সিডনির স্টেশনে উদ্বাস্তু মানুষেরা

আমার জীবনবোধের একটা বিশাল অংশ জুড়ে আছে স্টেশনের প্রভাব। জীবনের অনেকটা সময় স্টেশনে কাটিয়েছি।

 

আমার সামগ্রিক জীবনবোধে এক বিশাল পরিবর্তন আসে স্টেশনে থাকার কারণে, যেটার সাথে আমার আগে পরিচয় ছিল না। জীবন বলতে একটা আদর্শ জীবনই ছিল আমার কাছে উদাহরণ। যেখানে ঘর থাকবে, একটা পরিবার থাকবে, আত্মীয়-পরিজন থাকবে, একটা সমাজ থাকবে। মোটকথা একটা শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন।

 

আমার সেই ধারণা ভেঙে খান খান হয়ে যায় স্টেশনে সময় কাটানোর পর।  মানুষ কতো কম চাহিদা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে এবং জীবনে সুখী হতে পারে- সেটার উপলব্ধি হলো।

 

অস্ট্রেলিয়া আসার পর থেকেই আমার চলাচলের প্রধান বাহন হচ্ছে ট্রেন আর বাস। ট্রেনে চলাচলের সময় আমি স্টেশনে তীক্ষ্ণ নজর রাখি এবং শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারলাম, পৃথিবীর সব প্রান্তেই স্টেশনে ভবঘুরে বা উদ্বাস্তু মানুষের বসবাস। তারা সবাই বিভিন্নভাবে জীবিকা নির্বাহ করার চেষ্টায় রত। কেউ গান করছে, কেউ একটা বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে, কেউ আবার নাচও করছে।

 

স্টেশনে রাতের বেলায় অনেক গৃহহারা মানুষ ঘুমাচ্ছে। কিন্তু এই মানুষগুলোও বাংলাদেশের স্টেশনে থাকা মানুষগুলোর মতো অনেক সুখী হয়তো।

 

স্টেশনে যে মানুষগুলো থাকে তাদের আমি দুই ভাগে ভাগ করি। যারা প্রতিদিন বিভিন্ন কিছু ফেরি করার জন্য আসে, আর যারা স্টেশনটাকে মোটামুটি নিজেদের স্থায়ী আবাস বানিয়ে ফেলেছে। আগে দ্বিতীয় প্রকারের কথা বলি।

 

এই মানুষগুলো সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত শ্রেণির একাংশ। এরা তাদের সর্বস্ব খুইয়ে আর কোথাও ঠাঁই না পেয়ে স্টেশনে থাকে। সেখানেই কোনমতে ভ্রাম্যমাণ বস্তির মতো পলিথিন বা কাপড় দিয়ে ঘর বানিয়ে সেখানে থাকে। স্টেশনই তাদের বাড়ি, সমাজ, পরিবার সবকিছু। এখানেই তাদের বিয়ে-বংশ বিস্তার।

 

এক স্টেশনে থাকা মানুষগুলোর নিজেদের মধ্যে বেশ ভালো বোঝাপড়া থাকে। একজনের বিপদে অন্যজন এগিয়ে আসে। অবশ্য তাদের মধ্যে ঝগড়া লাগতেও যেমন সময় লাগে না, আবার মিল হতেও সময় লাগে না।

 

স্টেশনে একটানা দীর্ঘ সময় থাকার ফলে এমন বেশ কিছু ঝগড়া ও মিলের স্বাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। এই মানুষগুলোর চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এদের কোনো ব্যক্তিগত চাহিদা নেই। সারাদিনে খাবার জুটলো তো খেল, নাহলে সারাদিন উপোস। রোগ হয়, আবার এমনিতেই ভালো হয়ে যায়, নাহলে প্রকৃতির নিয়মে অক্কা পাওয়ায় নিয়তি।

 

জীবনে এখানে একেবারে সরলরেখার মতো। কোনো প্রকার উত্থান বা পতন নেই। কিন্তু এর মধ্যেই বাচ্চাকাচ্চাগুলো স্টেশনের চারদিকে খেলে বেড়ায়। তাদেরও জীবন নিয়ে খুব একটা শংকিত হতে দেখি নাই। মনে হয় যেন এটাই জীবনের নিয়ম এবং যুগ যুগ ধরে এমনই চলে আসছে।

 

কিন্তু একটা ব্যাপার এই মানুষগুলো প্রচণ্ড রকমের সুখী। ওদের এই সুখে থাকার নীতিটা আমাকে পরবর্তী জীবনে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে মানসিকভাবে শক্তি যুগিয়ে গেছে।

এইবার বলি প্রথম প্রকারের মানুষের কথা। এরা প্রত্যেকদিন স্টেশনে আসে, বিভিন্ন জিনিস ফেরি করে আবার দিন শেষে ফিরে যায়। এই দলে কে নাই, একেবারে বিভিন্ন জিনিসের ফেরিওয়ালা থেকে শুরু করে যাদুকর, হস্তরেখাবিদ, কবিরাজ আরও কতো রকমের মানুষ।

 

ফেরিওয়ালাদের দলে আছে কাপড়ের দোকানদার থেকে শুরু করে বইয়ের দোকানদার, বাদাম বিক্রেতা, ফল বিক্রেতা সবাই। তারা সারাদিন ব্যবসা করে দিন শেষে ঘরে ফিরে যায়। এর বাইরে হাত দেখা এবং একই সাথে বিভিন্ন তাবিজ-কবজের পসরা নিয়ে বসা লোকও প্রতিদিন আসে।

 

একজনের কথা আমার একটু বেশি করে মনে আছে। যিনি খাঁচায় করে দুটো টিয়া পাখি আর ঝুলিতে করে হলুদ খামে ভরা একগাদা চিঠি নিয়ে আসতেন। মানুষ পয়সা দিলে উনি খাঁচা থেকে টিয়া পাখি বের করে সেটাকে সারিবদ্ধভাবে রাখা চিঠির উপর ছেড়ে দিতেন। পাখিটা একটা চিঠি নিয়ে আসার পর উনি সেটা পড়ে শোনাতেন।

 

চিঠির বেশিরভাগ বক্তব্যই সেই ব্যক্তির ভাগ্যের সাথে মিলে যেত। আমি এটা দেখে যারপরনাই অবাক হতাম। টিয়া পাখি কীভাবে জানলো ওই লোকের ভাগ্যে কী আছে?

 

এর বাইরে কিছু মানুষ গান করে ভিক্ষা করতো। বিশেষ করে তিনজন পঙ্গু ফকির ছিল তারা গড়াতে গড়াতে আসতো আর সুরেলা গলায় গান করতো। ভিক্ষুকদের মধ্যে এই তিনজনের উপার্জন ছিল সবচেয়ে বেশি।

 

স্টেশনে আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণ ছিল যাদুকর। উনি যাদু দিয়ে শুরু করতেন, কিন্তু তার উদ্দেশ্য ছিলো লোক জড়ো করে বিভিন্ন প্রকারের সকল রোগের মহৌষধ বিক্রি করা।

 

তার একটা যাদুর কথা এখনো আমার পরিষ্কার মনে আছে। একটা তাসকে কোণাকুণি ভাঁজ করে ত্রিভুজাকৃতি করে মাটিতে রাখতেন, আর সবাইকে বলতেন- কে পারবে ফু দিয়ে সেটাকে উলটে দিতে? কিন্তু কেউই সেটা পারতো না।

 

আমি তাকে একদিন বললাম, আমাকে যাদু শেখান। শুনে উনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে বললেন, তোকে দিয়ে হবে না। কারণ তোর ধৈর্য কম। এরপরও আমি প্রতিদিনই উনার যাদুর জন্য অপেক্ষা করতাম। কারণ, যদি উনি দয়াপরবশ হয়ে আমাকে যাদু শেখাতে রাজি হন। কিন্তু উনি আর শেষ পর্যন্ত রাজি হন নাই।

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.