• ১৯ জানুয়ারি, ২০২২ , ৫ মাঘ, ১৪২৮ , ১৫ জমাদিউস সানি, ১৪৪৩

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ইমরানের সাফল্য

newsup
প্রকাশিত নভেম্বর ২৯, ২০২১
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ইমরানের সাফল্য

নিউজ ডেস্কঃ 

দেশের টাকা বিদেশে পাচার, চিকিৎসা খাতে প্রতারণা, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস—প্রায়ই এসব অপরাধের খবর উঠে আসে গণমাধ্যমের পাতায়। এসব ঘটনা অনুসন্ধান করে মানুষের সামনে যারা তুলে ধরেন, তাদেরই একজন আব্দুল্লাহ আল ইমরান। শুধু সাংবাদিক নন, লেখক, সংগঠক ও বিতার্কিক হিসেবেও পরিচিত এই তরুণ।

সেন্ট জোসেফ স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং খুলনা পাবলিক কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে আবদুল্লাহ আল ইমরান ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। শৈশব, কৈশোরের থেকেই লেখালেখির প্রতি ভালোবাসা ছিল তার। মফস্বলে বড় হওয়া এই তরুণ রাজধানী এলেও ছোটবেলার গেরুয়া অনুভূতি মুছে যায়নি। আর তাই তাঁর লেখালেখিজুড়ে থাকে প্রান্তিক এলাকার মানুষের সংগ্রাম, উপলব্ধির গল্প। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। ২১তম জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতার সংসদীয় বিতর্কে চূড়ান্ত পর্বে জিতে নেন শ্রেষ্ঠ বক্তার পুরষ্কার। এছাড়া নানা স্বেচ্ছাসেবী ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে জড়িত থাকার সুবাদে ঝুলিতে আরও অনেক পুরষ্কার জমা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকেই বেছে নেন ইমরান। প্রথমে দৈনিক পত্রিকায় কাজ করলেও পরবর্তীতে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেন। ২০১৭ সালে ঢাবি ঘ ইউনিটে ভর্তি পরিক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে ধারাবাহিক রিপোর্ট করেন। সে অনুসন্ধানের মাত্র চারমাসের মধ্যে তিনি সাফল্য পান।

ইতোমধ্যেই লেখক ইমরানের বেশ কয়েকটি বই প্রকাশ হয়েছে। উড়ে যায় নীল টিপ, কালচক্র, দিবানিশি, হৃদয়ের দখিন দুয়ার, এইসব ভালোবাসা মিছে নয়, চন্দ্রলেখা তাঁর বইগুলোর মধ্যে অন্যতম। বই বিক্রির ওয়েবসাইট রকমারি ডটকমের বেস্ট সেলারের তালিকায় এসেছিল কয়েকটি বই।

সাংবাদিকতা ও লেখালেখির পাশাপাশি নারীদের সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি ও হয়রানি বন্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরে। বিভিন্ন সেমিনার, ওয়ার্কশপে সেসব বিষয়ে আলোচনা করছেন ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনার অন্তরালে বুয়েটের এক শিক্ষক জড়িত থাকার ঘটনা উঠে আসে ইমরানের এক প্রতিবেদনে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। মূলত সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা উদঘাটন করছে অপরাধ জগতের বিস্তৃত সব ঘটনা। আইনের আওতায় এসেছে অপরাধীরা।

প্রশ্নফাঁসের এসব রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সেসময় প্রায় অর্ধশতাধিক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবৈধ শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার করে। ভর্তির সুযোগ পান যোগ্য শিক্ষার্থীরা। ইমরান সেবার সিআইডির ‌‌’আউটস্টান্ডিং জার্নালিজম’ সম্মাননা পান। এ ছাড়া রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদ করিমের প্রতারণার খবর নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন, নাটোর-২ আসনের এমপি শিমুলের বিদেশে টাকা পাচার নিয়ে অনুসন্ধান, মেডিকেল কলেজে ভর্তির প্রশ্নফাঁসসহ সর্বশেষ সমন্বিত পাঁচ ব্যাংকে চাকরির পরিক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়েও করেছেন প্রতিবেদন।

সাংবাদিক ইমরানের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রশংসা করছেন পুলিশ কর্মকর্তারাও। যেমন সম্প্রতি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক মোল্যা নজরুল ইসলাম প্রশ্নফাঁস চক্র আটকের অভিজ্ঞতা লিখেছেন নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে। সেখানে তিনি বলেন, ‘ইমরান আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই। ভীষণ উদ্যমী এবং পরিশ্রমী ছেলে। লেখক হিসেবেও তার নাম-ডাক আছে। আছে দেশ, সমাজ ও নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কমিটমেন্ট। সেই কমিটমেন্টের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি জালিয়াতির গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইন্টেল নিয়ে হাজির হয় আমার কাছে। আমিও আগ্রহী হয়ে উঠি। সবাইকে আরও এগোতে বলি। ২০১৭ সালের অক্টোবরে ইমরান অনুসন্ধানটি আরও ম্যাচিউর করে নিয়ে আসে। ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী পাঠিয়ে চক্রের তথ্য-প্রমাণ যোগাড় করে। একদিন পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা। সে রাতেই অপারেশন করতে হবে, তাও আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি হলে।’

পুলিশ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম আরও উল্লেখ করেন, ‘আমার বেশ আগ্রহ থাকলেও টিমের অন্য সদস্যরা কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়ে। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং প্রক্টোরিয়াল টিমের অনুমতি ও সহযোগিতা ছাড়া অপারেশন করা ঠিক হবে না। আমি আমাদের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি নিয়ে ইমরানকে জানালে ঘন্টা দুয়েকের মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তপক্ষের অনুমতি যোগাড় করে পুরো প্রক্টোরিয়াল টিম নিয়ে সে আমার অফিসে হাজির হয়, এবং ভিসি স্যারের সাথে আলাপ করিয়ে দেয়। ওর এমন নাছোড়বান্দা মানসিকতায় মুগ্ধ হয়ে বৃহৎ এক অপারেশনাল টিম সাজাই। তারপর বেরিয়ে আসে ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের প্রশ্নফাঁসের চাঞ্চল্যকর সব খবর। ৪৭ জনকে প্রেপ্তার করি আমরা, ৮৭ জনকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবন বহিস্কার করে কর্তৃপক্ষ।’

এসব অপরাধের ডাল-পালা মেলে ধরতে ইমরানকে কম ঝুঁকি নিতে হয়নি। নানা চাপে পড়তে হলেও কখনো তা দমাতে পারেনি তাকে। ইমরান অনুসন্ধান চালিয়ে গেছেন। অপরাধের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ আলো জাগিয়েছে অনেক মানুষের মাঝে। তবে ইমরান মনে করেন, সবে তো শুরু, এখনো বহুদূর যাওয়া বাকি। আজীবন সাংবাদিকতা আর লেখালেখি করেই কাটিয়ে দেয়ার স্বপ্ন দেখেন এই তরুণ।

এই সংবাদটি 1,227 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •