সিলেটে অমানবিক আচরণে ক্ষুব্দ হৃদরোগী বয়োবৃদ্ধ রেহেনা খানম : শাস্তি দাবি

প্রকাশিত:শনিবার, ২৫ এপ্রি ২০২০ ০৪:০৪

সিলেটে অমানবিক আচরণে ক্ষুব্দ হৃদরোগী বয়োবৃদ্ধ রেহেনা খানম : শাস্তি দাবি
বিশেষ সংবাদদাতাঃ  বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী মহামারী করোনা ভাইরাসের মূহুর্মুহু আক্রমণে গোটা মানবজাতি তটস্থ।  ইতোমধ্যেই প্রায় ২ লাখের কাছাকাছি মানবসন্তান এই মহামারির কাছে আত্মসমর্পন করে দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিয়েছে।  আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছে ২৮ লাখের উপরে। 
বিজ্ঞানীরা আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এই মরণঘাতি ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিস্কারে।  কিন্তু এখনও সফলকাম হননি।  তারপরও তাঁদের নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।  এমতাবস্থায় গোটা মানবজাতি মহান আল্লাহ’র রহমতের দিকে তাকিয়ে আছে।  আর দুনিয়ার বুকে মানুষ আশ্রয় নিচ্ছে হাসপাতাল, ডাক্তার আর নার্সদের কাছে।
এরমধ্যে যাদের ভাগ্য ভালো, ভাল সেবা পেয়েছেন বা ডাক্তারদের নির্দেশনা মেনে চলেছেন, তারা অনেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। আবার বেশীরভাগ-ই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। দিন দিন মৃত্যুর তালিকা লম্বা হচ্ছে। এই দুঃসময়ে রোগীদের চিকিৎসা ও সেবা দিতে গিয়ে যে সমস্ত ডাক্তার ও নার্স ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তাদের প্রণোদনা দিচ্ছে বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশের সরকার। আমাদের মতো নি¤œমধ্যম আয়ের দেশের সরকারও এ খাতে বিপুল পরিমান অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে, যা দেশবাসীকে আশাবাদী করে তুলেছে।
মানবতাবাদী ও সাহসী সরকার প্রধান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন, যে সমস্ত ডাক্তার-নার্স এই দুঃসময়ে রোগীদের সেবা দেবেন না, তাদের তালিকা করতে এবং তাদেরকে কর্মস্থল ছেড়ে চলে যেতে। আর যারা আত্মত্যাগী মনোভাব নিয়ে রোগীদের সেবায় নিয়োজিত থাকবেন, তাদের পুরস্কার প্রদান করা হবে।  বেশীরভাগ ডাক্তার ও নার্স দেশের সরকারের মানবিক আহবানে সাড়া দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। মৃত্যুর পরোয়া না করেও এই সময়ে দেশের বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক ও নার্স তাদের স্ব-স্ব দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। আবার কিছু কিছু ডাক্তার দায়িত্বরত অবস্থায়ও রোগীদের চিকিৎসা দিতে অনীহা দেখাচ্ছেন, করছেন অমানবিক বা পশুসুলভ আচরণ, যা খুবই মর্মান্তিক।
বাস্তবে তারা কর্মরত অবস্থায় দায়িত্ব পালনের নামে সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধানদের ধোঁকা দিচ্ছেন এবং অন্যদিকে রোগীদের সাথে পৈচাশিক আচরণ করে নিজেদের পেশাকে অপমানিত করছেন। এমনি এক ঘটনার শিকার হয়েছেন সিলেট নগরির দাড়িয়াপাড়ার বাসিন্দা মিসেস রাহেনা খানম। বয়স ৫৫ বছর। বয়োবৃদ্ধ মহিলা হার্টের রোগী। সাথে এ্যাজমা, ফুসফুসে পানি জমাসহ আরো অন্যান্য রোগও আছে। তাঁর হার্ট অপারেশন করে ইতোমধ্যে রিং লাগানো হয়েছে। সিলেটের ডা. খালেদ মহসিনকে প্রথমে দেখিয়েছিলেন। তাঁর পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যাওয়ার কথাও ছিল।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির মুখে আর ঢাকায় যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ডা. কামাল উদ্দিনের পরামর্শে বেশ কিছুদিন নগরির পার্ক ভিউ হাসপাতালেও চিকিৎসাধীন ছিলেন। নগরির শাহী ঈদগাহস্থ সিলেট হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালেও চিকিৎসা নেন। সে সুবাদে তিনি সিলেট হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও পার্ক ভিউ হাসপাতালের পুরোনো ও পরিচিত রোগী। গত ২৪ এপ্রিল শুক্রবার দিবাগত রাত ১টার দিকে হঠাৎ করে হার্টের রোগী রেহেনা খানমের শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হতে থাকে।
মেয়ে ফারজানা খানম বাসায় থাকা রোগ নিরাময়ের যাবতীয় সরঞ্জাম ব্যবহার করে চেষ্টা করেন মায়ের কিছুটা উপশমের জন্য। কিন্তু রাত ৪টার দিকে রেহেনা খানমের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। মায়ের শারীরিক অবস্থার ক্রমশঃ অবনতি লক্ষ্য করে উপায়ান্তর না দেখে ফারজানা সিলেটের বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালে ফোন দিতে থাকেন। কিন্তু, হায় দূর্ভাগ্য। কোন হাসপাতালই ফোন রিসিভ করেনি। শেষপর্যন্ত ফারজানা তাঁর মামা নগরির শাহী ঈদগাহের বাসিন্দা মুন্না আহমদকে একটি ফোরস্ট্রোক অটোরিক্সা নিয়ে আসার জন্য অনুরোধ জানালে মুন্না একটি গাড়ি নিয়ে আসেন। সাথে চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় কাগজপত্র সহকারে রেহেনা খানমকে নিয়ে যাওয়া হলো সিলেট হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে।
এরআগেও সেখানে তাঁর এনজিওগ্রাম করা হয়েছিল। এসবের কাগজপত্রও সাথে ছিল। তাড়াহুড়ার মধ্যে অটোরিক্সায় যাওয়ার পথে রেহেনা খানমের মুখে থাকা মাস্ক বাতাসে উড়ে যায়। এই অপরাধে কর্তব্যরত চিকিৎসক ফারজানাকে গালমন্দ করেন এবং রেহেনা খানমকে নির্দিষ্ট বেডে নিতে অস্বীকৃতি জানান। শেষপর্যন্ত মাস্ক-এর ব্যবস্থা করা হলেও ডাক্তার সহযোগিতা করতে নারাজ। অনেক অনুনয়-বিনয়ের পর হৃদরোগ বিভাগের ডাক্তারের নির্দেশে রেহেনা খানমের ইসিজি করা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রেও দায়িত্বরত নার্স ‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি’-র মতো নিতান্ত তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে ইসিজি করেন।
রেহেনা খানমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের ডাক্তাররা চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং রোগীকে অন্য কোন প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। অনেক অনুরোধ ও অনুনয়-বিনয় করা হলেও ডাক্তাররা তা কানে তুলতে নারাজ। কি আর করা। অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর মাকে নিয়ে ফিরে আসেন ফারজানা। উপায়ান্তর না দেখে ফারজানা ও মুন্না আহমেদ বেদনাক্লিষ্ট রেহেনা খানমকে নিয়ে গেলেন নগরির তালতলাস্থ পার্ক ভিউ হাসপাতালে।
ওখানে এরআগেও ওনাকে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছিল এবং তিনি বেশ কয়েকদিন চিকিৎসা নিয়েছিলেন। পুর্ব পরিচিতের সুবাদে হয়তো একটু সহানুভ‚তি পাওয়া যাবে, এই আশায় পার্ক ভিউ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু হায় রে কপাল! দূর্ভাগা আর কাকে বলে! ডা. মাসুদ নামে জনৈক ডাক্তার ছিলেন ডিউটি রুমে এবং ডিউটিরত অবস্থায়-ই তিনি বেদম ঘুমে। অনেক ডাকাডাকি করে ১ ঘন্টা পরে ঘুম থেকে উঠে আসেন। তিনি রেহেনা খানম এবং তাঁর সঙ্গের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে এমন দূর্ব্যবহার করেন, যা ছিল পশুদের সাথে আচরণের ত‚ল্য। ডা. মাসুদ নাইট গার্ডকে সিসিইউ ওয়ার্ডের ডাঃ বিশ্বজিৎকে ডেকে দেবার কথা বলে টাস করে মুখের উপর দরোজা লাগিয়ে পুনরায় ঘুমিয়ে পড়েন। 
ডা. বিশ্বজিৎ ফারজানাদের কথা শুনে কোন সহযোগিতা করতে পারবেন না বলে জানান। কারণ পার্ক ভিউ হাসপাতালের সিসিইউ বিভাগের হেড ডা. শাহীন নাকি কোন রোগী ভর্তি করতে নিষেধ করে দিয়েছেন। সে কারণে কোন সহযোগিতা করা সম্ভব নয়। রেহেনা খানমের মেয়ে ফারজানাসহ বোন ও ভাইয়েরা অনেক সুপারিশ, অনুনয়-বিনয় করেন। কিন্তু পার্ক ভিউ হাসপাতালের ডাক্তাররা কোন প্রাথমিক সেবা দিতেও অপারগতা প্রকাশ করেন।
অবশেষে আত্মীয়রা অন্ততঃ রোগীকে একটু অক্সিজেন বা নেবুলাইজার দেবারও আক‚তি জানান। কিন্তু কর্তব্যরত ডাক্তাররা রোগী রেহেনা খানম ও তাঁর আত্মীয়দেরকে শেয়াল-কুকুরের মতো দূর-দূর করে তাড়িয়ে দেন। যা অত্যন্ত ঘৃণ্য ও ন্যাক্কারজনক। ডা. শাহীন, ডা. বিশ্বজিৎ, ডা. মাসুদদের মতো অমানবিক ডাক্তারদের ন্যাক্কারজনক আচরণে অতীষ্ট হয়ে রেহেনা খানম এবং তাঁর আত্মীয়-স্বজনরা ডাক্তারি পেশার প্রতি বিক্ষুব্দ হয়ে উঠেছেন। ঘৃণার সাথে ডাক্তাদের নাম নিচ্ছেন। এই ডা. শাহীন, ডা. বিশ্বজিৎ, ডা. মাসুদদের মতো অমানবিক ডাক্তারদের কারণে আজ গোটা চিকিৎসক বিতর্কিত। কিন্তু না! এখানেই শেষ নয়? এইসব অমানবিকদের জগতে ডা. কামাল উদ্দিনের মতো ‘রতœও’ আছেন। যাকে ভোর প্রায় সাড়ে ৫ টার দিকে ফোন করা হয়। রেহেনা খানম ডা. কামালের পুরোনো রোগী। নাম শুনেই তিনি আশ্বস্ত করলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যে এসে রোগীর প্রতিষেধকের ব্যবস্থা করছেন বলে জানালে ফারজানাদের মনে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়। 
ভোর সাড়ে ৬টার মধ্যেই ডা. কামাল নিজের গাড়িতে করে রেহেনা খানমের দাড়িয়াপাড়ার বাসায় গিয়ে উপস্থিত হন। ফোনেই রোগীর মোটামুটি বৃত্তান্ত জেনে নিয়েছিলেন চিকিৎসক। তাই সাথে করেই চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে এসেছিলেন। রেহেনা খানমের বাসায় নেবুলাইজার ছিল। ডা. কামাল এসে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দিতে কিছুক্ষণের মধ্যে রেহেনা খানমের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হতে থাকে।
আল্লাহর রহমতে শনিবার বিকেলের দিকে তিনি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেন। বয়োবৃদ্ধ রেহেনা খানমের কন্যা ফারজানা খানম সিলেট হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও পার্ক ভিউ হাসপাতালে ওইদিনে কর্মরত ডাক্তারদের অমানবিক, পৈচাশিক ও নিষ্ঠুর আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এরা ডাক্তার নামের কলঙ্ক। কারণ ডাক্তারি পেশাটাই যেখানে সেবামুলক, সেখানে এরা রোগীদের সাথে এমন আচরণ করেন যেন দেখে মনে হয়, ওরা মনে হয় কোন পশুর ডাক্তার। তাই পশুর মতো আচরণ করছেন। ফারজানা খানম রোগীদের সাথে অসদাচরণে লিপ্ত সংশ্লিষ্ট ডাক্তারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সিলেট হার্ট ফাউন্ডেশন ও পার্ক ভিউ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতি উদাত্ত আহবান জানিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি চিকিৎসক জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র, ভয়-ভীতিহীন ব্যক্তিত্ব, মানবজাতির প্রকৃত সেবক ডা. কামাল উদ্দিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং বলেন, ডা. কামালের সাহসিকতা ও আন্তরিকতায় আমার জন্মদাত্রী মা আজ সুস্থ। তিনি ডা. কামালের সুস্থ্যতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন।

 

এই সংবাদটি 1,249 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ