এলডিসি থেকে বের হতে সময় নেওয়া উচিত

প্রকাশিত:শনিবার, ২৫ জুলা ২০২০ ০৯:০৭

 নিজেস্ব প্রতিবেধকঃ বৈশ্বিক মহামারি কভিড-১৯ এর কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে রেকর্ড হারে। করোনার কারণে বিশ্ব বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। এ অবস্থায় বাণিজ্য সুবিধা চলমান রাখার উদ্দেশ্যে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণ প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেওয়াই বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলজনক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্নেষক ড. আব্দুর রাজ্জাক। কভিড-১৯ এর প্রভাব এবং রপ্তানি সংক্রান্ত অর্থনৈতিক সাংবাদিকদের সংগঠন ইআরএফ আয়োজিত কর্মশালায় এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন তিনি। দি এশিয়া ফাউন্ডেশন এবং র‌্যাপিড এই আয়োজনে সহযোগিতা করে।
বৃহস্পতিবার অনলআইন প্ল্যাটফর্মে আয়োজিত কর্মশালায় ড. রাজ্জাক বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর সব দেশে শুল্ক্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। এদিকে তৈরি পোশাকে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করেছে। বাংলাদেশ যদি এলডিসি থেকে ২০২৪ সালে বের হয়ে যায় এবং জিএসপি-প্লাস সুবিধা না পায় তাহলে ২০২৭ সালের পর ইইউতে বাংলাদেশি পণ্যে শুল্ক্কহার দাঁড়াবে ১০ শতাংশ। আর ভিয়েতনামের পণ্যে কোনো শুল্ক্ক থাকবে না। সম্ভাব্য ওই পরিণতি ঠিক এখনকার বিপরীত। অন্যদিকে বাংলাদেশ যদি এলডিসি থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়া পিছিয়ে না দেয় তাহলে ২০২৪ সাল থেকেই ইইউ বাদে অন্য সব জায়গায় এমনকি সম্প্রতি ঘোষিত চীনের বাজার থেকেও শুল্ক্কমুক্ত সুবিধা হারাবে। সে ক্ষেত্রে চীনে রপ্তানি বড় আকারে বাড়ানোর যে সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সুতরাং, কভিডের বাস্তবতায় এলডিসি থেকে বের হতে বাংলাদেশ আরেকটু সময় নিতে পারে।
ড. আব্দুর রাজ্জাক কমনওয়েলথ সচিবালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভাগের সাবেক প্রধান। তিনি রিসোর্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) চেয়ারম্যান এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) গবেষণা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। অন্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারম্যান আবুল কাশেম খান, ঢাকা চেম্বারের সভাপতি শামস মাহমুদ, দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ ও র‌্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আবু ইউসুফ। কর্মশালা সঞ্চালনা করেন ইআরএফের সাধারণ সম্পাদক এসএম রাশিদুল ইসলাম। সব শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ইআরএফের নির্বাহী কমিটির সদস্য দৌলত আক্তার মালা।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, করোনায় যেমন সংকট তৈরি হয়েছে, তেমনই সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। অনেক দেশ এখন পণ্য আমদানিতে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়। অনেক দেশ চীন থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে অন্য দেশে বিনিয়োগ করার কথা ভাবছে। সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দ্রুতই বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, রপ্তানি বাড়াতে ১১টি দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। এর মধ্যে ভুটানের সঙ্গে এক মাসের মধ্যে চুক্তি হতে পারে। চলতি অর্থবছরে ৪৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা অর্জন করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
এলডিসি থেকে উত্তরণ : ২০১৮ সালের পর্যালোচনায় জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্য বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। পরবর্তী পর্যালোচনা ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এই পর্যালোচনায় যোগ্য হলে বাংলাদেশের ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা। ড. রাজ্জাক বলেন, পরবর্তী পর্যালোচনায় যেসব উপাত্ত ব্যবহার হবে তা কভিডের আগের। ফলে বাংলাদেশের উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। ড. আব্দুর রাজ্জাক মনে করেন, এ অবস্থায় বাংলাদেশের সামনে ৪টি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, নতুন করে কোনো কিছু না করা। তাহলে প্রক্রিয়া অনুযায়ী উত্তরণ হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, এলডিসিগুলোর নেতৃত্ব দিয়ে পরবর্তী পর্যালোচনা তিন বছরের জন্য পিছিয়ে দেওয়া। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ নিজের এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার জন্য লিখিত আবেদন করতে পারে। চতুর্থত, জাতিসংঘের এলডিসি শ্রেণীকরণ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া। সরকার এখন কী করবে তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। এক প্রশ্নের উত্তরে ড. রাজ্জাক বলেন, তার নিজের সুপারিশ হলো, দলগতভাবে এলডিসিদের সঙ্গে নিয়ে করোনার পরিপ্রেক্ষিতে পর্যালোচনা পিছিয়ে দেওয়া এবং তা সম্ভব না হলে নিজের উত্তরণ পেছানোর জন্য অনুরোধ করা। নেপালসহ আরও কয়েকটি দেশ এ ধরনের অনুরোধ এর আগে করেছে।
এলডিসি প্রসঙ্গ ছাড়াও বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যে চীনের ঘোষিত শুল্ক্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা নিয়েও ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, শুল্ক্কমুক্ত সুবিধায় চীনের মোট আমদানির যদি ১ শতাংশ বাংলাদেশ রপ্তানি করতে পারে তাহলেও অন্তত ২৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করা সম্ভব।

 

এই সংবাদটি 1,226 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •