সিলেট থেকে কি বার্তা দিলো ঐক্যফ্রন্ট?

একাদশ সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে করার দাবিতে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তাদের প্রথম কর্মসূচি পালন করলো।

নানা শঙ্কা আতঙ্কের মধ্যেও বুধবার (২৪ অক্টোবর) পূণ্যভূমি সিলেটের রেজিস্টি মাঠে বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গঠিত এই ঐক্যফ্রন্ট শান্তিপূর্ণভাবেই জনসভা শেষ করেছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা সিলেটের এই জনসভাকে দাবি আদায়ে আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট মনে করেছিলেন। সেখান থেকে কি বার্তা দিবেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা, তাই সবার চোখ ছিল এই জনসভায়।

গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডির) সভাপতি আ স ম আব্দুর রব, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন।

আন্দোলনের মাধ্যমেই তাদের দাবি আদায় করা হবে। তাই বক্তারা এই ঐক্যকে আরও সুসংহত করতে দেশের সকল পর্যায়ের মানুষকে আহ্বান করেন। বক্তারা বলেন, দেশ থেকে গণতন্ত্র হারিয়ে গেছে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন শুরু হয়েছে সিলেট থেকে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন লড়াই শুরু হলো বলেও তারা বলেন। সেখান থেকে বেগম খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দির মুক্তির দাবিও করা হয়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং বেগম খালেদা জিয়া মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন বক্তারা। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমেই মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনা হবে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা হবে।

ড. কামাল হোসেন
জনসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিজয় অনিবার্য ও অবধারিত।ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা জনগণের মালিকানা ফিরিয়ে আনবো। রাষ্ট্রে জনগণের নিয়ন্ত্রণ আনবো। রাষ্ট্রের মূল মালিক হবে জনগণ।’

ড. কামাল বলেন, ‘জনগণের ঐক্যে বিজয় অবধারিত। আমরা ক্ষমতার জন্য নয়, জনগণের অধিকার আদায়ে ঐক্য করেছি। আমরা ৭ দফা দাবি দিয়েছি। সেগুলোর জন্য জনগণকে সুসংগঠিত করুন। তাদের কাছে আমাদের দাবিগুলো পৌঁছে দিন। এটিকে আপনারা হালকাভাবে নেবেন না। আপনারাও বুঝতে পেরেছেন আপনাদের বঞ্চিত করেছে বর্তমান সরকার।’

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
জনসভায় প্রধান বক্তা ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করে এবার আর ডিজিটাল চুরি করতে দেয়া হবে না। তফসিল ঘোষণার আগেই সরকারের পদত্যাগ করতে হবে। সংসদ বাতিল করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আজ যে লড়াই শুরু হয়েছে সেই লড়াইয়ের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে, ভোটোর অধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে। ইভিএম দিয়ে ডিজিটাল চুরি করবেন? সেটি জনগণ হতে দেবে না।’

ফখরুল বলেন, এজন্য আসুন, ঐক্যবদ্ধ হই। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে আমরা এগিয়ে যাবো। বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত আছেন তো? সবার আগে আমাদের খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হবে।’

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আজকের সমাবেশের মধ্য দিয়ে জনগণের জয় শুরু হয়েছে। তফসিল ঘোষণার আগেই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে, সংসদ ভেঙে দিতে হবে, নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে।’ সিলেট থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের যাত্রা শুরু হলো বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

মওদুদ আহমদ
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, আজ নতুন যাত্রা শুরু হলো। দেশে একটি স্বৈরাচারি সরকার রয়েছে। এ কারণে ঐক্য করতে হয়েছে। এই ঐক্যের মাধ্যমে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে। এদেশের জনগণের দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছি, সারা দেশের জনগণ রাস্তায় নামবে।’

আ স ম আব্দুর রব
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডির) সভাপতি আ স ম আব্দুর রব বলেছেন, ‘আজকের এই মাঠে ’৬০ এর দশকে অনেক জনসভা করেছি। দেশ আজ ডাকাতের হাতে পড়েছে। এদেরকে পরাজিত করে বিজয়ের জনসভা করবো এখানে। আমাদের অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছেন। আর একজনকে গ্রেফতার করলে জনগণকে সাথে নিয়ে রাজপথে নামবো।’

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী
বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘দেশ যখন উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে, তখন উন্নয়নের নৌকা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। উন্নয়নের দুর্নীতিতে তাদের চোখে ছানি পড়েছে। এই ছানি কেটে কীভাবে দেশ এগিয়ে নেবে, এ জন্য এই বয়সে ড. কামাল হোসেন দাঁড়িয়েছেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম দাঁড়িয়েছেন, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন দাঁড়িয়েছেন, রব দাঁড়িয়েছেন, আরও অনেকে দাঁড়িয়েছেন।’

মাহমুদুর রহমান মান্না
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘সরকার চোরের মতো, ডাকাতের মতো ভোট ডাকাতি করছে। সিলেটের মানুষ সাহস দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে, মেধা দিয়ে আরিফুল হক চৌধুরীকে বিজয়ী করেছে।’

মান্না বলেন, ‘গত বছর নির্বাচনের সময় ঘরে ছিলেন। এবার কোটি কোটি মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসবে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই আমাদের সাথে কথা বলুন। সিলেটের জনসভা সারাদেশে মানুষের জন্য একটি সিগন্যাল। আমরা বাঁচার অধিকার চাই, সুন্দর দেশের অধিকার চাই। সারাদেশের মানুষ একদিকে, অন্যদিকে শেখ হাসিনার সরকার একা থাকবে। আমরা লড়াই করবো।’

সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ
ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ বলেন, সিলেটে বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জন্ম। তারা মুক্তিযুদ্ধে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন। সিলেটের মানুষ কখনো নিচু করে না, মাথা উঁচু করে হাঁটে। শাহজালাল, শাহপরানের এ অধ্যাত্মিক ভূমি থেকে একটি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সূচনা হলো। সফলতা আসবেই।

শামসুজ্জামান দুদু
বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা সৌদি আরব সফর শেষে সংবাদ সম্মেলনে বলেছে আমরা নাকি ছাল-বাকলামীদের সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐক্য করে ছাল-বাকলামী করছি। শেখ হাসিনা, আজকে এই জনসভায় বলে যাই তোমার বেশি সময় আর নাই, যদি হুসে থাকো নভেম্বরের আগে পদত্যাগ করো। আর সেটা না করলে কারা ছাল-বাকলামী করছে সপ্তাহখানেক পর টের পাবে।’

জেএসডি সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন বলেন, ‘শাহজালাল ও শাহপরানের মাজারে আমরা শপথ নিয়েছি। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে ভোটাধিকার আদায় করতে চাই। নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার আদায় করতে চাই। শাহজালাল ও শাহপরান কোন দিন পরাজিত হন নাই, এই ঐক্যফ্রন্টও পরাজিত হবে না। শেখ হাসিনার পাতা ফাঁদে আমরা পা দেবো না।’