সাহিত্য তরুণদের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ

ফকির ইলিয়াস :: যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি, সেসব কবিরা তাদের কবিতায় কীভাবে মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করেন? কেমন তাদের চেতনায় একাত্তর? এমন একটি প্রশ্নের মুখোমুখি প্রায়ই হই। ৪৭ বছর বয়সী মহান মুক্তিসংগ্রাম, যারা দেখেছেন- তাদের কবিতায় আমরা মুক্তির শাণিত ঝলক লক্ষ করেছি একাত্তর পরবর্তী সময়ে। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে কবিতা লিখে তারা স্পর্শ করেছেন আমাদের বিজয়ের, আমাদের স্বাধীনতার বিভিন্ন দিক। এর পরবর্তী কবিরা কি সেই একই ধারা অনুসরণ করে এগিয়েছেন- না কী তারা তৈরি করেছেন নিজস্ব ধারা। এ বিষয়ে আমি এই নিবন্ধে কিছু আলোকপাত করতে চাই।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের একটি দিকনির্দেশনা ছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সাতই মার্চের ভাষণে সেই নির্দেশনা দিয়েছিলেন। আমরা সেই ভাষণটিকে একটি প্রতীক ধরেই এগিয়েছিলাম। আমি মনে করি এই ভূমি,এই ভাষা সেই চেতনা ধারণ করেই এগিয়েছে। এই প্রজন্মের একজন কবি কোন চোখ দিয়ে দেখছেন স্বাধীনতার মুখ? পড়া যাক তার ভাবনাকল্পে, তার পংক্তিগাঁথায়।
করিনি হাড়ের চাষ, মাটিতে মু-ুর বীজ পুঁতেছে রাক্ষস। / গোপনে দিয়েছে জৈবসার। শস্যের বয়স অস্থি-মজ্জাভারে / কী বীভৎস উর্বর! সৌন্দর্য এখানে বরং উজ্জ্বল অহঙ্কারে / মরেছে শ্যামল রাজ্যে; মৃত্যুতন্ত্রে গর্ভঋতুতে নেমেছে ধস। / দীপান্বিতার গলার স্বর্ণচেইন, চলার ঘোষক ঘুঙুর, / মাটির ব্যাংকে জমানো কিছু মুদ্রা পড়ে আছে খনির খননে। / সংগ্রামী কোরাস জন্মে শজারুর কাঁটা হয়ে বিদ্রোহী মননে। / কান্নারুদ্ধ বুকের বলয়ে গাজলিক উৎরোলের সমুদ্দুর। / দীপান্বিতা, কোথায় কলঙ্ক তোর! জ্যোৎস্নাময় সুবর্ণের দানা / হীরাদামি ত্যাগে, ভস্মস্তূপে বস্ত্রহীন স্পৃহার দ্রৌপদী তুই, / স্তব্ধতার মেঘে চেতনামুক্তোয় চিরায়ত রঙধনুর ভুঁই, / লখিন্দরের ভাসন্ত ভেলার বেহুলা, বাংলাদেশ নামখানা। / জোতের জমিতে কঙ্কালের কবি, পাই প্রচ- স্পৃহার বোধ; / আক্রোশী টঙ্কার ধমনীতে শিরায় শিরায়, চাই প্রতিশোধ।
[ স্বাধীনতা / চন্দন চৌধুরী ]
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। হ্যাঁ, পেরেছে অনেক কিছুই এই দেশ। না পারার খতিয়ান যে নেই, তা আমি বলছি না। কিন্তু এই প্রজন্ম সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি নিয়ে আশাবাদী। আমরা শুনি সেই প্রত্যয় তরুণ কবিদের কবিতায়। যে প্রজন্মটি সামরিক বুটের নীচে বাংলাদেশ, স্বৈরশাসন, একাত্তরের ইতিহাস মুছে দেবার প্রতিযোগিতা দেখেছে দু’চোখ মেলে, কবিতায় তাদের খেদ প্রকাশ পেয়েছে সেভাবেই। কবি লিখছেন-
হে আফিমাসক্ত গণতান্ত্রিক অন্ধ রাষ্ট্র- / বিষের পেয়ালা হাতে পর্দার আড়ালে / দাঁড়িয়ে থেকো না আর তুমি! ঐভাবে ছদ্মবেশে / দরজার আড়ালে ক্রীড়ানকের ভূমিকায়/ দাঁড়িয়ে থাকতে; জানি ধৈর্যচ্যুতি ঘটে তোমার! / তাই; সহ্যের সীমা অতিক্রম হবার আগেই / রৌদ্রদীপ্ত কিংবা বৃষ্টিস্নাত কিংবা শিশির ভেজা সকালে / পরোক্ষ সমর্থন না দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে জ্বলে ওঠো তুমি; / মধ্যযুগীয় অনাদর্শে মানুষের বিবেকের / মুক্তির আন্দোলন থামাতে ইন্ধনদাতা / সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কায়দায়…। / সোফার টেবিলে নিত্যদিন রক্তাক্ত খবরের পাতার / সাথে চুমুক দেয়া চায়ের কাপে দ্বিধাহীনভাবে / সুক্রোজ মিশিয়ে তোমার পেয়ালার সবটুকু / বিষ অমৃত হিসেবে মুক্তমনাদের / গলায় অনায়াসে ঢেলে দাও তুমি…।
[শুদ্ধ বাকস্বর / সুকান্ত পার্থিব]
শূন্য কিংবা প্রথম দশকের কবিদের অনেকেই বিশ্বকে দেখেছেন নতুনভাবে। তারা পাওয়া-না পাওয়ার হিসেব মিলিয়েছেন নিজের মতো করে। রক্তাক্ত একাত্তরের অভিজ্ঞতা তাদের না থাকলেও মানুষে মানুষে হানাহানি, ধর্মের অপব্যবহার, মৌলবাদ, জঙ্গীবাদ, অনিয়ম-অনাচার তাদের ব্যথিত করেছে। কবিতায় তারা সেই একাত্তরের মতোই মানুষের স্বাধিকার চেয়েছেন। ব্যক্তির আত্মপ্রকাশ ও আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা এসেছে তাদের মাঝে। গ্লোবাল ভিলেজে বসে দেখেছেন সিলিকন ভ্যালির স্বপ্ন। যে শহীদ কাদরী বলেছিলেন, ‘প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিকই/ কিন্তু শান্তি পাবে না/ পাবে না, পাবে না’ – সেই অনুরণন ঘটিয়েছেন এই সময়ের কবিরাও। আর তা এসেছে তাদের নিজস্ব ভাষায়, নিজস্ব আঙ্গিকে।
তার সঙ্গে দেখা করতে অন্ধকারে বেরিয়েছিলাম। জন্ম পোশাক যেন কোন মন্ত্র সাধু যায় চুরি করতে কাফন। যখন পথের মাথায় শুরু হলো নদী। বিষণœতাকে সঙ্গে নিয়ে এলো হাওয়া আর দেখিয়ে দিলো স্বর্গের সিঁড়ি। দুইদিকে মৃত নক্ষত্রের পচা গন্ধের পরে পথ। পৌঁছে গেলাম এক দ্বীপে। নৌকাগুলো চরের চারদিকে যেন সঙ্গীতের মতো। লোকেরা বসেছে মাথার বদলে ঘাড়ে ইলেকট্রিক লাইট আর অনেকগুলো ছোট ছোট সূর্য প্রজাপতির মতো উড়ছে সভার আকাশে।
পাথরের পাহাড়ে উঠে পড়লাম। কেননা তাই ছিলো মঞ্চ তাহার। বললাম- এদের তো মাথা নেই শুধু আলো। বলল- যাও ফুল পাখি দেখো গিয়ে মাথা দেখার ক্ষমতা নেই তোমার। ফিরে এলাম চোখ বাঁধা বিড়াল যেমন অনেক কষ্টে চিনে ছিল পূর্ব গৃহের পথ।
[প্রতিবাদ সভা / ইমরান মাঝি ]
প্রত্যাশা, স্বপ্ন এবং প্রত্যয় নিয়েই চলে উত্তর প্রজন্ম। সংগ্রামী উদ্যম মানুষের জীবনযাত্রায় যোগ করে নবতর মাত্রা। সমাজতন্ত্র ভেঙে খান খান হয়েছে এই প্রজন্মের চোখের সামনেই। ‘গ্লাসনস্তো’ ও ‘পেরেস্ত্রেইকা’-র বজ্রপাত প্রজন্মকে কাঁপিয়েছে ঠিকই কিন্তু তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে সাহিত্যে-কবিতায়। শ্রেণি সংগ্রামের বাহু উচ্চকিত করেই তারা ডাক দিয়েছে মানবতার। মানুষের অধিকার নিয়ে লিখেছে কবিতা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনিবার্য অনুষঙ্গ ছিল যে সাম্য, সেই প্রশ্ন আবার করছেন এই সময়ের কবিরা।
এই কবিতাটা আমাকে পড়তে দিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী / আপনার মূল্যবান সময় আমি নষ্ট করবো না / কেবল এই কবিতাটা / এটা আমার কবিতা না / আবার আমারও / যেমন এই ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ আমারও।’
[ যেহেতু এটা কোন কবিতা না / শিশির আজম ]
বাঙালি জীবনে অনেক স্বাধীকার- স্বাধীনতার সঙ্গী হয়েছিল কবিতা। কবিতাই হয়ে উঠেছিল সেই আকাঙ্খার প্রকাশ মাধ্যম। ’৫২, ’৬৯, ’৭০ একাত্তর পেরিয়ে একাত্তরে পৌঁছে বিজয়ের প্রত্যাশা পূরণের বিষয়েও কবিতা ছিল আপোসহীন। একজন সত্যিকারের কবি সেই ধারা থেকে ছিটকে পড়েন না। পড়তে পারেন না। কারণ গণমানুষের মুক্তির সংগ্রাম বিষয়টি খুবই চলমান। বাংলাদেশে মুক্তির যে সংগ্রাম,এর প্রস্তুতি না না ভাবেই নিতে হচ্ছে প্রজন্মকে। মৌলবাদ,জঙ্গীবাদ,ফতোয়াবাজি,শোষণের নব্যরূপ- মানুষকে তটস্থ রাখছে। একজন কবিকে দাঁড়াতে হচ্ছে সেই কাঙ্খিত বিজয় রক্ষায়।
‘আমরা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে / ছাতার ব্যবহার শিখেছি / বাদামি ডাহুকীঘুমে রোপণ করেছি / আমাদের যাবতীয় স্বপ্নবীজ / আগুন ব্যবহারের অনেক আগে / আমরা রমণীদেহে আগুন জ্বালিয়েছি / যখন মানুষেরা পরতো পাতার পোশাক। / আর আমরা ধীরে ধীরে আকাশি নীলে / জ্যোতির্ময় আলোয় জ্বলতে জ্বলতে / পৃথিবীতে এসেছি অনেক পরে। / তারপর বিবেচ্যভাবে ঘুরতে ঘুরতে / অন্তহীন লোহিত নদীতে পুড়তে পুড়তে / বৃষ্টিতে ভিজতে শিখেছি।
[ প্রস্তুতিপর্ব / শামীম হোসেন ]
আমরা বিশ্বসাহিত্যেও লক্ষ্য করি, শাসনতান্ত্রিক ব্যর্থতা, দৈনন্দিন অভাবের তাড়না
শোষণ মানুষকে দ্রোহি করে তোলে। এর বিপরীতে ছোট্ট একটি শ্রেণীর অস্বাভাবিক অর্থনৈতিক স্ফীতি,লুটেরা শ্রেণিচরিত্র কবির মননে, কবিতার চিত্তেও তিক্ততার জন্ম দেয়। কবি তখন অতীতের গৌরব নিয়েই দাঁড়ান সমকালের মুখোমুখি।
কবি সমাজচিত্র এঁকে যান-
এখানে বালিকার প্রথম প্রণাম যতিচিহ্ন হয়ে শুয়ে আছে / পাথরের গায়ে। এর নকশা অনেকটা আদিবাসি শরীরে আঁকা / উল্কির মতো। প্রথম স্নানের পর এখানেই দাফন হয়েছিল তার / কুমারি চোখের শব… এখানেই তার প্রথম অশ্রুতে নেয়েছিল / বৈশাখের তৃষ্ণার্ত দোআঁশ। এই প্রাচীন প্রতœনগরের কোথাও মাটি / চাপা পড়ে আছে তার প্রথম অপরাধের ডায়রি। ডায়রির ওপর ইতিমধ্যে / নির্মিত হয়েছে বহুতল ভবন। যার ছাদের ঠিক ওপরের আকাশে মুদ্রিত আছে / কিছু পৃষ্ঠা; পুণ্যবান শবযাত্রীরাই যা পড়তে জানবে, আর জানবে বহু ভাষাবিদ / কোনো অন্ধ বালিকার ফসিল। সেই ডায়রির ভেতর যার মৃত নখ এখনো অক্ষত আছে…।’
[ডায়রি / জাহানারা পারভীন ]
একটি কবিতা তখনই শক্তিশালী হয়ে উঠে যখন তা মৌলিক ইতিহাসের ভিটের উপর দাঁড়ায়। কল্পনা কবিতাকে চিত্র দেয়। আর ইতিহাস দেয়, শক্তি। এই দুয়ের মিশ্রণেই লিখিত হয় কালের শ্রেষ্ঠ একটি কবিতা। বাংলাদেশের গেল চারযুগেরও বেশি সময়ের সমাজ ও জীবনের অব্যাহত ভাঙন কবিতার সংহত নিপুণ অবয়বেও ফেলেছে এর প্রভাব। কি চেয়েছিলাম, কি পেলাম- তা লিখিত হয়েছে জোছনার আখ্যানে। একজন কবি নিজের মুখ দেখেছেন সেই আলোয়, যে আলো মুক্তিযুদ্ধের। যে সাহস একাত্তরের।
আলেকজান্ডার থামো, এখানে বাংলার শুরু। নই / আরব বণিক, প্রেমিক পুরুষ আমি কৌম-জীবনের- / সংগ্রামে, নিভৃতে, আজো যারা পক্ষীর ভাষায় কথা / বলে, যারা নারকেল পাতায় পিছলে পড়া জ্যোৎস্নায় / ধোয় এলোচুল। আমি সেই আদি তামাটে রক্তের / উত্তরাধিকার যারা শিকার ও সংগ্রহের দিনে / গড়ে তোলে অভিসার। পোড়ানো মাটির অলংকারে / চূড়া করে খোঁপা বেঁধে, অমিয় ভা-ার খুলে দেয় / দ্রাবিড় রমণী। দাঁড়াও হে আলেকজান্ডার, শোনো, / এখানে বাংলার শুরু, এ সীমান্তরেখা অতিক্রম / করো না, ভেতরে লড়াকু পুরুষ, পাশে বসে আছে / চন্দ্রমুখী শ্যামলা রমণী। পোষা পাখি উড়ে গেলেও, / এ নারী ঘরের কোণে খুঁজে পায় হারানো আকাশ, / খুঁজে পায় হেমনদী, বাহ্যজ্ঞান, হেমন্ত-বাগান।
[ জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় / জাকির জাফরান ]
একাত্তের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু এসেছেন এই সময়ের কবিদের কবিতায় নানা ভাবে। বাঙালি জাতির জীবনে একাত্তর ও শেখ মুজিব এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর স্বাধীন বাংলাদেশে উচ্ছ্বসিত ফোয়ারার আবেগে উৎসারিত হয়েছে যেমন কবিতা, সেই ধারা এখনও চলছে। আমাদের বিজয় দিবসে,স্বাধীনতা দিবসে মিডিয়াগুলোর বিশেষ সংখ্যায় অনেকগুলো কবিতা সেই সাক্ষ্যই দিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর।
কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে, আমাদের পরিচয়ের অভিজ্ঞান। চলার পথের ধ্রুব নক্ষত্র। জীবনের সঞ্জীবনী, অনির্বাণ শিখা। দশকে দশকে কবির কবিতায় মূর্ত হয়েছে বাঙালির দুর্বার ও অপরাজেয় অন্তর শক্তি। কখনো কবিতা হয়ে উঠেছে আবহমান বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, স্বপ্ন আর সংগ্রামের পতাকা। কখনো কবিতায় মূর্ত হয়েছে একাত্তরের কালো রাতের দুঃস্বপ্ন। কখনো তা হয়ে উঠেছে দুর্নিবার সাহস ও বিক্রমের অনন্য বীরত্বগাঁথা। মানবতা,ঐক্য আর সৌহার্দ্যের সাঁকো হয়েছেন তাই লালন-মুজিব।
পড়ুন এই কবিতাটি …..
আমি সত্যিই কাউকে ডাকিনি
আমার প্রশ্বাস, আমার উৎসব আমায় মারণাস্ত্র ধরতে শিখিয়েছে
আমি অসহায় মায়ের চোখের জল মুছতে মুছতে / তোমাকে হত্যার সংকল্প করেছি । / আমি বৈশাখী উৎসবে মিশে যেতে ধর্ষিতা বোনটিকে মনে করেছি । / আমি পতাকার লাল সবুজের সাহসের নিচে দাঁড়ালেই / পুরো বাংলাদেশটিকেই আমার পাঁজরে ঘুমিয়ে পড়তে দেখি । / প্রতিটি মায়ের সামনে দাঁড়ালেই নিজেকে স্নেহাতুর মনে হয় / প্রতিটি পিতার সামনে দাঁড়ালেই নিজেকে অপরাধী মনে হয় / আমি তো কাউকে ডাকিনি / এই বাংলা, নির্বিবাদ প্রাণবায়ু আমার । / আমার অন্তর্লোকের নাম লালন ফকির / আমার সাহসের নাম শেখ মুজিবুর রহমান ।
[ মুক্তিযুদ্ধ থেকে / এমরান হাসান ]
বাংলাদেশ এখন একটি আগুয়ান রাষ্ট্র। পদ্মাসেতুর মতো প্রকল্প সম্পাদনের কাজ হাতে নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে -তারা পারে,পারবে। এজন্য রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নীতিকে সাধুবাদ না জানিয়ে কোনো উপায় নেই। এই দেশ এখন নানা প্রয়োজনেই কবি-সাহিত্যকদের পাশে দাঁড়াতে পারছে। এটা অবশ্যই প্রাপ্তি যোগ। কালের কবিরা সেই বেদনা ও পাওয়াকে দেখেছেন তাদের মতো করে। প্রেমিকা,মা, দেশমাতৃকা কিংবা প্রকৃতি- যা’ই বলি না কেন,নিসর্গের কাছে তারা সমর্পিত হচ্ছেন তাদের শব্দে শব্দে। কবিতার বিবর্তন আমাদের নিয়ে যাচ্ছে সেই গ্রহচক্রের দিকে। যে চক্র ষড়ঋতুর। যে পরিবেশ বাংলাদেশের।
আমার শুধু বর্ষসেরা হাহাকার আছে। পূর্বাপর আমি যা ভেবেছি বর্ষিত হয়েছে তা উল্টোমন্ত্রে। সমুদ্র ভেবে নেমেছি বিষাদে হতে পারে এ এক আনন্দভ্রমণ। এভাবে ঠিক করে যে বয়স এসে দাঁড়িয়েছে বঙ্কিম গ্রীবা নিয়ে কাঁধের উচ্চতায় খেয়ালই করিনি। তোমাকে নিয়ে যে মিথ্যাচার প্রচলিত আছে ছয় ঋতুতে, বাতাসে বাতাসে ওইসব শব্দদল মিথবাক্যে বহু আগেই গল্পে গড়িয়েছে। এ ঘটনা পাতাবাহী বধির বৃক্ষেরও অজানা নয়। যদি তা ভুল করে সত্যি হতো কখনো-কোনো অবহেলায় তাহলে হৃদয়ের পেছন দরজা দিয়ে রাজা লক্ষণের মতো পালাতে হতো না আমাকে। কিছুতেই সুখ নেই আর! হারাতে-হারাতে, পালাতে-পালাতে সমগ্র ভূগোল শেষে নিজেকেই দেখি তোমার সম্মুখে।
[ বেদনাসংগীত / অনন্ত সুজন ]
আমরা জানি, মুক্তিযোদ্ধারা তাদের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে নেমেছিলেন শুধু দেশকে ভালোবাসতেন বলে। আজকের প্রজন্মের মাঝে সেই শাণিত চেতনা ছড়িয়ে দিতে হবে শব্দে শব্দে। ভোগ নয় ত্যাগের মাধ্যমেই এগোতে হবে মানুষকে রাষ্ট্রকে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সবার মধ্যে প্রজ্জ্বল করার কাজটিই করতে পারেন একজন কবি। ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অতীত নিয়ে যে ধোঁয়াশা ছিল প্রযুক্তি আমাদের ইতিবাচকভাবে তা জানিয়ে দিচ্ছে। একটি শ্রেণি তরুণ সমাজকে ভিন্ন পথে নিয়ে যাবার জন্য মরিয়া রয়েছে। কিন্তু আশার কথা আর্কাইভের জানালা আজ আমাদের জন্য উন্মুক্ত। যে রক্ত, ত্যাগ, বীরত্ব, অসীম মর্মযাতনার ফলশ্রুতি এই স্বাধীন বাংলা তা ভুলে যাওয়া নয় আরও ব্যাপকভাবে আমাদের তরুণদের মাঝে বপন করে যেতে হবে নির্মোহভাবে।
বীজের ও যাবতীয় চাষ-প্রকৃতির কথা / তুল্যমূল্য হলে / একদিন কৃষিসমাজের কাছে / কিছু দায় জন্ম নিয়েছিল। / এইসব বীজ আর বাণিজ্য-বাসনা নিয়ে / ভাবপ্রবণতাহীন, / তার ফলে, ছুটে চলে যাই। / হাটবাজারের কাছাকাছি এলে কোনো বীজে / ঘটে যায় প্রাণসঞ্চারণ; / সেইসব গুণবতী বীজ আমি / হাতের তালুতে নিয়ে দেখি; / দেখি আর ক্রমে ক্রমে বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে / চাষি-সম্প্রদায়।
[ বীজ / শাহীন মোমতাজ ]
কবি মানেই একজন কালিক চাষি। তিনি চাষ করেন সমতার। সমৃদ্ধির। মঙ্গলের। কবি জানিয়ে যান আমাদের অর্জন কিন্তু কম নয়। এই অর্জনের নেপথ্যের গল্প, স্বাধীনতার গল্প জানা ও মনেপ্রাণে ধারণ করাই হচ্ছে একজন পরিশুদ্ধ নাগরিকের দায়িত্ব। একটি পঠিত কবিতার মধ্যদিয়ে একজন কিশির যেমন ইতিহাস জানবে, তেমনি বাড়বে পঠন-পাঠনে প্রতি তার আগ্রহ। বাংলার আকাশ,জল,চাঁদ আর সূর্যকে সাক্ষী রেখেই এই সময়ের কবিরা লিখছেন তাদের কবিতা।
রাতের অতলান্ত শেষে চিকচিক সৌরবীথিকায় / ছেয়ে গেছে হরিদ্রকুসুম, বাঁশঝাড়, নদী / বন ও মানুষের মন / দীঘলে উল্টে যাবে পাড় / পথ থেকে প্রাচীন পাথরে আরো / আলো এতো আলো- / এতো আলো রাতের বিপরীতে ! / জাগে মাঠ, ঘাস, কোলের শিশুরা-খুদে পাখিদের সাথে / বিগত অসুখ ছেড়ে বাঘিনীরা জাগে / যাদের দীর্ঘশ্বাস ভুলে গেছে রোদের চেতনা-নিপুণ পাখাটি / মৃত সেই মানিকেরা জাগে না / আর যারা রাতহারা, চন্দ্রহারা…
[ ঊষার লিরিক / সৌম্য সালেক ]
আমি বিশ্বাস করি, আগামী ঊষার আভা নির্মিত হবে নতুন কবির হাতে। যুগে যুগে লিখিত হবেই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে সামনে রেখে কবিতা। সেই কবিতায় সমাকালের দুঃখালাপ থাকবে। গৌরবের পতাকা থাকবে। উজ্জ্বল মানচিত্র থাকবে। বাংলাদেশ একটি নির্মল আনন্দভিটের নাম। এর সম্মান রক্ষা করাই একজন নির্ভীক নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। কবিরা তাদের কাজ করছেন। সবাই সমানভাবে এগিয়ে এলে এই কাজটি ত্বরান্বিত হবে- আমি সেই প্রত্যয় রেখেই যাচ্ছি।