সুন্দরবনে জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীকুল প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে’ 

প্রকাশিত:শনিবার, ২০ জুন ২০২০ ১১:০৬

সুন্দরবনে জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীকুল প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে’ 
 মোংলা প্রতিনিধিঃ
প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীকুল। করোনা ভাইরাসের সংক্রমন ঠেকাতে দেশী-বিদেশী পর্যটক ও দর্শনার্থীদের আনাগোনা বন্ধ থাকায় প্রকৃতির এ বনের প্রাণীজগতে বিরাজ করছে প্রফুল্লতা। ভিন্ন আমেজ ও সজীবতায় ফিরেছে বনের বৃক্ষলতা আর কোলাহল মুখরিত হয়ে উঠেছে ম্যানগ্রোভ এ বনের প্রাণীরা। নদী ও খালের চরাঞ্চলে দেখা মিলছে হরেকরকম বণ্যপ্রানীর। সূত্র মতে, বঙ্গোপসাগারের উপকূলবর্তী ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তের এ বন প্রায় ৪৫০টি নদী-খালে বেষ্ঠিত। এ বনে সুন্দরী,গোওয়া,গরান ও কোওড়া সহ ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে।
রয়েছে স্বনামে খ্যাত রয়েলবেঙ্গল টাইগার, চিত্রা
হরিণ,কুমির ও বানর। বনবিভাগের তথ্য মতে, ২৭০ প্রজাতির পাখি ৪২ প্রজাতির স্তন্যপ্রায়ী ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ,৮টি উভয়চর প্রজাতির আবাসস্থল এবং নদী-খালে রয়েছে কাঁড়া ও শামুক সহ ১২০ প্রজাতির মাছ। ঘুর্নিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক নানা দূযোর্গ মোকাবেলা করে টিকে আছে পৃথিবীর একক
ম্যানগোভ বন সুন্দরবন।
এ ছাড়া রয়েছে বনের প্রকৃতি ও প্রাণীকুলের ওপর রয়েছে মানুষের নিষ্ঠুর আচরন। নিয়ম নীতি না মেনে বনের অভ্যন্তরে পর্যটক, পেশাজীবী সহ বৈধ ও অবৈধ প্রবেশকারীদের পদচারনা, বৃক্ষ নিধন ও বন্যপ্রানী হত্যা-পাচার সহ নানা কারেন বিপর্যয়ের মুখে পড়ে সুন্দরনের জীববৈচিত্র্য। এতো দিন সরকারি-বেসকারি নানামুখী তৎপরতা ও উদ্যোগ নেয়া হলেও
মানুষের এমন নিষ্ঠুরতা থেকে রেহাই পায়নি প্রাকৃতিক পরিবেশ।কিন্তু বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস মহামারী ধারন করায় গত ১৯ মার্চ থেকে লডডাউন করা হয় সুন্দরবন।
আর এ কারনে সুন্দরবনের দর্শনীয় স্পট ও অভ্যন্তরে পর্যটক যাতায়াত বন্ধ রাখা হয়। টানা
একমাস ধরে পর্যটক শুন্য এ বনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীরা উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে। এতোদিন মানুষের কারেন যে সকল প্রাণীর অহরহ দেখা মিলতো না। সেই সকল প্রাণীদের ছুটা ছুটি ও কোলাহল এখন চোখে পড়ার মতো। নদী-খালের চরাঞ্চলে নির্ভয়ে বিচরন করছে হরিন-বানর ও বণ্য শুকর । শিকারের সন্ধানে ছুটে চলছে রয়েলবেঙ্গল টাইটার। বিষাক্ত সাপ, কাঁকড়া ও হরেক রকম পাখির আনাগোনাও বেড়েছে। নদীর বাঁকে শিকারের অপেক্ষায় ওৎ পেতে আছে নোনা জলের রাক্ষুসে কুমির। গাছে-তরুলতায় ফুল ফুঁটেছে, জানান দিচ্ছে মধু মাসের। মানব সভ্যতার লোকাহল থেকে আড়ালে থাকা ম্যান গ্রোভ বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ এখন ভিন্ন রুপে সেছেছে। আর প্রাণী জগতের মধ্যেও যেন বইছে প্রকৃতির আমেজ। নদীর মোহনায় দেখা মিলছে শুশুক ও ইরাবতি ডলফিনের বিচরন।
 করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়েছে সুন্দরবনের পর্যটন খাতে। বনবিভাগ থেকে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা জারির পর সুন্দরবনে দর্শনীয় স্থান সমূহ এখন পর্যটক শুন্য। আর এ অবস্থা অব্যহত থাকলে থাকলে পর্যটন খাতে সুন্দরবন বিভাগের রাজস্ব অনেকটা হ্রাস পাবে।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মোঃ বশির উল্লাহ আল মামন যুগান্তরকে জানান, ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে পশ্চিম
বনবিভাগের অধিনে পর্যটন খাতে রাজস্ব আয় ৭৪ লাখ টাকা। আর চলতি অর্থ বছরে প্রাকৃতিক দুযোর্গ সহ নানা কারনে রাজস্ব
একতৃতীয়াংশ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ দিকে সুন্দরবনের পূর্ব বনবিভাগ সূত্র জানায়, ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে বিভিন্ন দর্শনীয় স্পটে দেশী-বিদেশী ১ লাখ ১৯ হাজার ১শ’৫ জন পর্যটক প্রবেশ করে। আর এ ক্ষেতে তখন আয় হয়েছেলি ১ কোটি ১৯ লাখ ৫হাজার ৪শ’টাকা। চলতি অর্থ বছরের ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত সুন্দরবনে ৮৯ হাজার৭শ’৭৬ জন দেশী-বিদেশী পর্যটকের
সমাঘম ঘটে। তাতে এ পর্যন্ত আয় হয় ৯৪ লাখ ১ হাজার ২শ’টাকা।
তবে এ বছর রাজস্ব আয় অনেকটা কমে যাওয়ার আশংকা করছে বনবিভাগ।বনবিভাগ সূত্র আরও জানায়, ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সুন্দরবন কেন্দ্রেীক পর্যটকদের ভর মৌসুম থাকে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রভাবের কারনে গত ফেব্রুয়ারী মাস থেকে সুন্দরবনে
বিদেশী পর্যটক একেবারেই হ্রাস পায়। একই সঙ্গে দেশীয় পর্যটকদের সমাঘমও কমতে থাকে।
এ অবস্থায় করোনা ভাইরাসের ঝুকি এড়াতে গত ১৯ মার্চ থেকে পর্যটকদের বনে যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তার মতে-পর্যটক না থাকলে এ খাতে বনবিভাগের রাজস্বও হ্রাস পাবে। তিনি জানান, এ বছর শুধু মাত্র করমজল পর্যটন স্পটের রাজস্ব আয়ের টার্গেট ছিল ২৬ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত আয় হয়েছে প্রায় ২১ লাখ টাকা। রাজস্ব আয়ের সিংহ ভাগ অর্জিত হয়েছে ডিসেম্বর, জানুয়ারী মাসে।
সুন্দরবনের দর্শনাীয় স্থান করমজল, হারবাড়িয়া, কটকা, চকিখালী ও হিরনপয়েন্ট এলাকা এখন পর্যটক শুন্য রয়েছে। বনবিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে এ নিষেধাজ্ঞা সাময়িক সময়ের জন্য বলবৎ থাকবে বলে জানিয়েছেন পূর্ব বন বনবিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মোঃ বেলায়েত হোসেন। তবে কবে নাগাদ আবারও সুন্দরবনে পর্যটকদের যাতায়াত শুরু হবে তা নিশ্চিত করে জানাতে পারেনি তিনি।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের দর্শনীয় স্থান ও করমজল বণ্য প্রানী প্রজজন কেন্দ্রের ইনচার্জ মোঃ আজাদ কবির বলেন, সুন্দরবনের প্রাণীকুলে ভিন্নরকম উদ্দীপনা বিরাজ করছে। তবে প্রজনন কেন্দ্র সহ বণ্যপ্রানীর মধ্যে করোনার সংক্রমন রোধে সর্তকতামূলক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। প্রজনন কেন্দ্রে নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে বনরক্ষীদের। মানুষ থেকে প্রাণীকুলে এবং বণ্য প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে যাতে কোন প্রকার ভাইরাস সংক্রমন প্রবেশ করতে না পারে সেই জন্য বনরক্ষীদের জররুী ভিত্তিতে পিপিই প্রয়োজন।
বাপা’র বাগেরহাট জেলা সম্বয়কারী মোঃ নুর আলম শেখ বলেন, প্রকৃতির সঠিক পরিবেশ পেলে বনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীকুলের মধ্যে সজীবতা ফিরবে এটাই স্বাভাবিক। বিশ্ব ব্যাপী ভারি কলকারখানা বন্ধ রয়েছে, এ কারনে কার্বোন নির্গমনও এখন প্রায় শুণ্যের কোঠায়। এতে প্রাকৃতিক বন সুন্দরবনের ওপর ও চাপ কমেছে। ফলে আর প্রত্যেক প্রাণীর নিজস্ব আবাস ও পরিবেশ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে বন ওবণ্য প্রানী সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি আরও বলেন, মানবকুলের মহামারী থেকে এটাই শিক্ষা নিতে হবে।
বন ও প্রকৃতি গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, আগামীতে পরিকল্পিত সহনশীল পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রাণীকুল-জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্য এবং প্রাণীকুলের এ সজীতা ধরে রাখতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। #
Attachments area

এই সংবাদটি 1,228 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •