সময় অসময় ২

প্রকাশিত:শনিবার, ০৪ জুলা ২০২০ ০৫:০৭

সময় অসময় ২
মীর লিয়াকত: কুয়েতে মানবপাচারের  আলোড়ন সৃষ্টিকারী কাহিনীতে আমাদের পাপলু এমপি সাহেব বাংলাদেশের ললাটে কালি লেপন করে বিশ^ ব্যাপী দেশের ‘সুনাম’ প্রচার করছেন! সাধারন একজন মানুষ থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক কিভাবে হলেন তা আর কারো অজানা নয়। লক্ষনীয় যে শুধু ঐ এমপি সাহেবই নন এমপি সাহেবের স্ত্রীও আবার একজন এমপি। বাহ্ কি সুন্দর দেশটাকে লুটেপুটে খাবার ফন্দিফির্কি। ভালোই হলো পাপলু এমপিকে দেখে সরকার দল মানবপাচারের বিষয়টি নিয়ে ভাবতে পারবে, শিখতে পারবে আর এই ধরনের লোককে যাতে কখনো সরকার দলে ঢোকানো না যায় সেই ব্যবস্থা নিতে পারবে। আজ গোটা বাংলাদেশের মাথা হেট করে দিয়েছেন আমাদের এই এমপি দম্পতি। বিদেশের মাটিতে অগাধ সম্পদ সুইস ব্যাংকেও নাকি টাকার পাহাড় তার! এই লজ্জা আমরা কোথায় রাখি। আমরা আশা করবো দেশের মান সম্ভ্রম ধুলায় লুটিয়ে দেয়ার জন্য সরকার যেন তার বিরুদ্ধে যথাযথ দৃষ্টান্তমুলক ব্যবস্থা গ্রহন করেন।
লিবিয়া ট্রাজেডীর চলে গেছে বেশ কিছুদিন। লিবিয়ার জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারের সাথে যোগাযোগ করেছে বাংলাদেশ সরকার। কার্যত লিবিয়ায় কোন একক সরকারের নিয়ন্ত্রন নেই। লিবিয়ায় বর্তমানে তিনটি সরকার রয়েছে। কিন্তু যোগাযোগ করা যায় কিভাবে। অবশ্য হত্যাকারীদের ধরতে ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়েছে।  অনেক স্থানেই এই সরকারের কোন নিয়ন্ত্রন নেই। শুধু তাই নয় সেখানে যুদ্ধ চলছে, অহরহ মিসাইল আক্রমন। ২৬ বাংলদেশীকে সেখানে কবর দেয়া হচ্ছে আর মরদেহ পচে গন্ধ ছড়াচ্ছে। অবৈধভাবে ইউরোপে যেতে গিয়ে বাংলাদেশী যুবকরা মৃত্যুবরন করছে। নিজেদের অবস্থাকে স্বচ্ছল করতে গিয়ে অপহরনকারীদের নির্যাতনে নির্মমভাবে মারা যাচ্ছে প্রলোভনে পড়ে। প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে নির্যাতন চালানো হচ্ছে অমানুষিকভাবে দফায় দফায়। পরে হতভাগ্যদের ইউরোপে পাঠানোর লোভ দেখিয়ে ডিঙ্গি নৌকায় তুলে দিয়ে ভাসিয়ে দেয়া হচ্ছে উত্তাল সাগরে। গত পাঁচ বছরে নৌকাডুবি ও নির্যাতনে শত শত বাংলাদেশীর মৃত্যুই শুধু হয়নি, নিখোঁজও রয়েছেন অনেকে।  অপহরন করে অপর দলের কাছে নির্বিচারে প্রাণ দিচ্ছে। একদল অপহরন করে বাংলাদেশ থেকে স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিলে আরেক অনুরুপ দল তাদের আবার অপহরন করে। দ্বিতীয় দফার অপহরনকারীরা টাকা না পেয়ে ঝুলিয়ে রড দিয়ে পেটায়। পরে অন্য অপহরনকারীরা এসে গুলি চালায়। একদিকে যুদ্ধ অপরদিকে করোনাকালের এই হতভাগ্যদের উপর গুলি চালানো হয়েছে।
খবরের কাগজে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর প্রধান মনে করেন শুধু বাংলাদেশীদের কাছে নয়, এশিয়া ও আফ্রিকার  আরো বহু দেশের অবৈধ অভিবাসীদের জন্য ট্রানজিট পয়েন্ট লিবিয়া। ২০০০ সালে এর শুরু।  তখন ইংল্যান্ডে অবৈধ অভিবাসীদের ধড়পাকড় শুরু হলে তাদের অনেকেই স্পেন ও ইতালী চলে যান। অপরদিকে লিবিয়ার উপর আন্তর্যাতিক নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবার পর ২০০৮ সালের দিকে প্রচুর বাংলাদেশী লিবিয়ায় কাজের জন্য যেতে শুরু করে। তখনি ইতালীতে থাকা বাংলাদেশীরা তাদের আত্মীয়স্বজনদের সেখানে নিয়ে যেতে  অথবা টাকার বিনিময়ে ইউরোপে লোকজন নিয়ে যাবার জন্য কাজ করতে শুরু করেন। এ সময়ই তারা লিবিয়াকে একটা লাভজনক রুট হিসেবে বেছে নেন। তারা সুদান ও আফ্রিকার নানা দেশ হয়ে প্রথমে লিবিয়ায় যান। তারপর লিবিয়া থেকে ডিঙ্গি নৌকায় করে ভ’মধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালী কিংবা অন্য কোন ইউরোপীয় দেশে যেতে থাকেন। প্রথমে এটা হয়তো ইতালীতে থাকা বাংলাদেশীদের আত্মীয় স্বজনদের ইউরোপে নিয়ে যাবার জন্য ব্যবহৃত হতো। কিন্তু পরে এই রুটে মানবপাচারের সংগঠিত চক্র আত্মপ্রকাশ করে। এই চক্রগুলোর সাথে সুদান মিশর ও লিবিয়াসহ অনেক দেশের লোক জড়িত। প্রতিটি জায়গাতেই পাচারকারীদের এক চক্রের হাত থেকে অবৈধ অভিবাসীদের দলগুলোকে আরেক চক্রের হাতে তুলে দেয়া হয়।  এভাবে পরবর্তীতে ২০০০ সালের দিকে যখন স্পেন ও ইতালীতে কৃষিক্ষেত্রে  কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়, তখন তারা নিয়মিত শ্রমিক না নিয়ে অধিক মুনাফার লোভে অবৈধ অভিবাসীদের কাজে লাগিয়েছে। পরে এই সব অবৈধ অভিবাসীদের তারা বৈধ করে নেয়।  এর ফলে কিছু বাংলাদেশীদের মনে ধারনা তৈরী হয় কোন ক্রমে কষ্ট করে ইতালী যেতে পারলে কিছুদিন পর বৈধ হয়ে যাওয়া কোর ব্যাপারই নয়। একটু না হয় সমস্যা হলো পরে তো সুদিন আসবে। আসলে এভাবেই অবৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রটা তৈরী হয়।  আসলে এ যেন লোভের এক অন্য জগৎ। মরীচিকার পেছনে সহজ সরল বাংলাদেশের তরুনরা কিছু না ভেবেই এইসব ভয়াবহ ফাঁদে পা দিয়ে সম্পদ ও জীবন দুই –ই খোয়াচ্ছে।  তাদের আশা কোনক্রমে টিকে গিয়ে যদি নিজের ও নিজেদের পরিবার পরিজনকে স্বচ্ছল করে তুলতে পারে! কী মর্মান্তিক!
সর্বশেষ লিবিয়ার ২৬ বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যার মূল কারিগর খালেদ আল মিশাই লিবীয় বিমানবাহিনীর ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছে। বাংলাদেশীদের নির্বিচারে জঘন্যভাবে গুলি চালিয়ে হতাহত করার জন্য দায়ী অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে রাজধানী ত্রিপোলী নিয়ন্ত্রনকারী সে দেশের  বৈধ সরকার যে দায়িত্বশীল আচরন করেছে তা সত্যিই প্রশংসাব্যঞ্জক।  এখনো অনেক বাংলাদেশী আটক রয়েছে। নাগরিকদের জানমালের সুরক্ষা বাংলাদেশ সরকারের নৈতিক দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি। এ বিষয়ে সরকার পূর্ণমাত্রায় সচেতন রয়েছে। এছাড়া মানবপাচার চক্রের যে সব দেশের অপরাধী লিবীয় অপরাধীদের যোগসাজসে বিদেশীদের জিম্মি করে পণ আদায়ের ঘৃন্য ব্যবসা করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আঘাত হানতে হবে।
নিজেদের অর্থ ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এমনি কতো বাংলাদেশী সম্ভাবনাময় তরুন নিজেদের অবস্থা স্বচ্ছল করতে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে যাচ্ছে দেশের বাইরে। দিনকে রাত রাতকে দিন করে তারা উপার্জন করে দেশে টাকা পাঠিয়ে আত্মীয়স্বজনদের বাঁচিয়ে রাখছে। দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখছে। করোনাকালে এখন সারা বিশে^ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশীদের মধ্যে নিজের অজান্তেই বাড়ছে হতাশা। সারা বিশে^ যখন অর্থনৈতিক মন্দা অবশ্যাম্ভাবী, সেখানে বাংলাদেশীদের পুষে রাখার প্রশ্নই অবান্তর। পর্যটন শিল্পের বারোটা  হয়তো বেজেই গেছে। এই অবস্থানকে আগের অবস্থানে চটজলদি নিয়ে যাওয়া সম্ভব এই দুরাশা এখন আর কেউ করবে না। মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা হতে পারে আরো করুন। সেখানে তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে নতুন সংকট। নিজেরাই কর্মহীন হয়ে পড়ার ভয়ে তারা নিশ্চয়ই বাইরের দেশের লোকশ্রম নিতে চাইবে না। লক্ষ প্রবাসীরা এভাবে বেকার হয়ে দেশে ফিরে এলে এই দেশের যে কি অবস্থা হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। করোনার ভয়াবহতা কমে আসছে এমন যারা ধারনা করছেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। দেশের সীমিত শক্তি নিয়ে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করছে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।  দুই থেকে তিনমাস দেশ অচল থাকায় সরকারই এখন চোখে সর্ষে ফুল দেখছে। অনাহারে অর্ধাহারে মানুষ এখন দিশেহারা। সামনে দ্রƒত এগিয়ে আসছে দুর্ভিক্ষের কালো থাবা। আছে প্রকৃতিক দুর্যোগসহ নানা প্রতিকুলতা। এ অবস্থায় কীই-বা করতে পারে আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের সরকার? শুধু লিবিয়ায়ই নয় বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের অবৈধ অভিবাসীদের সংখ্যা বিশাল। এ সকল প্রবাসীরা বৈধ হবার জন্য করছেন না এমন কাজ নেই। আজ ওখানে কাল ওখানে করে পালিয়ে পালিয়ে কাজ করতে হচ্ছে তাদের। বৈধ হবে এমন আশায় তারা বুক বেঁধে আছেন। ফিরে আসারও মন মানসিকতা ও সুযোগ নেই। বাড়িতে জায়গা জমি সহায় সম্বল বিক্রী করে জীবন বাজি রেখে গন্তব্যে পৌঁছলেও তাদের মানবেতরের জীবনযাপন শেষ হবার কোন সুযোগ নেই। এই করোনাকালে তাদের অবস্থা আরো শোচনীয়।
একজন অভিবাসীর কথা শুনলাম। মধ্যপ্রাচ্যে সাগরপারের কোথাও সে বন্ধুবান্ধবদের সাথে থাকতো। আড়ালে আবডালে এটা ওটা কাজ পেলে করে চলতো। সাথের তিনজন তাকে ছেড়ে রাতেই করোনা সময়ে সরকারী সহায়তা পাবার সুযোগ লাভ করে চলে যাওয়ায় না খেয়ে কোনক্রমে তাকে সেখানে কয়েকদিন থেকে যেতে হয়। কারন সাথের বন্ধুরা বৈধ ছিলো। অবৈধ বলে বন্ধুরা তাকে ফেলেই চলে যায়। তাকে সাথে নিয়ে গেলে পাছে তাদের সমস্যায় পড়তে হয়! করোনা পরিস্থিতিতে কয়েকদিন সেখানে একা উপোষ করে থেকে এক বন্ধুর খবর পেয়ে এবং ভাগ্যক্রমে একটি গাড়ি পেয়ে বন্ধুর মেসে চলে যেতে সক্ষম হয় বলে বেঁচে যেতে পেরেছিলো। এখন নাকি সে বাংলাদেশে ফিরে আসার জন্য আপ্রান চেষ্টা করেও পারছে না। কয়েকবছর থেকেও সে বৈধ হবার সুযোগ করে উঠতে পারেনি। সামান্য অনিয়মিত কাজটাজ করে দেশে কোনমতে পরিবার চালাতো। এখন করোনার এই দু:সময়ে কাজ বন্ধ থাকায় নিজেই অনাহার অর্দ্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে আর টাকা পাঠাতে না পারায় দেশে পরিবারের সবাই বিপর্যস্থ।
এ ধরনের ঘটনার শেষ নেই। এখন করোনার প্রভাব দেশগুলোর উপর পড়ায় তারাই এখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করার লোভে পড়ে টাকা পয়সা নষ্ট করে দালালের প্ররোচনায় তারা এখন সর্বসান্ত। বৈধভাবে যারা আছেন তাদেরই এখন ইয়া নফসী নফসী চলছে। কতোদিন তারা এই অনিশ্চিত অবস্থায় টিকে থাকতে পারবেন সেই চিন্তায় তার অস্থির। অবৈধদের তো কোন নিশ্চয়তা থাকার প্রশ্নই অবান্তর। যারা তাদের বিপুল অর্থের বিনিময়ে পাচার করেছে তাদের টিকির সন্ধানও পাওয়া যাচ্ছে না। এইসব হতভাগ্যরা যে টাকা পয়সা নষ্ট করে নিজেদের স্বচ্ছল করে তোলার আশায় বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন, সেই টাকায় দেশে থকে কিছু একটা করে অন্তত খেতে পড়তে পারতেন।  নিজেদের স্বচ্ছল করার আশায় এখন বলতে গেলে অনেকেই সর্বসান্ত। এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবার মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। মানব পাচারের ব্যবসার চেয়ে মানবের জীবন রক্ষার দিকেও নজর দিতে হবে। পাপলু এমপিদের কাছ থেকে হাজার কোটি টাকা উদ্ধার করে প্রয়োজনে এই সব হতভাগ্যদের জীবন গড়ে দেয়ার কাজটিও করে নেয়া যায়। অন্তত অসুবিধা তো নয়। প্রয়োজন শুূধ সদিচ্ছার।

এই সংবাদটি 1,236 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •