মানিকগঞ্জে পানিবন্দি ২ লাখ মানুষ, ২৫৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ

প্রকাশিত:বুধবার, ০৩ আগ ২০১৬ ১১:০৮

মানিকগঞ্জে পানিবন্দি ২ লাখ মানুষ, ২৫৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি:
মানিকগঞ্জের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা-যমুনা নদীর পানি কয়েক দিন ধরে কমতে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় শিবালয় উপজেলার আরিচাঘাট পয়েন্টে হ্রাস পেয়েছে আরো ১২ সেন্টিমিটার পানি।বুধবার সকালে এই পয়েন্টে বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে । পদ্মা-যমুনায় পানি কমলেও অপরিবর্তিত রয়েছে শাখা নদী ইছামতি, কালীগঙ্গা ও ধলেশ্বরী। এ কারণে এসব নদী তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে ভাঙন ও বন্যার পানিতে বাড়ি-ঘর ও ফসলি জমি পানি নিম্মজিত অবস্থায় রয়েছে।
রা¯তা-ঘাট, বাঁধ ভেঙ্গে ও ডুবে গিয়ে এখনো পানিবন্দি হয়ে চরম দুভোর্গে পড়েছেন জেলার ৬৫টি’র মধ্যে ৩৫টি ইউনিয়নের প্রায় দুই লাখ মানুষ। ডুবে ও আঙিনায় পানি ঢুকে ২৫৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বেশীর পুকুর বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে মৎস্য চাষীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। বাড়ি-ঘর ডুবে বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির অভাবে পড়েছে অনেক পরিবার।
গত তিনদিন ধরে এ জেলার বন্যা দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ তৎপরতা চালাচ্ছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। আওয়ামীলীগের যুগ্ন সাধারন সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবীর নানক এমপি এ জেলার বন্যা দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ তৎপরতা মনিটরিং এ দায়িত্বে আছেন।এছাড়াও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একটি টিম এ জেলায় ত্রান বিতরনে সহযোগীতা করছেন।শিবালয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ রিডার (জিআর) রিমন শিকদার জানান, যমুনা নদীর এ পয়েন্টে গত সপ্তাহে পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা (৯.৪০ মিটার) পৌছে। বিপদসীমা ছাড়িয়ে ৫৭ সেন্টিমিটার উপর দিকে প্রবাহিত হয় পানি।
এরপর সোমবার থেকে কমতে শুরু করেছে। বুধবার সকাল নয়টা থেকে গত ২৪ ঘণ্টায় এই পয়েন্টে আরো ১২ সেন্টিমিটার পানি হ্রাস পেয়ে ৯ দশমিক ৭২ মিটারে নেমেছে।প্রতি তিন ঘণ্টা পর পর এই পয়েন্টে পানি স্তর পরিমাপ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বন্যা কবলিত এলাকার লোকজন জানায়, সপ্তাহ খানেক ধরে দেশের প্রধান নদী মানিকগঞ্জের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা-যমুনার পানি বৃদ্ধি পায়। এর সাথে সাথে শাখা নদী ইছামতি, কালিগঙ্গা, ধলেশ্বরীতে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।বিশেষ করে যমুনা নদীর চরাঞ্চল ও তীরবর্তী এ জেলার দৌলতপুর উপজেলার চরকাটারী, বাঁচামারা, বাঘুটিয়া, জিয়নপুর, খলসী ও শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়ন এবং পদ্মা নদীর হরিরামপুর উপজেলার আজিমনগর, ধূলসুড়া, সুতালড়ি , লেছড়াগঞ্জ ও শিবালয়ের আরুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার পাবিত হয়েছে।
এতে প্রায় ৪০ হাজার পরিবার পরিবারের অšতত দেড় লাখ সদস্য পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে এসব এলাকার হাজার হাজার একর ফসলি জমি।এছাড়াও, পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন শাখা নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোর আরো অšতত ৬০ হাজার মানুষ। নিকটবর্তী আশ্রয় কেন্দ্রেও আছেন অনেক পরিবার। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন তালিকা অনুযায়ী এ পর্যন্ত সাতটি’র মধ্যে ছয়টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নে ৪৪ হাজার ১০৩টি পরিবার বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এছাড়া, পানিতে ডুবে ২৫৯টি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
বাঘুটিয়া এলাকার মকবুল জানান, বন্যার পানিতে তার বাড়ি-ঘর ডুবে গেছে। কোরবানির হাটে বিক্রির জন্য চারটি গরু পালন করছেন তিনি। পরিবার পরিজন ও এই গরু নিয়ে কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।
তেওতা ইউনিয়নের আলোকদিয়া চরাঞ্চলের আব্দুল করিম জানান, বন্যার পানিতে ঘর তলিয়ে গেলেও গরু নিয়ে ডাকাত আতঙ্কে ও নিরাপত্তাহীনতায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আছেন তিনি।তাদের মতো আরো অনেকে বাড়ি-ঘর তলিয়ে গিয়ে গৃহপালিত পশু-পাখি নিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহানের কথা জানিয়েছেন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আলেয়া ফেরদৌসী সাংবাদিকদের জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়ে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে। বন্যা শেষে ছুটির দিনেও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ব্যবস্থা করা হবে।
মানিকগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আলিমুজ্জামান মিয়া জানান, বন্যার পানিতে ১৬ হাজার ২৩৫ হেক্টর ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে রোপা আমনের বীজতলা ৭০ হেক্টর, রোপা আমন ৯৫০ হেক্টর, বোনা আমন ১৪ হাজার ৫০ হেক্টর, আউস ২০০ হেক্টর, সবজি ৩৫০ হেক্টর, ভূট্টা ১৬৫ হেক্টর ও ৪৫০ হেক্টর অন্যান্য ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নূরতাজুল হক জানান, বন্যা কবলিত ছয়টি উপজেলার ২ হাজার ৬৩৬টি পুকুর ও মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। এতে ৬৬২ মেট্রিক টন মাছ ও ৯০ লক্ষাধিক পোনা বের হয়ে মৎসচাষিরা প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতিগ্র¯ত হয়েছেন।
মানিকগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী গাউস-উল-হাসান মারুফ জানান, বানিয়াজুরী-হরিরামপুর সড়কের প্রায় ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে ১৪ কিলোমিটারে এলাকাজুড়ে বন্যার পানি উঠেছে। সড়কটি ভাঙর রক্ষায় ও দুর্ঘটনা এড়াতে মঙ্গলবার সকাল থেকে এই সড়কে বাস ও ট্রাকসহ ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ জানান, শহর রক্ষা বাঁধের বেউথায় ও সদর উপজেলার হাটিপাড়া ইউনিয়নের কাইশাখালী এলাকায় ঢাকা-মানিকগঞ্জ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে দিয়ে পানি ঢুকে পড়েছেদু’টি স্থানে বালুর বাস্তা ফেলা হয়েছে। এছাড়া, বন্যা কবলিত অসংখ্য বসতভিটা ও ঘরবাড়িরও ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা হক পাটোয়ারী জানান, বন্যার পানিতে প্রতি নিয়তই রাস্তাঘাট এবং স্কুল-কলেজের ক্ষয়-ক্ষতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে, বন্যা পরবর্তিতে সঠিক ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে।
মানিকগঞ্জ পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, বন্যা কবলিত এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানমালের নিরাপত্তায় কাজ করছেন। বিশেষ করে চরাঞ্চলে মানুষের গরু-ছাগল চুরি-ডাকাতি যাতে না হয়, সেখানে পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।
মানিকগঞ্জ প্রশাসক রাশিদা ফেরদৌস সাংবাদিকদের জানান, বন্যা দুর্গতদের জন্য ৩৭৫ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৩২ লাখ টাকা বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে। গত রবিবার দুপুর থেকে দুর্গতদের মধ্যে এই ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ শুরু করা হয়েছে।পর্যায়ক্রমে সব দুর্গতদের কাছে এই ত্রাণ সামগ্রী পৌছে দেয়া হবে।

এই সংবাদটি 1,226 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •