অবিলম্বে এই নির্বাচন বাতিল করুন: মির্জা ফখরুল

প্রকাশিত:সোমবার, ৩১ ডিসে ২০১৮ ০৮:১২

অবিলম্বে এই নির্বাচন বাতিল করুন: মির্জা ফখরুল

একাদশ নির্বাচনে ভোট ডাকাতি হয়েছে অভিযোগ করে ঘোষিত ফলাফল বাতিল ও অবিলম্বে পূন:নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে বিএনপি।রাতে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই দাবি জানান।

তিনি বলেন, ‘‘ পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে একেবারে বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে আমাদের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে নজিরবিহীনভাবে একটা যুদ্ধাবস্থা তৈরি করে ত্রাস-ভীত সৃষ্টি করে এই নির্বাচনটি করা হয়েছে।”‘‘ আমরা এই নির্বাচন যেটা নজিরবিহীন সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং ভোট ডাকাতি বলা যেতে পারে, এই ভোট ডাকাতির ফলে আমরা এই নির্বাচনের ফলাফলকে পুরোপুরি প্রত্যাখান করেছি। আমরা মনে করি, এই কলঙ্কজনক নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় অনুষ্ঠিত করতে হবে এবং এটা অনতিবিলম্বে করতে হবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে।”

প্রধান নির্বাচন কমিশনার পূনঃনির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয় বলেছেন সেক্ষেত্রে আপনারা এগুবেন কিভাবে প্রশ্ন করা হলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘‘ বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার সবচাইতে পক্ষপাত দুষ্ট একজন ব্যক্তি এবং আপনারা জানেন যে, প্রথম থেকে তার বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে আসছিলাম। তিনি একজন দলীয় ব্যক্তি, তার সমস্ত কার্য্কলাপ ইতিমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে।”

‘‘ উনি যেভাবে কথা বলেন তাতে সম্পূর্ণভাবে সরকার যে কথা বলতে চায় তার প্রতিধ্বনি করেন। সে সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন।”
তবে কিভাবে বিএনপি এগুবে তার ‘সময়মত’ জানাবেন বলে জানান তিনি।‘‘ আমরা সমস্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সিদ্ধান্ত নেব। এজন্য জোটের সাথে আলাপ করে ভবিষ্যত কর্মপন্থা ঠিক করবো।”

নির্বাচিতরা কী করবে?
যারা নির্বাচিত হয়েছে শপথ নেবেন কিনা প্রশ্ন করা হলে ফখরুল বলেন, ‘‘ আমরা ফলাফল প্রত্যাখান করেছি।”একই সঙ্গে এই দাবি আদায়ে ‘আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি আন্দোলন’ও করবে বলে জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, ‘‘ অবশ্যই আমাদের কর্মসূচি থাকবে।”

‘এই নির্বাচনে এটা প্রমাণ হয়ে গেছে যে দলীয় সরকারের অধীনে কখনো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল বলেন, ‘‘ এবার এই সরকার নির্বাচন কমিশনের সাথে যোগসাজস করে এমন একটা নির্বাচন করলো এটা জাতির রাজনৈতিক ইতিহাস ও নির্বাচনের ইতিহাসে সবচাইতে কলঙ্কময় ঘটনা বলে আমি মনে করি।”‘‘ নতুন ভোটাররা এবার সবচাইতে বেশি ডিপরাইভড হয়েছেন। তাদের যে অধিকার সেই অধিকার তারা প্রয়োগ করতে পারেননি।রাজধানীসহ প্রত্যেকটি কেন্দ্রতে ভোটার শূণ্য ছিলো।”

‘২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন সঠিক ছিলো’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘‘ এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে না যাওয়ার যে সিদ্ধান্ত ছিলো সেই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিলো। অর্থাত আমরা যেটা বলে আসছি যে দলীয় সরকারের অধীনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক যে সংস্কৃতি আছে সেই সংস্কৃতিতে এখানে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন করা সম্ভব নয়।”

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য সঠিক নয়
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্যের জবাবে বলেন, ‘‘ উনি (সিইসি) বলেছেন, এজেন্ট না আসলে আমি কি করব? আরে এজেন্ট না আসতে দিলে আমরা(বিএনপি) কী করবো। এজেন্টকে তো আপনারা আসতে দেননি।’

‘‘ এই সরকার তার রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ও নির্বাচন কমিশনের যোগসাজসে আমাদের এজেন্টদেরকে কেন্দ্রে যেতেই দেননি। যেখানে যেখানে গেছেন সেখানে যেমন আমার নির্বাচনী এলাকায় একশ ভাগ এজেন্ট ছিলো কিন্তু তাদেরকে বের করে দেয়া হয়েছে। আমাদের দলের নেতা গয়েশ্বর বাবুর (ঢাকা-৩) ওখানে একশ ভাগ এজেন্ট ছিলো, তাদেরকে বের করে দেয়া হয়েছে। আমাদের নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাহেবের নির্বাচনী এলাকায় এজেন্ট ছিলো তাদেরকে বের করে দেয়া হয়েছে। এভাবে তারা স্টাফিং করা হয়েছে। এজেন্টদের বিরুদ্ধে আগে থেকে মামলা দিয়ে রেখেছে, অনেকে গ্রেপ্তার করেছে এবং নির্বাচন এজেন্টদের মনোনীত করবার যে কাগজটা প্রার্থী দেবে সেই কাগটাকে ওরা ছিঁড়ে ফেলেছে বহু জায়গায়।”

তিনি বলেন, ‘‘ এই নির্বাচন আগে থেকে পূর্ব পরিকল্পনায় হয়েছে। আর ইঞ্জিনিয়ারিংটা করা হয়েছে ভোটের আগের রাতে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে।”
‘‘ এই কারণে জনগন যে ১০ বছর ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে পারছিলো না সেটা থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা হলো।”

ভোট পরবর্তি সহিংসতার অভিযোগ
ভোটের পর বিভিণ্ন স্থানে ক্ষমতাসীনরা সহিংসতা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।তিনি বলেন, ‘‘ নির্বাচনের আগে সহিংসতা হয়েছে, নির্বাচনের দিন হয়েছে। এখন ভোটের পরে পরেই শুরু হয়েছে সহিংসতা। বিএনপি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় প্রার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আক্রমন চালানো হচ্ছে, নেতা-কর্মীদের বাড়িতে আক্রমন চালানো হচ্ছে, তাদের সমর্থকদের আক্রমন চালানো হচ্ছে এবং বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে।”

‘‘ যেমন আমার নিজের নির্বাচনী এলাকায় আজকে বেগুন বাড়ি ইউনিয়নের দানারহাট কেন্দ্রে আমার নেতা-কর্মী-সমর্থকদের বাড়ি পুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, ভেঙে ফেলা হচ্ছে। নির্বাচনের দিন ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ কেন্দ্রে আমার প্রধান এজেন্টের বাড়িতে আক্রমন করে ভেঙে ফেলা হয়েছে। আমার স্ত্রীকে ঘটনাস্থলে যেতে দেয়া হয়নি। আমি নিজে গিয়ে ওই কেন্দ্র দেখেছি ৪/৫ টা বুথ কোনো এজেন্ট নেই। ভয়ভীতি তৈরি করা হয়েছে যাতে কেউ না আসে।”

‘নির্বাচনে কেনো গেলাম ?’
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘‘ অনেকে প্রশ্ন করেছেন এতো গ্রেপ্তার-হামলার পর নির্বাচনে আমরা কেনো গেলাম। তখনও বলেছি, এখানো স্পষ্ট করে বলছি- আমরা গণতন্ত্র বিশ্বাসী একটি রাজনৈতিক দল। আমরা নির্বাচন করতে চাই, নির্বাচন করে সরকার পরিবর্তনে বিশ্বাসী। সেই কারণে আমরা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা নির্বাচনে গিয়েছি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য, মানুষের ভোটাধিকা প্রতিষ্ঠা করার জন্য।”

‘‘ নির্বাচন কমিশনকে বার বার বলে এসেছি আপনি একটা পরিবেশ তৈরি করুন, লেভেল প্ল্যায়িং ফিল্ড তৈরি করুন। আপনারা জানেন যে, শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তাদের কাছে গিয়েছি নির্বাচনের একটা পরিবেশ তৈরি করতে। কিন্তু তারা সেটা করতে পারেনি।”নির্বাচন উপলক্ষে তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্য়ন্ত ২১ হাজারে বেশি নেতা-কর্মীকে বিভিণ্ন মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে অভিযোগ করে অবিলম্বে তাদের মুক্তির দাবিও জানান বিএনপি মহাসচিব।

গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর মহাসচিব সংবাদ সম্মেলনে আসেন।সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, মাহবুবুর রহমান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বিকাল ৪টা থেকে দেড় ঘন্টা বৈঠক করেন। এই বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলন হয়। এরপর ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে হয় এতে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্য নজরুল ইসলাম খান। বৈঠকে এলপডিপির অলি আহমেদ ছাড়া জামায়াতসহ বিভিণ্ন শরিক দলের নেতারা ছিলেন।

এই সংবাদটি 1,245 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ