‘ইয়াস’ এর প্রভাব থেকে বাংলাদেশ মুক্ত তবে ২৭ উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত

প্রকাশিত:বুধবার, ২৬ মে ২০২১ ০৮:০৫

‘ইয়াস’ এর প্রভাব থেকে বাংলাদেশ মুক্ত তবে ২৭ উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত

নিউজ ডেস্কঃ

উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ আরও উত্তর-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে আজ (২৬ মে) বেলা ৩টা নাগাদ ডামরার উত্তর এবং বালাশোরের দক্ষিণ দিক দিয়ে ভারতের উত্তর উড়িষ্যা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূল অতিক্রম সম্পন্ন করেছে। এটি আরও উত্তর-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর ও দুর্বল হয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড় আকারে উপকূলীয় উত্তর উড়িষ্যা ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় বায়ুচাপ পার্থক্যের আধিক্য বিরাজ করছে।

বুধবার (২৬ মে) বিকেলে ইয়াস সম্পর্কিত ১৯ নম্বর বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। তারা আরও জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় ইয়াস সম্পর্কে এই সিরিজের আর কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে না।

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

বায়ুচাপ পার্থক্যের আধিক্যের প্রভাবে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, ভোলা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর ও চট্টগ্রাম জেলা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিসহ ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।

বায়ুচাপ পার্থক্যের আধিক্য ও পূর্ণিমার প্রভাবে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, ভোলা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর ও চট্টগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৩ থেকে ৬ ফুট অধিক উচ্চতার জোয়ারে প্লাবিত হতে পারে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা: মোঃ এনামুর রহমান বলেছেন, ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ ভারতের উপকূল অতিক্রম শুরু করার প্রভাব থেকে বাংলাদেশ এখন সম্পূর্ণ মুক্ত । তবে ‘ইয়াস’ এর প্রভাবে অতি জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় ৯ জেলার ২৭ উপজেলার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী আজ বুধবার ( ২৬ মে) সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সার্বিক ঘূর্ণিঝড় পরিস্থিতি বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ।

 

 

এদিকে ইয়াশের প্রভাবে জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাসে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার ২৭টি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ।

ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে- শ্যামনগর, আশাশুনি, কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা, শরণখোলা, মোংলা, মোড়েলগঞ্জ, মঠবাড়ীয়া, বরগুনা সদর, পাথরঘাটা, আমতলী, পটুয়াখালী সদর, গলাচিপা, রাঙ্গাবালী, দশমিনা, মির্জাগঞ্জ, কলাপাড়া, চরফ্যাশন, মনপুরা, তজুমদ্দিন, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, ভোলা সদর, হাতিয়া, রামগতি ও কমলনগর।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, যে কোন দুর্যোগ মোকাবিলায় মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য জেলা প্রশাসকদের অনকূলে পর্যাপ্ত খাদ্য সামগ্রী ও অর্থ বরাদ্দ দেয়া আছে। এছাড়াও আজ ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ এর প্রভাবে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলীয় ৯টি জেলার ২৭টি উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্তদের মানবিক সহায়তা দিতে ১৬ হজার ৫০০ শুকনা ও অন্যান্য খাবারের প্যাকেট সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

 

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘উপকূলীয় জেলা, উপজেলাসমূহে ঘূর্ণিঝড়ের তথ্য আদান-প্রদানে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে । দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এনডিআরসিসি (জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় কেন্দ্র) ঘূর্ণিঝড়ের তথ্য সংগ্রহ ও আদান-প্রদানে সার্বক্ষণিক কাজ করেছে ।’

এনামুর রহমান বলেন, ‘উপকুলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) ৭৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবক ছাড়াও স্কাউট, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, আনসার ভিডিপির স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করছে। ঝড় আঘাত হানলে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনার জন্য আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত ছিল । মানবিক সহায়তার যথেষ্ট সংস্থান আগে থেকেই করা ছিল। এ ছাড়া স্বাস্থ্যবিধি মেনে আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবস্থাপনার জন্য যথেষ্ট মাস্ক এবং স্বাস্থ্য উপকরণ নিশ্চিত করা হয়েছিল।’

 

 

পটুয়াখালী:

জোয়ারের পানি বেড়েছে তবে বিপদসীমার নিচে আছে। গতকাল সন্ধ্যায় ১৭২টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১৪ হাজার লোক আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। আজ সকালে তারা ফিরে গেছে। এসব লোকজন জোয়ারের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে আসে এবং ভাটার সময় নিজ নিজ বাড়ীতে চলে যায়। সামান্য ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে।

 

সাতক্ষীরা:

বর্তমানে আবহাওয়া স্বাভাবিক। জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৬ ফুট বেশি রয়েছে। কোন কোন জায়গায় বেড়ি বাঁধ উপচিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করছে। জেলায় এক হাজার ২৯২টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। গত রাতে শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ২৮০ জন লোক আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। বর্তমানে তারা নিজ নিজ বাড়ীতে চলে গেছে।

 

 

বরগুনা:

বর্তমানে আকাশ মেঘলা রয়েছে এবং জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ২-৩ ফুট বেশী বৃদ্ধি পাওয়ায় বেড়ীবাঁধের কয়েক জায়গায় কিছু অংশ ভেঙ্গে যাওয়ায় জোয়ারের পানি প্রবেশ করেছে।। আশ্রয়কেন্দ্রে ৫২০ জন লোক আশ্রয় নিয়েছিল, পরে তারা নিজ বাড়ীতে ফিরে গেছেন। সামান্য ঝোড়ো বৃষ্টি হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ এর প্রভাবে কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

 

ঝালকাঠি:

জেলায় মোট ৪৯৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়। ৪৯৭ জন লোক আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। জোয়ারের পানির উচ্চতা বিপদসীমার উপরে রয়েছে। কোন ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

 

 

পিরোজপুর:

মঠবাড়ীয়া উপজেলার মাঝের চর বেড়ী বাঁধ ভেঙ্গে পানি প্রবেশ করায় ১০/১২টি মাছের ঘের এবং কয়েক একর সবজি বাগান পানির নিচে চলে গেছে। মাঝের চর আশ্রয়কেন্দ্রে ২৫০ জন লোক আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলা থেকে শুকনা খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। জোয়ারের পানি স্বাভাবিক অবস্থা থেকে ৩ ফুট উপরে উঠেছে। ২৫৬টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।

 

বরিশাল:

আবহাওয়া স্বাভাবিক। এক হাজার ৭১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়। কোন লোক আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহণ করেনি। জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য বেশি রয়েছে। কোন ক্ষয়ক্ষতির সংবাদ পাওয়া যায়নি।

 

ভোলা:

জেলার ঝোড়ো হাওয়া হয়েছে। বর্তমানে আবহাওয়া স্বাভাবিক। জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ২/৩ ফুট উপরে উঠেছিল। কিন্তু বর্তমানে নেমে গেছে। দুর্গম চরে প্রায় ২৫০টি কাঁচা ঘরবাড়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং জোয়ারের পানিতে ৯০০ গরু/মহিষ ভেসে গেছে। ৬৯১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার লোক আশ্রয় নিয়েছিল, তবে বর্তমানে এসব লোকজন নিজ নিজ বাড়ী ঘরে ফিরে যাচ্ছে।

 

 

বাগেরহাট:

জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়ে মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা ও মোংলা উপজেলার ২০/২১টি গ্রামে জোয়ারের পানি প্রবেশ করেছে। এতে ২ হাজার ৭০০ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা হিসেবে শুকনা খাবার (চিড়া, গুড় ও খাবার স্যালাইন) সরবরাহের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সকাল থেকে রোদ ছিল। বর্তমানে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক।

 

চাঁদপুর:

জেলা প্রশাসন পরিস্থিতির প্রতি সার্বক্ষণিক নজরদারী রাখছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। কিছু ছিন্নমূল মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের মধ্যে বিতরণের লক্ষ্যে উপজেলাওয়ারী বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পানি উচ্চতা স্বাভাবিক। সামান্য ঝোড়ো হাওয়া বইছে।

 

লক্ষ্মীপুর:

জেলার রামগতি, কমলগঞ্জ উপজেলার নিচু এলাকায় সামান্য জোয়ারের পানি উঠেছে। কিছু রাস্তাঘাট, ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে কোন লোক আশ্রয় গ্রহণ করেনি। সামান্য ঝড়/বৃষ্টি রয়েছে।

 

 

খুলনা:

জেলায় মোট এক হাজার ৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে কোন লোক আশ্রয় গ্রহণ করেনি। ঝোড়ো হাওয়া আছে। জোয়ারের পানির উচ্চতা স্বাভাবিক আছে।

 

ফেনী:

আবহাওয়া স্বাভাবিক, কোন সমস্যা নাই। জোয়ার পানি স্বাভাবিক। ঝোড়ো হাওয়া নাই। গতকাল ট্রলারে মাছ ধরতে গিয়ে ট্রলার ডুবে একজন মারা গেছে। ৪৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল, কিন্তু কোন লোক আশ্রয় গ্রহণ করেনি।

 

চট্টগ্রাম:

জোয়ারের পানি বাড়ছে। বর্তমানে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবহিত হচ্ছে। জেলার মোট ৮৩৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। কোন লোক আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়নি। ক্ষয়ক্ষতির কোন সংবাদ পাওয়া যায়নি।

 

নোয়াখালী:

ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ এর কারণে জেলায় মোট ৩৯০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। এ সব আশ্রয়কেন্দ্রে মোট ৩০০ জন লোক আশ্রয় নিয়েছিল। জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ ফুট উপরে উঠেছিল। জোয়ারের পানিতে নিম্নাঞ্চলের বাড়ী ঘরে পানি উঠেছে। কোন ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

এই সংবাদটি 1,232 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •