ঐতিহ্যে-সৃজনে শতবর্ষের ‘গয়নাগ্রাম’

প্রকাশিত:সোমবার, ১৮ অক্টো ২০২১ ০২:১০

ঐতিহ্যে-সৃজনে শতবর্ষের ‘গয়নাগ্রাম’

নিউজ ডেস্কঃ  রাজধানীর কূল ঘেঁষা বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত গ্রামীণ জনপদ ভাকুর্তা। সাভার উপজেলার একটি ইউনিয়ন এটি। তামা ও পিতলের গয়না তৈরির শতবছরের ঐতিহ্য বহন করে চলছে এ ভাকুর্তা গ্রাম। এই জনপদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে গয়না শিল্প। এ এলাকার মানুষ কৃষি কাজ ছাড়াও অলঙ্কার তৈরির কাজকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। শুধু দেশে নয়, এখানকার গয়নার চাহিদা দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিদেশেও। মূলত উৎসব ও বিশেষ কোন দিবসকে কেন্দ্র করে এর চাহিদা বেড়ে যায়। কিন্তু করোনা মহামারির সময় গহনা শিল্পীদের ব্যবসায় ভাটা পড়ে। বর্তমানে করোনার প্রভাব কমতে থাকায় তারা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজার পার হলেই তুরাগ নদের ওপর ছোট্ট একটি লোহার সেতু। সেখান থেকে ভাকুর্তা মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। এই ইউনিয়নভুক্ত গ্রামের সংখ্যা ৩৬। ভাকুর্তা ইউনিয়নের ভাকুর্তা, কান্দিভাকুর্তা, হিন্দুভাকুর্তা, মোগরাকান্দা, মুশুরীখোলা, ডোমরাকান্দা, বাহেরচর, ঝাউচর, লুটের চর, চুনার চর, চাপড়া ও চাইরা গ্রামের প্রায় ৮ হাজার লোক গয়না তৈরির কাজে যুক্ত। নারী-পুরুষ মিলে সম্পূর্ণ দেশিয় পদ্ধতিতে হাতের ছোঁয়ায় তৈরি করেন গলার হার, হাতের চুড়ি, কানের দুল, ঝুমকা, চেন, পায়েল ও নূপুর সহ বিভিন্ন ডিজাইনের গয়না। এই গয়না তৈরি করে যেমন অন্যকে সাজতে সহায়তা করছেন, তেমনি একে অবলম্বন করে নিজেদের জীবনকেও সাজাচ্ছেন এখানকার মানুষ। গ্রামগুলোতে বসবাসকারী মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস গয়না তৈরি করা।

রাজধানীর জুয়েলারি দোকানগুলোয় ভাকুর্তায় তৈরি অলঙ্কারের চাহিদা স্বর্ণের চেয়েও বেশি। দোকানিরা বলেন, দফায় দফায় স্বর্ণের দাম বাড়ায় ব্যবসায় মন্দা চলছে। তার ওপর ৫% ভ্যাট দিতে হয়। যার ফলে স্বর্ণে লাভ খুবই কম। সাধ থাকলেও সাধ্যের মধ্যে না থাকায় সোনার গহনা এখন আর অনেকেই কিনেন না। তাই সিটি গোল্ড মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের একমাত্র ভরসা। এগুলোর দামও যেমন কম আবার সৌন্দর্যও সোনার মতো।

রাজধানী ঢাকার সন্নিকটে সাভারের ভাকুর্তার জুয়েলারি সরবরাহ হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় সব বড় শপিংমল, ঢাকার নিউমার্কেট, আজিজ সুপার মার্কেট, চাঁদনী চকসহ সব মার্কেটে। এ ছাড়া গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, খুলনা, বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চল গয়নার বৃহত্তর বাজার। পাইকাররা এসে এখান থেকে গয়না কিনে নিয়ে যান।

সময়ের পরিবর্তনে এখানকার গ্রামগুলোতে ছোটবড়, নারী পুরুষ, ছেলে বুড়ো সবাই এখন ব্যস্ত রূপার অলঙ্কার তৈরিতে। এখন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রূপার অলঙ্কার তৈরি করে তাদের ঘরে ফিরে এসেছে স্বচ্ছ¡লতা। এখন তারা যেন আধুনিক এ সমাজের উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এরই মধ্যে কৃষিকাজের পাশাপাশি গ্রামের লোকজন অলঙ্কার তৈরির শিল্পকে তাদের পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তাই, বাড়ির পুরুষ সদস্যের পাশাপাশি নারী সদস্যরাও অলঙ্কার তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।

ভাকুর্তা গিয়ে দেখা যায়, বেশিরভাগ বাড়ির বারান্দায় আগুনের ফুলকি উঁকি দিচ্ছে। জানা গেল পুরো গ্রামে এ কর্মযজ্ঞ চলে। গ্রামের নামেই গড়ে উঠেছে বাজার। সেখানে রয়েছে বিরাট একটি বটগাছ। সেই বটগাছ ঘেঁষে সারি সারি গহনার দোকান। সব দোকানে একই রকমের জিনিস। গহনা তৈরিতে যত কাঁচামালের প্রয়োজন সবই সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। গহনা তৈরির কাঁচামাল বিক্রির দোকানের মালিক ও কারিগর নিখিল চন্দ্র রাজবংশী। এলাকার বেশির ভাগ মানুষ রাজবংশী। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিন প্রজন্ম ধরে তারা এই কাজ করছেন। গ্রামের প্রায় সবার পেশা গহনা তৈরি করা। বাজারের সকল দোকানই সাজানো-গোছানো। বাজারের একাংশে দোকান বোঝাই বাক্স নিয়ে বসে আছেন দোকানিরা। বাক্সের মধ্যে আছে ছোট ছোট ড্রয়ার। এসব ড্রয়ারের বাইরে একটা ডিজাইন লাগানো। এটা দেখে ধারণা করা যায়, ওই ড্রয়ারে এ ডিজাইনটিই আছে। এছাড়া কোনও কোনও দোকানে বোর্ড-কাগজের ডাইসে করা গহনার ডিজাইনের নমুনা লাগানো রয়েছে।

একসময় চিকন পাইপ দিয়ে ফুঁ দিয়ে দিয়ে গহনা তৈরির কাজ করা হতো। এখন শুরু হয়েছে গ্যাস দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে কাজ। বাজারের এক মাথায় এখনও আছে কিছু ফুঁ দিয়ে গহনা তৈরির কারিগর। ঘামে টুপটুপে হয়ে কাজ করে চলেছেন অনেকে। তবে আরেক প্রান্তের দৃশ্য ভিন্ন। আগুনের কাজটি তারা করছেন গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করে।

হিন্দু ভাকুর্তার গহনা কারিগর আনন্দ সরকার জানান, কয়েক প্রজন্ম ধরে তারা এই কাজ করছেন। গ্রামের প্রায় সবার পেশা গয়না গড়া। গয়না তৈরির কাজটি আগে হিন্দুরা করতেন। মুসলমানেরাও এটিকে এখন পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাদের তৈরি গয়নাগুলো পাইকারের কাছে বিক্রি করা হয় ২০ টাকা থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায়। দাম ডিজাইন ও আকারের ওপর নির্ভর করে। এসব গয়নার বেশির ভাগই অপরিশোধিত অবস্থায় বিক্রি হয়। পাইকারি ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে পরিশোধন করে যখন মার্কেটে খুচরা বিক্রি করেন। তখন এর দাম দেড় থেকে দুই গুণ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়।

ভাকুর্তার আবু সিদ্দিক জানান, গয়না তৈরির কাঁচামাল তামা কিনে নিয়ে আসা হয় ঢাকার তাঁতিবাজার থেকে। এ ছাড়া কিছু গয়নার কাঁচামাল বগুড়া ও ভারত থেকে নিয়ে আসা হয়। নিজেদের দক্ষতা ও পরিশ্রম দিয়ে কাজ করেন কারিগররা। দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করে আয় হয় ৫শ থেকে ৬শ টাকা।

ভাকুর্তা বাজারের মৌসুমী জুয়েলারি ওয়ার্কসপ ও বাজার কমিটির সভাপতি নাজিম উদ্দিন জানান, ভাকুর্তা বাজারের বয়স প্রায় ১৫০ বছরের কাছাকাছি। এ বাজারে দোকান রয়েছে ১২০টির মতো। আর ভাকুর্তা ইউনিয়নে কমপক্ষে ৩৫০-৪০০টি দোকান। প্রায় ৮ হাজার মানুষ এই পেশায় জীবিকা নির্বাহ করেন। প্রতিটি পরিবারের কমপক্ষে একজন সদস্য এই পেশায় জড়িত রয়েছেন। তিনি বলেন, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জায়গায় যেসব ইমিটেশন বা সিটি গোল্ডের গয়না বিক্রি হয় তার বেশির ভাগই এখানে তৈরি হয়। এ ছাড়া স্বল্পসংখ্যক বিদেশেও রফতানি করা হয়।

বেসরকারি সংস্থা সোস্যাল আপলিফটমেন্ট সোসাইটি (সাস) এর নির্বাহী পরিচালক হামিদা বেগম জানান, ভাকুর্তার জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের সমস্যা থেকে উত্তোরণ ও এ ব্যবসা প্রসারে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) সহায়তায় করছে। ভাকুর্তায় সাসটেইনেবল এন্টারপ্রাইজ প্রজেক্টের আওতায় স্বাস্থ্যসম্মত ও কর্মবান্ধব ইমিটশেন জুয়েলারি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, প্রকল্পের এই কার্যক্রম পরিদর্শনে সম্প্রতি পিকেএসএফ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. নমিতা হালদার এনডিসি ভাকুর্তায় আসেন এবং গহনা শিল্লীদের সাথে সভা করেন।

ভাকুর্তা ঘিরে গহনার ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠলেও পেশার সঙ্গে যুক্ত লোকজন জানালেন কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা। পর্যাপ্ত ঋণ সহায়তা না পাওয়ায় গহনা তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত কম আয়ের মানুষজন তাদের ব্যবসার আকার বাড়াতে পারছেন না। তাছাড়া রাজধানীর লাগোয়া হলেও ভাকুর্তার যোগাযোগ অবস্থা ভয়াবহ রকম খারাপ। ইউনিয়নের প্রধান সড়কটির স্থানে স্থানে গর্ত। ধুলোবালির জন্য পায়ে হেঁটে পার হওয়াই দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা। রাস্তার দুরবস্থায় রাজধানী ও অন্য জেলার ব্যবসায়ীদের অনেকেই প্রথমবার এসে আর আসতে চান না। স্থানীয়দের দাবি, এসব সমস্যা দীর্ঘদিনের। তবুও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে কোন উদ্যোগ নেই।

এই সংবাদটি 1,230 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •