সপরিবারে মুজিব হত্যার প্রতিক্রিয়ায় হেনরী কিসিঞ্জার ‘বাংলাদেশ কখনো ভারতের আধিপত্য মেনে নেবে না’

কাউসার মুমিন :১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট  বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবিসংবাদিত নেতা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় নিজস্ব বাসভবনে সপরিবারে নিহত হওয়ার খবর ওয়াশিংটন ডিসিতে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার যখন শুনতে পান তখন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, শেখ মুজিব বিশ্বের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ বোকা। হেনরী কিসিঞ্জার বলেন, আমি সবসময়ই জানতাম, বাংলাদেশ কখনো ভারতের আনুগত্য মেনে নেবে না। আমি ৭১ সাল থেকেই জানতাম যে, স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি করে ভারত যে ভুল করেছে, এর জন্য ভারতকে একদিন দুঃখ প্রকাশ করতে হবে।’ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্টেট্ ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক গোপন দলিল যা সম্প্রতি ডিক্লাসিফাইড করা হয়েছে তা থেকে উপরোক্ত তথ্য জানা গেছে। স্টেট্ ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক ‘যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতি (১৯৭৪-৭৬)’ শীর্ষক সম্প্রতি জনসম্মুখে উন্মোচিত দলিলপত্রের ৪২ নম্বর দলিলে উপরোক্ত তথ্য পাওয়া গেছে।

 

১৫ আগস্ট ১৯৭৫, শুক্রবার।  ওয়াশিংটন ডিসিতে স্থানীয় সময় সকাল ৮টা। স্টেট্ ডিপার্টমেন্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জারের ব্রিফিংরুম।  প্রাত্যহিক সকাল বেলার এই ব্রিফিংয়ে উপস্থিত স্টেট্ ডিপার্টমেন্টের সকল গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা। কিন্তু, এই ব্রিফিংটি দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে বাংলাদেশ বিষয়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ঐদিনই ভোররাতে ঢাকায় নিজ বাস ভবনে সপরিবারে নিহত হয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। তাই এদিনের সকালবেলার ব্রিফিংয়ে অন্যসকল বিভাগ ও অনুবিভাগের প্রধান প্রধান কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিশেষভাবে উপস্থিত রয়েছেন স্টেট্ ডিপার্টমেন্টের আন্ডার সেক্রেটারী অফ স্টেট্ ফর পলিটিক্যাল এফেয়ার্স জোসেফ সিস্কো, নিকট প্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক  এসিস্টেন্ট সেক্রেটারী অফ স্টেট্ (১৯৭৩-৭৬) আলফ্রেড এথারটন, ব্যুরো অফ ইন্টেলিজেন্স এন্ড রিসার্চ (আই এন আর) -এর তৎকালীন ডিরেক্টর জোসেফ হাইল্যান্ড।

 

যথারীতি আলোচনা শুরু করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার নিজেই। প্রথমেই তিনি বলেন, লেট’স টক এবাউট বাংলাদেশ। প্রথমে এসিস্টেন্ট সেক্রেটারী অফ স্টেট্ আলফ্রেড এথারটন শুরু করেন এই বলে যে, বাংলাদেশে একটি সুপরিকল্পিত এবং তাৎপর্য্যপূর্ণ ক্যু সংগঠিত হয়েছে। হেনরী কিসিঞ্জার প্রশ্ন করেন, এর মানে কি? মুজিবুর কি জীবিত না মৃত? এথারটন জানান, শেখ মুজিব তাঁর পরিবার পরিজন স্ত্রী, পুত্র ,ভাই, ভাগ্নেসহ সপরিবারে নিহত হয়েছে। হেনরী কিসিঞ্জার তখন বলেন, ব্যুরো অফ ইন্টেলিজেন্স এন্ড রিসার্চ (আই এন আর) থেকে আমি ভালো ভালো পরামর্শ পাচ্ছি।জবাবে ব্যুরো অফ ইন্টেলিজেন্স এন্ড রিসার্চ (আই এন আর) -এর ডিরেক্টর জোসেফ হাইল্যান্ড তখন আলোচনায় অংশ নেন।  তিনি হেনরী কিসিঞ্জারের উদ্দেশ্যে বলেন, আমি যখন আপনার সাথে কথা বলেছিলাম তখনও মুজিব নিহত হননি। হেনরী কিসিঞ্জার তখন হাইল্যান্ডকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তাই নাকি? তবে কি তারা এর (আমাদের আলাপচারিতা শেষ হওয়ার) কিছুক্ষন পরে হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে?

 

এবার এসিস্টেন্ট সেক্রেটারী আলফ্রেড এথারটন কিছুটা বিস্তারিত  বলার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, আমি এখনই বলতে পারছি না যে আমরা সবকিছু এখনই জানতে পেরেছি।তবে যদ্দুর জানা গেছে, তা থেকে দেখা যায় মুজিবুরকে হত্যা করার পরিকল্পনা নিয়েই তারা এই ক্যুটি ঘটিয়েছিল। অন্তত এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত সকল তথ্য-উপাত্ত তা-ই বলে। তারা মুজিবুরের বাড়ী ঘিরে রাখে, ভেতরে প্রবেশ করে এবং তাঁকে হত্যা করে। আমরা এখন পর্যন্ত এটুকুই জানতে পেরেছি।  এবার হেনরী কিসিঞ্জার বলেন, আমরা কি এটি (মুজিবকে হাতের পরিকল্পনা করছে কেউ কেউ) গত বছর মুজিবকে বলিনি? এসিস্টেন্ট সেক্রেটারী এথার্টন বলেন, গত মার্চ মাস থেকে এ বিষয়ে (মুজিব হত্যা পরিকল্পনা) আমরা প্রচুর লক্ষণ দেখতে পাচ্ছিলাম। হেনরী কিসিঞ্জার জানতে চান, আমরা কি এ সম্পর্কে মুজিবকে জানাইনি ? জবাবে আলফ্রেড এথারটন বলেন, আমরা ওই সময়ই (মার্চ মাসে) তাঁকে (মুজিব) জানিয়েছি। হেনরী কিসিঞ্জার আবার প্রশ্ন করেন, আমরা কি তাঁকে (মুজিব) বলিনি যে মোটামুটিভাবে কারা এই হত্যাকান্ড ঘটাতে পারে? এসিস্টেন্ট সেক্রেটারী আলফ্রেড এথারটন এ পর্যায়ে হেনরী কিসিঞ্জার কে বলেন, হত্যা পরিকল্পনাকারীদের নামধাম শেখ মুজিবকে জানিয়েছিলাম কি না তা একটু খোঁজখবর নিয়ে আমি আপনাকে পরে জানাচ্ছি।

 

এ সময় আলোচনায় আবার অংশ নেন ব্যুরো অফ ইন্টেলিজেন্স এন্ড রিসার্চ (আই এন আর) -এর তৎকালীন ডিরেক্টর জোসেফ হাইল্যান্ড। হাইল্যান্ড বলেন, আমরা আসলে সম্ভাব্য হত্যাপরিকল্পনার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের নামধাম উল্লেখ করার বিষয়ে কিছুটা অস্পষ্ট ছিলাম। এসিস্টেন্ট সেক্রেটারী এথারটন তাৎক্ষণিকভাবে বলেন, আসলে মুজিব আমাদের দেওয়া তথ্য বিশ্বাস-ই করেননি। তিনি এগুলোকে গুজব বলে উড়িয়ে দেন। মুজিব বলেন, কোনো বাঙালী তাঁকে (মুজিব) মারার সাহস করবে না। তখন হেনরী কিসিঞ্জার বলেন, সে (মুজিব) একটা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বোকা। এ পর্যায়ে এসিস্টেন্ট সেক্রেটারি এথারটন বলেন, কিন্তু, সবকিছু এখন ক্যু পরিচালনাকারীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। হেনরী কিসিঞ্জার এবার জানতে চান, এরা (ক্যু পরিচালনাকারীরা) কারা ? এসিস্টেন্ট সেক্রেটারী আলফ্রেড এথারটন বলেন, এরা মধ্য পর্যায়ের এবং সিনিয়র পর্যায়ের সেনা কর্মকর্তা, । এর আগের প্রশাসনের (মুজিব প্রশাসন) মতো এরা ভারত ও সোভিয়েত পন্থী নয়, এরা প্রো-আমেরিকান। হেনরী কিসিঞ্জার বলেন, এরা যে আমেরিকা পন্থী হবে সেটা অবশ্য অপ্রতিরোধ্য ছিল না। কারণ, সত্যি বলতে আমি ভেবেছিলাম এরা নিশ্চিতভাবে ভারত-বিরোধী কিন্তু চায়না পন্থী হবে। হেনরী কিসিঞ্জার বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম এবং এটি আমি সবসময়ই জানতাম যে, স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি করার জন্য ভারত একদিন দুঃখ প্রকাশ করবে। কারণ, বাংলাদেশ কখনো ভারতের আনুগত্য মেনে নেবে না। একাত্তুর সালেই এটি আমি ঠের পেয়েছিলাম।’

 

জীবদ্দশায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন।  এ সফরে তিনি ২৫ সেপ্টেন্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সম্মেলনে বাংলায় ভাষণ প্রদান করেন। এ বছর ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় নিউইয়র্কে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার। এটি ছিল হেনরী কিসিঞ্জারের সাথে শেখ মুজিবের প্রথমবারের মতো দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। পরদিন ১লা অকটোবর ১৯৭৪ যুক্তরাষ্ট্র সময় বিকেল ৩টায়  শেখ মুজিবুর রহমান হোয়াইট হাউজে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরার্ড ফোর্ডের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে স্বীকৃত, আধুনিক আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বেশী প্রাজ্ঞ ও চৌকষ কূটনীতিবিদ এবং  ঠাণ্ডাযুদ্ধত্তোর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রধান আর্কিটেক্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার নিউ ইয়র্কের ওয়ালড্রফ টাওয়ার হোটেলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের হোটেল স্যুটে সাক্ষাৎ করেন।  এই সাক্ষাৎকারের ট্রান্সক্রিপশন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শেখ মুজিবের সাথে পুরো আলোচনায় হেনরী কিসিঞ্জার কুবি হালকা মুডে ছিলেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে শেখ মুজিবের কথাকে কেন্দ্র করে হেনরী কিসিঞ্জার অপ্রাসংগিক কৌতুক করেছেন। আলোচনায় শিমলা চুক্তি, পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষ করে বাংলাদেশ নীতি, বাংলাদেশের উন্নয়ন, খাদ্য সাহায্য এবং একাত্তুর সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও পশ্চিম পাকিস্তানের কারাবাসে শেখ মুজিবের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ইত্যাদি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। এই সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডক্টর কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন; যাকে হেনরী কিসিঞ্জার নিজের ছাত্র বলে শেখ মুজিবের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন নতুন করে। সাক্ষাৎকারে এক পর্যায়ে শেখ মুজিব তাঁর  কারাবাসের বর্ণনা দিতে গিয়ে কিভাবে পশ্চিম পাকিস্তানীরা তাঁকে হত্যার জন্য চেষ্টা করেছে বার বার, কিভাবে কারাগারে তাঁর জন্য কবর খোঁড়া হয়েছে ইত্যাদি বিষয় হেনরী কিসিঞ্জারের সাথে বিনিময় করেন। তখন কৌতুকছলে হেনরী কিসিঞ্জার শেখ মুজিবকে বলেন, কথায় আছে, বিড়াল আটবার জীবন পায়, আপনি আরও সাত বার জীবন পাবেন।’ শেখ মুজিবের মতো একজন নেতাকে নিয়ে এ ধরণের হালকা কৌতুক কূটনৈতিক সুলভ নয়।  কিন্তু, খুব সম্ভবত শেখ মুজিব এই কৌতুকের তাৎপর্য্য বুঝতে পারেন নি কিংবা বুঝেও না বুঝার ভাণ করেন এবং নিজের বক্তব্য চালিয়ে যান।

 

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (এমআইটি)’র প্রফেসর গ্যারী জে বাস কর্তৃক রচিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক গবেষণা গ্রন্থ ‘ব্লাড টেলিগ্রাম : নিকসন, কিসিঞ্জার এন্ড এ ফরগটেন জেনোসাইড’-এ কিভাবে তৎকালীন নিক্সন-কিসিঞ্জারের পররাষ্ট্রনীতি পাকিস্তান কর্তৃক তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে ( বর্তমান বাংলাদেশে) গণহত্যায় ভূমিকা রেখেছে তাঁর দালিলিক প্রমাণসমূহ তুলে ধরা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.