কবিগানকে সুস্থ্যধারার সংস্কৃতি চর্চা ও প্রজন্মের জন্য ধরে রাখতে হবে।

প্রকাশিত:মঙ্গলবার, ২০ এপ্রি ২০২১ ১২:০৪

কবিগানকে সুস্থ্যধারার সংস্কৃতি চর্চা ও প্রজন্মের জন্য ধরে রাখতে হবে।

 

এম, এ কুদ্দুস, বিরল (দিনাজপুর) প্রতিনিধি ॥
আদিবাংলার জনপ্রিয় লোকসংগীত বা বঙ্গদেশের ঐতিহ্যপূর্ণ ও শিক্ষা মূলক কবিগান নিয়ে রয়েছে নানা কথা এবং গৌরবোজ্জল ইতিহাস। যুগে যুগে চারণ কবি, কবিয়াল বা কবি সরকারেরা আদিবাংলার লোকসংস্কৃতির এই কবিগান নামক বিশেষ ধারাটিকে আঁকড়ে ধরে এখোনও টিকে আছেন বলেই আমরা এই কবিগান প্রজন্মেও কাছে তুলে ধরা, চর্চা, গবেষণা এবং গর্বসহ নানারকম কথা বলতে পারি বা পারছি। সাহিত্য ও তথ্য প্রযুক্তির যুগেও আদিবাংলার লোকসংস্কৃতির এই কবিগান, কবির পালা বা তর্জ্জাগান সংস্কৃতিমনা মানুষের মনিকোটায় সহসায় স্থান করে নিতে পারে। তাই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে গ্রামাঞ্চল ছেড়ে এখন শহরের দিকে এগিয়ে চলছে এই কবিগান। একসময় কবিয়ালেরা শোখ ও এক প্রকার জীদের বসে কবিগান পরিবেশন করলেও এখন অনেক কবিয়ালই এই কবিগানকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছেন। তারা আগে একাকী নিজ নিজ দল গঠন করে কবিগান পরিবেশন করে আসলেও এখন তাঁরা অনেকটা সুসংঘঠিত। গত ২০১১ ইং সালে দিনাজপুরের বিরল উপজেলা শহরে বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এম,পি মহোদয়ের ঐক্যান্তিক প্রচেষ্টা পৃষ্টপোষকতায় বাংলাদেশ জাতীয় চারণ কবি সংঘ নামের তাঁদের একটি সংগঠন গড়ে উঠে। যে সংগঠনটি সংগীতবান্ধব, জনকল্যাণমূখী, অরাজনৈতিক, অলাভজনক আত্মমানবতার সেবায় নিয়োজিত প্রগতিশীল চিন্তা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শে বিশ্বাসী একটি সংগঠন। বর্তমানে সংগঠনটি তাঁর কর্মকান্ডের মধ্যদিয়ে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর ও জেলা, উপজেলা শহরেরমত রাজধানী ঢাকাতেও ব্যপক পরিচিতি লাভ করেছে। কিন্তু তাঁর পরেও মা, মাটি, দেশ ও দশের হৃদয়ের গান গাওয়া এসব মানুষের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন ঘটেনি। সমাজ ব্যবস্থার লাঞ্চণা-বঞ্চণা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দারণ অবহেলা আর উদাসীনতার কারণে এসব মানুষ এদেশের পিছিয়ে পড়া এক প্রকার শ্রেণী গোষ্ঠিতে পরিণত হয়েছে। উপরুন্ত দেখা দিয়েছে মরার উপর খঁড়ার ঘাঁ। গত ১ বছর ধরে বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯ করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে গ্রামীণসহ সকল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান একপ্রকার বন্ধ থাকায় রাতজাগা পাখি এসব চারণ কবি, কবি সরকার, কবিয়াল, বাউল-বয়াতী, কৃর্ত্তনীয়া, লালন শিল্পীরা পড়েছেন দারুণ বিপাকে। অনেকে অর্থাভাবে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করে চলছেন।
এদিকে গ্রামাঞ্চলের হলেও জীবন যুদ্ধে কোন রকমে টিকে থাকা এই কবি, কবিয়াল, কবি সরকার এবং কবিগান নিয়ে রয়েছে মানুষের দারুণ ইচ্ছা, আকাঙ্খা ও জানার আগ্রহ। আদিবাংলার ঐতিহ্যপূর্ণ জনপ্রিয় এই লোকসংগীত শিক্ষা মূলক চাপান-উতোর আঙ্গিক সমৃদ্ধ ছন্দোবদ্ধ লোকগান বা কবিগান। এছাড়া আগমনী, বন্ধনাগীত, বলকর্তন (সুরচ্ছেদ), প্রভাতী, বিচ্ছেদ, মান, মাথুর, গোষ্ঠ ও দ্বন্ধ ঘুঁচানো বিলাসেনী, সুর, তাল, লয়, ছন্দ, রস, অলঙ্কার, অনুপ্রাস, ব্যাখ্যা, দোঁহা (ধূঁয়া), শ্লোক এবং ধর্ম, সমাজ, দেশ, নীতি-নৈতিকতা, শাস্ত্রপুরাণ, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, এমনকি সদ্যঘটিত ঘটনা বিষয়ক প্রহেলিকাপূর্ণ রসদ বিদ্যমান। এত শিক্ষা আর সচেতনতা অন্য সঙ্গীতে আর নেই। কবিগান আট থেকে আশি বছর বয়সের আবালবৃদ্ধবণিতাকে চেতনা দান করে সামাজিক ঐক্য ও উন্নয়ন ঘটার ক্ষেত্রে ভ’মিকা রাখতে সক্ষম। কিন্তু তার পরেও কবিগান সমাজে কেন যানি উপেক্ষিত। অন্যান্য সঙ্গীতের যেরূপ কদর, সেখানে কবিগান যেন আবহবাংলার কালের স্বাক্ষী মাত্র। অথচ এই কবি গানই হল আদিবাংলার জনপ্রিয় লোকসংগীত বা বঙ্গদেশের ঐতিহ্যপূর্ণ ও শিক্ষা মূলক একটি গান। একজন ‘কবি’ কিভাবে ‘কবিয়াল বা কবি সরকার’ হয়ে উঠেন আমাদের সে বিষয়টিও জানা প্রয়োজন। ঐশ্বরিক শক্তির প্রভাবে একজন প্রকৃত কবিয়ালের স্বভাবে শিশুকাল হতেই কবিত্বভাব প্রস্ফুটিত ও পরিলক্ষিত হয়। চলনে বলনে আচার আচরণে প্রতিটি পদক্ষেপেই তার কবির ছন্দ থাকে। “কবি” শব্দের অর্থ হল জ্ঞানী। সুতরাং জ্ঞানাধারে প্রভূত জ্ঞান নিহিত না থাকলে কবি হওয়া যায় না। দুটি সমন্ধ নিয়ে ঢোলের তালে অঙ্গ দুলিয়ে তাৎক্ষনিক পদ রচনা করে ছড়া কেটে কেটে যিনি কবিগান পরিবেশন করেন তাকেই কবিয়াল বা কবি সরকার বলা হয়। তাছাড়া আপামর জনসাধারণের জন্য কবিগানের মাধ্যমে লোকশিক্ষা ও চেতনা দান করেন বলে একজন কবিয়ালকে লোককবিও বলা হয়। এছাড়া তিনি স্বভাবকবি নামেও সর্বজনবিদিত। কারণ কবিত্বশক্তিই তাঁর জন্মজাত ও স্রোষ্টাপ্রদত্ত। সুতরাং একজন প্রকৃত কবিয়ালই সমাজের শ্রেষ্ঠ অভিভাবক যিনি তাঁর মননশীলতায় সুর-লয়-তাল-ছন্দ-অলঙ্কার-রসজ্ঞান ও বাগবৈদগ্ধ্যের দ্বারা সমাজকে সুস্থ রাখেন। তাই সুষ্ঠু ও সুস্থ্যসংস্কৃতির আদিবাংলার এ কবিগানের ধারাটি লালন করতে হলে এসব জ্ঞানগর্বপূর্ণ মানুষদের টিকিয়ে রাখতে হবে।

এই সংবাদটি 1,232 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •