স্বপ্নের পদ্মা সেতু! তাড়াহুড়া কাম্য নয়

সরকারের শেষ সময়ে এসে দেশের নিরুত্তাপ রাজনীতিতে পদ্মা সেতু হঠাৎ করেই নতুন উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ব্যঙ্গ করে বলেন, জোড়াতালি দিয়ে পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে।

 

সুতরাং যে কোনো সময় সেতুটি ভেঙে পড়তে পারে। এ কারণে তিনি দলীয় নেতা-কর্মী এবং সমর্থক-সজ্জনদের আগামী দিনে জোড়াতালির ঝুঁকিপূর্ণ পদ্মা সেতুতে চড়ে সর্বনাশা  পদ্মা নদী পাড়ি না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।   এর বাইরে সরকার সমর্থক নেতা-কর্মীরা নানা বচন-বিবৃতিতে বিভিন্ন মাধ্যমে বেগম জিয়ার সমালোচনা করেছেন। টিভি টকশো, রাজপথ, সভা-সমিতি, সেমিনার এবং ফেসবুকে সরকার সমর্থক এবং বিরোধীরা পদ্মা সেতুর জোড়াতালি নিয়ে বেগম জিয়ার বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে হাজারো যুক্তি ব্যঙ্গ কৌতুক এবং টিকা-টিপ্পনী কেটে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলেছেন।

পদ্মা সেতু নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ের চেয়েও বেশি উত্তাপ ছিল অতীতে। ছিল নানামুখী দেশি-বিদেশি চক্রান্ত। সেতুটিতে অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংক যে নাটক শুরু করেছিল তাতে এক সময় সরকারের ভিত পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। পদ্মা সেতু প্রকল্পে আগামীতে দুর্নীতি হতে পারে এমন ভুয়া অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক বিশ্বের তাবৎ গণমাধ্যমে তা ফলাও করে প্রচার করতে আরম্ভ করে।

পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনকে বরখাস্ত করার পাশাপাশি সেতু বিভাগের সচিব মোশারফ হোসেনকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়। এর বাইরে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে সেতু প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে এবং স্পর্শকাতর করার জন্য বিশ্বব্যাংক একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি পাঠায়। বাংলাদেশে যারা দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গে একত্রে কাজ শুরু করেন।

বিশ্বব্যাংককে খুশি করার জন্য তৎকালীন দুদক যথাসাধ্য চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি ঘটেনি। এরই মধ্যে হঠাৎ করে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে তাদের প্রস্তাবিত ১২০ কোটি মার্কিন ডলার অর্থায়ন স্থগিত করে এবং কিছু দিন পর তা প্রত্যাহার করে নেয়। এ অবস্থায় সরকার প্রথমে বিকল্প বৈদেশিক ঋণের জন্য চেষ্টা-তদ্বির শুরু করে। ভারত, চীন, রাশিয়া, সৌদি আরব, দুবাইসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে কূটনৈতিক তত্পরতা চালানো হয় পদ্মা সেতু প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারি বা বেসরকারি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করার জন্য। অনেকে আগ্রহ দেখিয়ে ঘন ঘন বাংলাদেশ সফরে আসেন। কিন্তু তাদের শর্ত সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সরকারকে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।

 

পদ্মা সেতু নিয়ে ১৯৯১ সাল থেকেই বিতর্ক শুরু হয়। এরশাদ সরকারের শেষ দিকে পদ্মার ওপর একটি সেতু নির্মাণের জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং এই লক্ষ্যে প্রাথমিক জরিপ, মূল্যায়ন, অর্থায়ন ইত্যাদি নিয়ে কিছু প্রাথমিক কাজ শুরু হয় যা পরবর্তীতে ধীরলয়ে চলতে থাকে ২০০১ সাল পর্যন্ত। ২০০১-পরবর্তী বিএনপি সরকারের সময়ে সেতু নির্মাণের স্থান নির্ধারণ নিয়ে কার্যক্রম শুরু হলে ঢাকা ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সব জেলার লোকজন মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একপক্ষ দাবি করে আরিচা পয়েন্টে সেতু নির্মাণ করার জন্য। তাদের দাবির পক্ষে হাজারো যুক্তির মধ্যে দুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। একটি হলো— আরিচা পয়েন্টে সেতু নির্মিত হলে সেতুর দৈর্ঘ্য হবে মাওয়া পয়েন্টের সেতুর তুলনায় অর্ধেক বা তার চেয়ে একটু বেশি। দ্বিতীয়ত; নদীশাসন, অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণ ব্যয় যেমন অর্ধেক নেমে আসবে তেমনি ওই অঞ্চলের নদীর তলদেশ মাওয়া পয়েন্টের তুলনায় সেতুর পিলার নির্মাণের জন্য অধিকতর উপযোগী হওয়ায় মূল সেতুর নির্মাণ যেমন সহজসাধ্য হবে তেমনি খরচও পড়বে কম।

 

বিএনপির তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা ঢাকার দোহার অঞ্চলের বাসিন্দা হওয়ার কারণে দেশবাসী ধরেই নিয়েছিলেন যে, যত অসুবিধাই হোক, শেষ পর্যন্ত মাওয়া পয়েন্টেই সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। মন্ত্রীর প্রভাবে কিনা বলতে পারব না তবে বিদেশি বিশেষজ্ঞ দল, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রকৌশলীরা এবং বুয়েটের বিশেষজ্ঞ প্যানেল আরিচা পয়েন্টের তুলনায় মাওয়া পয়েন্টকে পদ্মা সেতুর জন্য অধিকতর উপযোগী বলে রিপোর্ট প্রদান করে।

 

এরশাদ সরকারের আমলে সেতুর প্রাক্কলিক ব্যয় ধরা হয়েছিল চার হাজার কোটি টাকা। বিএনপি আমলে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় আট হাজার কোটি টাকায়। আওয়ামী লীগ আমলে বিশ্বব্যাংকের কাছে যে প্রস্তাব পাঠানো হয় সেখানে প্রাক্কলিক ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার কোটিতে। বিশ্বব্যাংকের নকশা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নদীশাসন, পুনর্বাসন ইত্যাদি শর্ত পূরণ করে যখন পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব তৈরি করা হয় তখন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকায়। এরপর বিভিন্ন কারণে সেতু নির্মাণের ব্যয় আরও বেড়ে যায়। বিশ্বব্যাংক তাদের ঋণ প্রস্তাবনা ফিরিয়ে নেওয়ার আগে সেতুর ব্যয় ১৭ হাজার কোটি টাকা অনুমোদন করে। সরকার যখন সিদ্ধান্ত নেয়, নিজেদের অর্থে সেতু নির্মিত হবে তখন নির্মাণ ব্যয় আরও কয়েক দফা বৃদ্ধি পেয়ে শেষ পর্যন্ত ৩০ হাজার ৯৭৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা দাঁড়ায়।

 

সরকারবিরোধীরা পদ্মা সেতু নিয়ে যে অব্যাহত অপপ্রচার চালাচ্ছেন তার প্রধান অধিক্ষেত্র হলো সেতু নির্মাণের ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে জঞ্জাল সৃষ্টি করা এবং সেই জঞ্জালে সাগর-মহাসাগর চুরির মতো মহাদুর্নীতি হয়েছে এ কথা বলে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করা।

 

পদ্মা সেতু নিয়ে চলমান নানামুখী অপপ্রচারের জবাবে সরকারের পক্ষ থেকে ফলপ্রসূ কিছু করা হয়েছে বলে আমার নজরে আসেনি। অধিকন্তু অপপ্রচারকারীরা যখন তুমুল বেগে আক্রমণ চালান তখন সরকার সমর্থকরা উত্তেজিত হয়ে গালাগাল দিতে থাকেন যা জনমনের সন্দেহ বরং বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। বিরোধীদের অপপ্রচারের জবাবে যেভাবে তত্ত্ব-উপাত্তসহকারে যুক্তিযুক্তভাবে সরকারের জবাব দেওয়া উচিত সেভাবে তারা না দেওয়ার কারণে দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধানতম বিরোধী দলের সভানেত্রী পদ্মা সেতুর নিরাপত্তা নিয়ে ব্যঙ্গ করার সুযোগ পেয়েছেন। অথচ সেতু নির্মাণে সাম্প্রতিককালে যেসব প্রাকৃতিক বিপত্তি দেখা দিয়েছে তার একমাত্র কারণ হলো মাওয়া-জাজিরা পয়েন্টকে সেতু নির্মাণের স্থান নির্বাচন করা, যা গৃহীত হয়েছিল বিএনপি আমলে এবং তৎকালীন বিএনপি সরকারের কোটারী স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে আমি প্রথমে সেতুর ব্যয় বৃদ্ধি এবং পিলার বসানো নিয়ে নদীর তলদেশে সৃষ্ট অদ্ভুত ঘটনা সম্পর্কে আমার মতামত ব্যক্ত করে আজকের নিবন্ধ শেষ করব।

 

এরশাদ সরকার, বিএনপি সরকার এবং গত মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেতুটির প্রাক্কলিক ব্যয়কে যারা সেতু নির্মাণের আসল খরচ বলে ভুল করেন এবং দফায় দফায় তা বৃদ্ধি পাওয়ার মধ্যে দুর্নীতির অর্থ খুঁজে বেড়ান তারা হয়তো জানেন না যে, প্রাক্কলিক ব্যয় সাধারণত আনুমানিক হয়ে থাকে। কাজেই পদ্মা সেতুর নকশা অনুযায়ী প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ হয় ২০১০ সালের দিকে এবং সেটির পরিমাণ ছিল ১২ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তীতে বিভিন্ন ধাপে ব্যয় বৃদ্ধি পায় মূলত নকশা পরিবর্তন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নির্মাণ সামগ্রী ও বিশেষজ্ঞদের মজুরি বৃদ্ধির কারণে। বিশ্বব্যাংক নিজেদের দায়িত্ব এবং তদারকিতে প্রকল্পের খরচ প্রায় ১৭ হাজার কোটিতেও উন্নীত করে যেখানে বাংলাদেশ সরকারের আসলে কিছুই করার ছিল না।

 

পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে বিশ্বব্যাংকের বাড়াবাড়ি, অতিরিক্ত দাদাগিরি এবং প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে নিজেদের পছন্দমতো ঠিকাদার, পরামর্শক এবং স্থানীয় কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য চাপ প্রয়োগের ধরন-ধারণ ছিল রীতিমতো অসম্মানজনক, মর্যাদাহানিকর এবং বিরক্তিকর। তারা যে মহল বিশেষ দ্বারা পরিচালিত হয়ে আওয়ামী লীগ সরকারকে বিপদে ফেলতে চাচ্ছিল তা আমি টের পেয়েছিলাম ২০১০ সালের প্রথম দিকে। আর এ কারণে সর্বপ্রথম সংসদীয় কমিটি, টেলিভিশন টকশো, সভা-সমিতি ও সেমিনারে প্রকাশ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের বিরোধিতা করে বলেছিলাম যে, সরকার যদি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের জন্য অপেক্ষা করে তবে সেতু তো দূরের কথা— একটি পিলার বসানো সম্ভব হবে না। আমি নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি তুলতে থাকি, যা পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক অনুমোদিত হয়।

 

এখন প্রশ্ন হলো, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে প্রকল্প ব্যয় ১৭ হাজার কোটি থেকে এক লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়াল কেন! এ প্রশ্নের উত্তর খুবই সহজ ও সরল যা একটি শিশুও বুঝতে পারবে। বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পে পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ ছিল না। নিজস্ব অর্থায়নে রেল সংযোগ অন্তর্ভুক্ত করার কারণে সেতুটি দ্বিতল আকার ধারণ করে। এতে আরও গভীর পাইলিং, অধিকতর পিলার ও স্প্যান স্থাপন, দুই পাশের সংযোগ সড়কের নকশা পরিবর্তন, রেললাইন এবং রেলস্টেশনের জন্য আলাদা সার্ভিস স্টেশন স্থাপন এবং এই কাজের জন্য অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ, নদীশাসন ইত্যাদি কাজে ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে পড়ে। এ ব্যাপারে খরচের খাতগুলো আলাদা আলাদা উল্লেখ করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। সম্মানিত পাঠকদের সদয় অবগতির জন্য পদ্মা সেতুর খরচের খাত এবং সেতুর বিবরণ নিম্নে প্রদান করা হলো।

 

মূল সেতুটির দৈর্ঘ্য হবে ছয় কিলোমিটার যার দোতলায় থাকবে চার লেনের সড়ক এবং নিচতলায় থাকবে সিঙ্গেল লাইন রেলপথ। এই কাজের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার ১০০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। কেউ যদি কিলোমিটার হিসেবে বিশ্বের অন্যান্য সেতুর খরচের সঙ্গে তুলনা করতে চান সেক্ষেত্রে রেল ও সড়ক মিলিয়ে মোট সাড়ে ১২ কিলোমিটার সেতুর খরচ ধরলেই ১২ হাজার কোটি টাকার হিসাব মিলে যাবে। সেতু প্রকল্পের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হলো নদীশাসন। নদীর দুই পাড়ে ১৪ কিলোমিটার এলাকা যেন ভবিষ্যতে ভাঙতে না পারে এ জন্য পৃথিবীর বৃহত্তম ও ব্যতিক্রমধর্মী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে পদ্মার দুই পাড়ে, যার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৭০৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

 

পদ্মার অপর পাড়ে জাজিরা পয়েন্টে সাড়ে ১০ কিলোমিটার সংযোগ সড়কের জন্য খরচ হবে ১ হাজার ৯৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অপরদিকে মাওয়া পয়েন্টে সংযোগ সড়ক এবং সেতুর অ্যাপ্রোচ স্থাপনা নির্মাণে খরচ হবে ১৯৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সেতুর দুই পাশে টোল প্লাজা, ফায়ার সার্ভিস, নিরাপত্তামূলক স্থাপনা প্রভৃতি বাবদ ব্যয় করা হবে ২০৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। পদ্মার দুই পাড়ে মোট ১৪০৮.৫৪ হেক্টর জমি কেনা বাবদ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়, উচ্ছেদকৃত লোকদের পুনর্বাসনের জন্য ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ৩ হাজার আবাসিক প্লট ও বহু সংখ্যক বাণিজ্যিক প্লট হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণে প্রকল্পের অর্থে পদ্মা সেতু এলাকায় প্রায় ৬০ হাজার বৃক্ষরোপণ করে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পের পরামর্শ, তদারকি ইত্যাদি বাবদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং টিম এবং একটি কোরীয় প্রতিষ্ঠানকে মোট ৬০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে।

 

এবার পদ্মা সেতুর নির্মাণ বিশেষত পিলার বসানো নিয়ে সৃষ্ট সমস্যা সম্পর্কে কিছু বলা যাক। বিভিন্ন মাধ্যমে সংবাদ অথবা গুজব ছড়িয়ে পড়েছে যে প্রায় ১৪টি পিলার বসানোর ক্ষেত্রে নতুন জটিলতা দেখা দিচ্ছে। কারণ যেসব এলাকায় বা স্থানে ওইসব পিলার বসবে সেসব এলাকার ভূ-গর্ভে প্রতি মুহূর্তে প্রাকৃতিক বিবর্তন ও পরিবর্তন হচ্ছে যা পৃথিবীর অন্য কোনো নদীর তলদেশে কোনো দিন হয় না— এমনকি পদ্মা নদীর অপর অংশের ভূগর্ভে এমন বিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না। সমস্যাটি অতীব অদ্ভুত যা প্রকল্পসংশ্লিষ্ট দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ধারণা ও কল্পনার বাইরে ছিল। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে জাইকার অর্থায়নে যখন প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছিল এবং মাওয়া-জাজিরা পয়েন্টে সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল ঠিক সেই সময়টিতে ইচ্ছে করলে সমস্যাটি চিহ্নিত করা যেত বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট অনেকেই অভিমত ব্যক্ত করেছেন।   কারণ প্রকল্পের মাটি পরীক্ষা বাবদ সেই আমলে জাইকার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল যার ওপর ভিত্তি করেই প্রকল্পের নকশা তৈরি করা হয়।

 

আমরা আজকের নিবন্ধের একেবারে শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকার পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ খুব দ্রুত শেষ করার জন্য যারপরনাই তাড়াহুড়া করছে। ইতিমধ্যে প্রকল্পের অর্ধেক কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ শেষ করার জন্য সরকার যখন সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে ঠিক তখনই সেতুর পিলার সংক্রান্ত সংবাদ অথবা গুজব, বেগম জিয়ার জোড়াতালি দেওয়া সেতু তত্ত্ব ইত্যাদি দৃশ্যপটে আসছে। এ অবস্থায় সরকারের উচিত আত্মবিশ্বাস নিয়ে আপন কর্মের প্রতি অবিচল থাকা। কারণ পদ্মার মতো ব্যতিক্রমধর্মী, জটিল এবং বিশ্বের সর্বাধিক ভাঙনপ্রবণ বৃহত্তম নদীর ওপর এত বড় দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্মাণের নজির পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। এটির নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হলে এটি হবে বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্যতম একটি প্রধান মাইলফলক— যার জন্য বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়তা, সৎ সাহস ও ঝুঁকি নেওয়ার কাহিনী ইতিহাসের পাতায় অমরত্ব লাভ করবে।   কাজেই মহলবিশেষের প্ররোচনা অথবা প্রচারণায় প্রলুব্ধ হয়ে সরকার যদি তাড়াহুড়া করে সামান্যতম ভুল করে বসে তবে পদ্মা সেতু প্রকল্পে মহাসর্বনাশ ঘটে যেতে পারে!

 

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য ও কলামিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *