• ২১ জানুয়ারি, ২০২২ , ৭ মাঘ, ১৪২৮ , ১৭ জমাদিউস সানি, ১৪৪৩

এলএনজি আমদানিতে সংকটে সরকার

newsup
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৩, ২০২২
এলএনজি আমদানিতে সংকটে সরকার

অর্থনীতি ডেস্কঃ তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি নিয়ে গভীর সংকটে পড়েছে সরকার। একদিকে আমদানির জন্য হাতে পর্যাপ্ত টাকা নেই।

অপরদিকে আমদানি না করলে বিপর্যয়ে পড়বে শিল্পায়ন। জ্বালানি বিভাগ বলছে, বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় দৈনিক ৯৫০ এমএমসিএফডি এলএনজি আমদানি করতে প্রয়োজন বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা।

এরমধ্যে শুধু ১৮ হাজার কোটি টাকা লাগবে সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে। এর চেয়ে কিছুটা কম আমদানি করা যায়। সেক্ষেত্রে পরিমাণ হবে ৮৫০ এমএমসিএফডি। এ পরিমাণ এলএনজি আমদানি করতে প্রয়োজন ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এ খাতেও ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে হবে ১৭ হাজার কোটি টাকা।

জানা গেছে, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও সারে বছরে ভর্তুকি লাগে ৭০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সরকার দিচ্ছে মাত্র সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। বাকি ৫৮ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি। এ অবস্থায় এলএনজি আমদানিতে বিপাকে পড়েছে জ্বালানি বিভাগ। বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এ সংকট নিরসনে হয়তো গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সারের দাম বাড়াতে হবে। অন্যথা এলএনজি আমদানিতে ভ্যাট-ট্যাক্স বাতিল করতে হবে। তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি না করলে শিল্প-কলকারখানায় গ্যাসের জোগান দেওয়া সম্ভব হবে না। গ্যাস না পেলে অর্ধেকের বেশি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৮৫০ এমএমসিএফডি (মিলিয়ন কিউবিক ফুট পার ডে) এলএনজি মিশ্রণ করে চাহিদার পূরণ করা হচ্ছে।

নাম গোপন রাখার শর্তে জ্বালানি বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ভর্তুকির ৫৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে তারা বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দাম বাড়ানোর আবেদন তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সব প্রক্রিয়া শেষে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে জমা দেবে প্রস্তাবনা। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যদি গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয় তাহলে সারের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে।

২৮ ডিসেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগের মাসিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় জানানো হয়, সার, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের জন্য চলতি অর্থবছরে (২০২১-২২) ৭০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন। এ ভর্তুকির বিপরীতে চলতি বছরের বাজেটে এখন পর্যন্ত বরাদ্দ রয়েছে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বরাদ্দ রয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা। ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় দুই হাজার কোটি টাকা জ্বালানি বিভাগকে দিয়েছে। এলএনজি আমদানি করতে সরকারের এখনই দরকার ১৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু এ বরাদ্দও যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে জ্বালানি বিভাগ। সে কারণে নভেম্বরে অর্থ বিভাগের কাছে ৯৩৩১ কোটি টাকার ভর্তুকি চেয়ে চিঠি দিয়েছে তারা।

জানা গেছে, প্রতি হাজার ঘনফুট এলএনজির দাম গত বছরের আগস্টের আগে ছিল ১০ ডলার। এখন বেড়ে ৪৫ ডলার হয়েছে। সাড়ে চারগুণ দাম বেড়েছে এলএনজির স্পট মার্কেটে। দেশে এখন গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৪২০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ হচ্ছে ৩০০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানি করে সরকার। অর্থাৎ সরবরাহকৃত গ্যাসের তিন ভাগের এক ভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। এ বিপুল পরিমাণ এলএনজি আমদানির কারণে গ্যাস খাতে ভর্তুকি বেড়েছে।

জ্বালানি বিভাগের ওই বৈঠকে আরও বলা হয়েছে, গ্যাসের দাম বাড়লে বিদ্যুতেরও দাম বাড়বে। কারণ দেশের প্রায় ৭০ ভাগ বিদ্যুৎ আসে গ্যাস থেকে। বাকি ৩০ ভাগ বিদ্যুতের বড় অংশ আসে তেল থেকে। এর আগে সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে ২৩ ভাগ। ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বৃদ্ধি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ বেড়ে যাওয়ায় সরকার ঘাটতি মেটাতে এ দুটি পণ্যের পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়াতে চায়।

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী বিকাশ দেওয়ান বলেন, পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়লে খুচরা পর্যায়ের দাম বাড়াতেই হবে। আমরা অপেক্ষা করছি পিডিবির পাইকারি প্রস্তাবের ওপর। তারপর আমাদের পক্ষ থেকে গ্রাহক পর্যায় খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদন করা হবে।

এদিকে গ্যাস সংকট সমাধানে এলএনজি ফিলিং স্টেশনে রেশনিং শুরু হয়েছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এটি সমাধান নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ হিসাবে তারা বলছেন, প্রতি বছর দেশে গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে গড়ে ১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) বা ১০০ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) থেকে ১ দশমিক ১ টিসিএফ গ্যাস। এর মধ্যে বিদ্যুতে ব্যবহার হয় ৪৩.২৮ শতাংশ, শিল্পকারখানায় ১৫.৭৯ শতাংশ, বাসা-বাড়িতে ১৫.২৫ শতাংশ, শিল্পকারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্র (ক্যাপটিভ পাওয়ার) ১৫.১২ শতাংশ, সার উৎপাদনে ৫.৫৪ শতাংশ, সিএনজি দশমিক ১৬ শতাংশ, বাণিজ্যিক দশমিক ৭৬ শতাংশ ও চা বাগানে দশমিক ১০ শতাংশ। আর এ মুহূর্তে গ্যাসের অভাবে প্রায় ২৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না।

এই সংবাদটি 1,228 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •