Sat. Nov 16th, 2019

BANGLANEWSUS.COM

-ONLINE PORTAL

হেমন্ত এল একদিন পর!

1 min read

কুয়াশার হালকা চাদরে ঢাকা সন্ধ্যার প্রকৃতি। বাতাসে হিমেল আমেজ। পাখির কলকাকলিতে মুখরিত ভোর। এমন আবহ বলে দেয় আমাদের, হেমন্ত এসেছে।

এবার বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কারের কারণে হেমন্ত এসেছে একদিন পিছিয়ে। ভাষা দিবস, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের বাংলা ও ইংরেজি তারিখের সাযুজ্য রাখতে বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কার করেছে সরকার, যার ফলে এ বছর আশ্বিন মাস এসেছে ৩১ দিন নিয়ে। ফলে বাংলা বর্ষপঞ্জির কার্তিক মাস এবার শুরু হলো বৃহস্পতিবার থেকে।

বাংলা একাডেমির পরিচালক (গবেষণা, সংকলন এবং অভিধান ও বিশ্বকোষ বিভাগ) মোবারক হোসেন জানান, পুরনো নিয়মে বৈশাখ থেকে ভাদ্র- এই পাঁচ মাস গণনা করা হত ৩১ দিনে। আর আশ্বিন থেকে চৈত্র- সাত মাস হত ৩০ দিনে। তবে ইংরেজি লিপইয়ারে ফাল্গুনে মাস ৩১ দিনে হত। এখন নতুন নিয়মে বৈশাখ থেকে আশ্বিন- প্রথম ছয় মাস ৩১ দিনে হবে। কার্তিক, অগ্রাহায়ণ, পৌষ, মাঘ ও চৈত্র- এই ৫ মাস হিসাব করা হবে ৩০ দিনে। আর ২৯ দিনে হিসাব করা হবে ফাল্গুন। ইংরেজি লিপইয়ারের বছর এক দিন বেড়ে ফাল্গুন হবে ৩০ দিনের মাস।

মোবারক হোসেন জানান, বাংলা একাডেমির বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ক্যালেন্ডার সংস্কারের বিষয়টি প্রজ্ঞাপন দিয়েও জানিয়েছিল। সে অনুযায়ী চলতি ১৪২৬ বঙ্গাব্দ থেকেই সরকারিভাবে নতুন পঞ্জিকা অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে তারিখে পরিবর্তনের বিষয়টি কার্যকারিতা পায় গতকাল বুধবার, আশ্বিন-কার্তিকের সন্ধিক্ষণে এসে।

বুধবার সকালে কোনো কোনো পত্রিকায় বাংলা তারিখ লেখা হয় পহেলা কার্তিক। আবার নতুন নিয়ম অনুসরণ করে কয়েকটি পত্রিকা ৩১ আশ্বিনই ছাপা হয়। পুরনো পঞ্জিকা অনুযায়ী সফটওয়্যার তৈরি হওয়ায় অধিকাংশ অনলাইন সংবাদপত্রে দেখানো হয় ১ কার্তিক।

বাংলাদেশের ষড়ঋতুর হিসেবে কার্তিক-অগ্রহায়ণ হেমন্তের মাস। কার্তিক হচ্ছে, শরতের পরেই আগত ঋতু হেমন্তের প্রথম মাস।

কার্তিকের একটি চমৎকার বর্ণনা এরকম- এই সময়ে বাংলাদেশের প্রকৃতিতে প্রগাঢ় সবুজ যেমন পাওয়া যায়, তেমনি পাওয়া যায় শীতের মিষ্টি আমেজও। গ্রীষ্মের মাটি ফাঁটানো দাবদাহ নেই, বর্ষার অঝোর ধারায় ভিজে যাওয়া বা কাঁদা নেই, হাড় কাঁপানো শীত যে মাসে নেই তারই নাম কার্তিক।

কবি জীবনানন্দের ভাষায় কার্তিক নবান্নের। তিনি লেখেন, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায় / হয়তো মানুষ নয় হয়তোবা শাঁখচিল শালিকের বেশে,/ হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে/ কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব কাঁঠাল ছায়ায়।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কার্তিকের ঋতু হেমন্তকে নিয়ে তার ‘নৈবদ্যে স্তব্ধতা’কবিতায় লিখেছেন- ‘আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে/ জনশূন্য ক্ষেত্র মাঝে দীপ্ত দ্বিপ্রহরে/ শব্দহীন গতিহীন স্তব্ধতা উদার/ রয়েছে পড়িয়া শ্রান্ত দিগন্ত প্রসার/ স্বর্ণশ্যাম ডানা মেলি।’

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম গেয়েছেন- ‘উত্তরীয় লুটায় আমার/ ধানের খেতে হিমেল হাওয়ায়।/ আমার চাওয়া জড়িয়ে আছে/ নীল আকাশের সুনীল চাওয়ায়।/ ভাঁড়ির শীর্ণা নদীর কূলে/ আমার রবি-ফসল দুলে, /নবান্নেরই সুঘ্রাণে মোর/ চাষির মুখে টপ্পা গাওয়ায়।’ (হৈমন্তী তেওড়া)

হেমন্তে দেখা যায় অখণ্ড নীল আকাশ। মিষ্টি সোনা রোদ বলতে যা বুঝা তা দেখা যায় এই হেমন্তেই। হেমন্ত শরৎ থেকে সে খুব পৃথক নয়, শীত থেকেও তেমন বিচ্ছিন্ন নয় তার প্রকৃতি, শীত-শরতের মাখামাখি একটি স্নিগ্ধ সুন্দর বাংলা ঋতু। হেমন্তের শিশির ভেজা ঘাসের ডগা যেন মুক্তার মেলা।

এক সময় বাংলায় বছর শুরু হতো হেমন্ত দিয়ে। সম্রাট আকবর অগ্রহায়ণ মাসকেই বছরের প্রথম মাস বা খাজনা তোলার মাস ঘোষণা দিয়েছিলেন। কারণ, ধান উৎপাদনের ঋতু হলো এই হেমন্ত। হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকে ধানে পাক ধরে। কার্তিকের শেষ দিকে গ্রামের মাঠে মাঠে ধান কাটার ধুম পড়ে যায়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে পাকা ধানের গন্ধে মৌ মৌ গন্ধ।

জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশের ষড়ঋতুতে। ঋতুর উপস্থিতিতে ঘটছে তারতম্য। তারপরও কী কমে গেছে হেমন্তের আবেদন! হেমন্ত কী মোটেও হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছেনা আমাদের!!

Copyright © Banglanewsus.com All rights reserved. | Newsphere by AF themes.