• ১৯ জানুয়ারি, ২০২২ , ৫ মাঘ, ১৪২৮ , ১৫ জমাদিউস সানি, ১৪৪৩

অসহযোগিতার জালে বন্দি

newsup
প্রকাশিত নভেম্বর ৩০, ২০২১
অসহযোগিতার জালে বন্দি

নিউজ ডেস্কঃ 

টাকা পাচার রোধ ও বিদেশ থেকে অর্থ ফিরিয়ে আনতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। কোন সংস্থার দায়িত্ব কি তা সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হলেও কাজের তেমন অগ্রগতি নেই। একে অপরকে সহযোগিতা করছে না। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবেও সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।

ফলে পাচার করা টাকা দেশে ফিরিয়ে আনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। টাকা পাচার ঠেকানোও যাচ্ছে না, তেমনি গ্রহণ করা যাচ্ছে না পাচারকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা। সবকিছুই আটকে আছে অসহযোগিতার বেড়াজালে। টাকা পাচার বিষয়ক কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্সের বিভিন্ন সভার কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, টাকা পাচার রোধে কেন্দ্রীয় সংস্থা হিসাবে কাজ করে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ)। তাদের সঙ্গে আছে সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এছাড়া পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিসহ কয়েকটি সংস্থা কাজ করে। কিন্তু সংস্থাগুলোর মধ্যে কাজের ক্ষেত্রে সমন্বয়ের বড়ই অভাব।

গত জুলাইয়ে মানি লন্ডারিং কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্সের একটি বৈঠক হয়। এর কার্যপত্রে দেখা যায়, মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত বড় অপরাধ তদন্তে বিএফআইইউকে একাধিক সংস্থা নিয়ে তদন্ত দল গঠনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শেই এটা দেওয়া হয়। কিন্তু এ দলের মধ্যে বর্তমানে সমন্বয়হীনতা প্রকট। ফলে তদন্ত কাজ দ্রুত এগোচ্ছে না।

বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা এতে সময় দিতে পারছেন না। এজন্য এসব অপরাধ তদন্তে গতি আনার জন্য বিএফআইইউকে তদারকির দায়িত্ব দিয়ে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথমে এতে কোনো সংস্থা আপত্তি না করলেও পরে সিআইডি, দুদক আপত্তি করে। ফলে যৌথ তদন্ত দলের তদারকি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে বড় ধরনের মানি লন্ডারিং বিষয়ক অপরাধগুলোর তদন্ত কার্যক্রম এগোচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, পাচার করা টাকা দেশে ফেরাতে বা টাকা পাচার রোধে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছ। এটি ছাড়া কোনো কাজই হবে না। এ নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে। তাদের মধ্যে সমন্বয়ের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে তা সহজেই দূর করা সম্ভব।

সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিকভাবে উন্নত দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাব উন্মুক্ত। ফলে যে কেউ নিজেদের চাহিদামতো অর্থ যে কোনো দেশে নিতে পারে। এক্ষেত্রে দেখা হয় গ্রাহক অর্থের বিপরীতে কর পরিশোধ করেছেন কিনা বা এর সঙ্গে কোনো ফৌজদারি অপরাধ আছে কিনা। এসব অপরাধ না থাকলে অর্থ স্থানান্তর বৈধ।

কিন্তু বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাব এখনো উন্মুক্ত করা হয়নি। ফলে কেউ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া নীতিমালার বাইরে কোনো অর্থ বিদেশে নিতে পারেন না। এর বাইরে অর্থ নিলেই তা পাচার বলে পণ্য হয়। ফলে দেশ থেকে যারা টাকা পাচার করেন তাদের ব্যাপারে বিদেশ থেকে তথ্য আনতে হলে আগে প্রমাণ করতে হয় ওই টাকার বিপরীতে কোনো কর ফাঁকির ঘটনা আছে বা নেই।

অথবা এর পেছনে কোনো ফৌজদারি অপরাধ হয়েছে কিনা। এসব বিষয়ে আদালতের রায় থাকলে তা দিয়ে বিদেশের কাছে সুনির্দিষ্টভাবে তথ্য চাইতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ এমন প্রমাণসহ সুনির্দিষ্টভাবে তথ্য চেয়েছে এমন নজির খুবই কম।

কেননা টাকা পাচারের বড় বড় ঘটনাগুলোর তদন্ত কাজই সম্পন্ন করতে পারছে না। ফলে আদালতে এগুলোর মামলা হলেও দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে না। তদন্ত না হওয়ায় অনেক ঘটনার মামলাও হচ্ছে না।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে বড় অঙ্কের টাকা পাচার হয় সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে। ২০২০ সালে এ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ফ্র্যাংক বা স্থানীয় মুদ্রায় যা ৫ হাজার ২৯১ কোটি টাকা। এসব অর্থের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহের জন্য বিএফআইইউ থেকে সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি দেওয়া হলেও তারা কোনো সাড়া দেয়নি।

এক্ষেত্রে নিয়ম হচ্ছে সুনর্দিষ্টিভাবে তথ্য চাইতে হয়। কিন্তু বিএফআইইউ সুনির্দিষ্টভাবে তথ্য চায়নি। বিএফআইইউ থেকে মুসা বিন শমশেরের নামে তথ্য চাওয়া হলে সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে ওই নামে কোনো হিসাব তাদের দেশের ব্যাংকগুলোতে নেই।

টাকা পাচারের তথ্য আনতে হলে বিভিন্ন দেশের সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। সুজারল্যান্ডসহ ইউরোপের অনেক দেশ থেকে টাকা পাচারের তথ্য আনতে হলে বাংলাদেশের কর অফিস থেকে সে দেশের কর অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।

কিন্তু বাংলাদেশের কর অফিস থেকে এ ধরনের কোনো যোগাযোগের নজির খুবই কম। এক্ষেত্রে কর ফাঁকির ঘটনা আদালতের রায়সহ যোগাযোগ করতে হবে। সেটি করা হচ্ছে না।

যুক্তরাজ্য থেকে তথ্য আনতে হলে এ দেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকে তাদের অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এ ধরনের যোগাযোগের ফলে ২০০৮ সালে বেশকিছু তথ্য বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে আর এ ধরনের যোগাযোগ হয়নি।

এছাড়া প্রতিটি দেশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট জাতীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ওইসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও তথ্য আনার সুযোগ আছে। এসব ক্ষেত্রে বিএফআইইউ দ্বিপক্ষীয় বা এগমন্ট গ্রুপের (বিভিন্ন দেশের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠান) মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

সেগুলো দিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরি করে এনবিআর, দুদক বা সিআইডিতে পাঠাচ্ছে। এর আলোকে সংশ্লিষ্ট সংস্থা তদন্ত করছে। কিন্তু তদন্ত শেষে মামলা দায়েরের ঘটনা খুবই কম।

এ প্রসঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈন উদ্দীন আব্দুল্লাহ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘এ মুহূর্তে আপনাকে বলার মতো নতুন কোনো তথ্য নেই।’

বিএফআইইউর এক সাবেক কর্মকর্তা সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া অনেক লম্বা। বহু হাতের কাজ। সে কারণে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

এছাড়া বিভিন্ন দেশে যারা টাকা পাচার করেন তারা ওইসব দেশে আমানতকারীর মর্যাদা পান। প্রতিটি দেশই তাদের আমানতকারীদের সুরক্ষা দেয়। এ কারণে অনেক দেশ কোনো গ্রাহকের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকলে তথ্য দিতে চায় না। এসব কারণেও বিদেশ থেকে পাচার করা টাকার তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এছাড়া যেসব ক্ষেত্রে টাকা পাচারের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো দেশের আদালতে মামলা করে রায় নিয়ে ফেরত আনার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে না। ফলে পাচার করা টাকা ফেরানো সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে দেশ থেকে টাকা পাচার রোধের সঙ্গে একাধিক সংস্থা জড়িত। এদের মধ্যেও সমন্বয় নেই। বর্তমানে টাকা পাচারের একটি বড় অংশ ব্যাংকিং চ্যানেলে যাচ্ছে। বিশেষ করে আমদানির নামে দেনা শোধ করা হচ্ছে কিন্তু পণ্য দেশে আসছে না।

এ ব্যাপারে কাস্টমস যথাযথ ভূমিকা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কাস্টমসের তদন্তেও কনটেইনারের নির্ধারিত পণ্যের বদলে ইট-বালি-সিমেন্টের ধুলা পাওয়ার নজিরও আছে।

এদিকে দেশ থেকে টাকা পাচার বেড়েই চলছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে এক হাজার ১৫১ কোটি ডলার। দেশীয় মুদ্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা। ২০২০ সালের ৩ মার্চ প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে।

দুই প্রক্রিয়ায় এই অর্থ পাচার হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং) এবং রপ্তানিতে মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং)।

জিএফআই’র তথ্যমতে, গত সাত বছরে বাংলাদেশ থেকে ৫২৭০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় যা সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা। প্রতি বছর গড়ে পাচার হয়েছে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা।

গত বছর জিএফআইর প্রতিবেদন প্রকাশের পর বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তৎকালীন প্রধান (বর্তমানে সাবেক) আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, সাধারণত আমদানি-রপ্তানির আড়ালে অর্থ পাচার হয়ে থাকে।

এ ব্যাপারে আমরাও কয়েকটি ঘটনা চিহ্নিত করেছিলাম। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দেওয়া হয়েছিল। তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছিল। তবে সারাবিশ্বে বাণিজ্যের মাধ্যমেই অর্থ পাচার হচ্ছে।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক তদন্তে দেখা যায়, শিল্পের যন্ত্রপাতি ভর্তি কনটেইনারে পাওয়া গেছে ছাই, ইট, বালি, পাথর ও সিমেন্টের বক্স। এতে শিল্পের কোনো যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়নি। এছাড়া চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে শুল্ক গোয়েন্দাদের তদন্তে খালি কনটেইনার আমদানির ঘটনাও ধরা পড়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ভুয়া রপ্তানি এলসি (ঋণপত্র) এবং ক্রয়চুক্তির মাধ্যমে টাকা পাচার হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে এ ধরনের বেশকিছু ঘটনা ধরা পড়েছে।

গত তিন বছরে মালয়েশিয়া সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, বিদেশির জন্য মালয়েশিয়ান সরকারের সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ। দেশ থেকে মালয়েশিয়াতে অর্থ নেওয়ার কোনো অনুমোদন কাউকে দেওয়া হয়নি। তার মানে হচ্ছে ওইসব টাকার বড় অংশই পাচার হয়ে গেছে। আর কিছু অংশ ওই দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা বিনিয়োগ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল হোসেন জানান, নিশ্চিত ওইসব টাকা পাচার করা হয়েছে। যেহেতু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো অনুমোদন নেই মালয়েশিয়ায় টাকা নেওয়ার। তারপরও টাকা গেছে। বুঝতে অসুবিধা নেই যে, এই টাকা পাচার হয়েছে।

কানাডায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস করেন- এমন একটি এলাকার নাম হয়েছে বেগমপাড়া। বিশেষ দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক নেতারা ওখানে টাকা পাচার করে সম্পদ গড়ে তুলেছেন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হংকংয়ে অনেক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর অফিস রয়েছে। সেখানে তারা পুঁজি পাচার করে নিয়মিত ব্যবসা করছেন।

এছাড়া বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের তথ্য এসেছে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি ইউএনডিপির রিপোর্টও এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন আইসিআইজে প্রকাশিত পানামা ও প্যারাডাইস পেপার্সেও।

এই সংবাদটি 1,228 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •