক গবেষণার জন্য পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারখানা মালিক শ্রমিকদের মধ্যে পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে এ বিষয়ে মালিকদের আগ্রহ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সরকার এ বছর থেকে ১০টি কারখানাকে পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি উত্তম চর্চা পুরস্কার ওএসএইচ গুড প্রাকটিস এওয়ার্ড (ঙঝঐ এড়ড়ফ চৎধপঃরপব অধিৎফ) প্রদান করবে।

বাংলাদেশ শ্রম আইনের আলোকে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিল গঠন করেছে। এ তহবিল থেকে দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের স্বজনদের দুই লাখ, দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা এবং শ্রমিকের সন্তানের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষা সহায়তা প্রদান করছে।

এছাড়া গার্মেন্টস শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের জন্য গঠিত কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঘটলে সর্বোচ্চ তিন লাখ এবং দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত গার্মেন্টস শ্রমিকদের চিকিৎসায় দুই লাখ এবং তাদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা শিক্ষা সহায়তা প্রদান করছে।

মূলত: সরকার মালিক এবং শ্রমিকদের পারস্পরিক সহযোগিতায় কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও সেফটির বিষয়ে সবার মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে বাড়বে শ্রমিকের কর্মদক্ষতা। নিরাপদ কর্মপরিবেশে বাড়বে উৎপাদন, নিশ্চিত হবে টেকসই উন্নয়ন এর লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাবো- এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক : সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.