করোনা প্রতিরোধে রোডম্যাপ : শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র গণটিকা

প্রকাশিত:বুধবার, ২৮ জুলা ২০২১ ০৬:০৭

করোনা প্রতিরোধে রোডম্যাপ : শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র গণটিকা

বিশেষ প্রতিনিধিঃ 

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শহরের পাশাপাশি গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকায় ব্যাপক ভিত্তিতে টিকাদান শুরু হবে। আগামী ৭ থেকে ১২ আগস্ট ছয় দিন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে চলবে গণটিকাদান। গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে টিকাকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। সেখানে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে গেলেই টিকা পাওয়া যাবে। জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মসনদ নেই- এমন ব্যক্তিদেরও বিশেষ ব্যবস্থায় টিকা দেওয়া হবে।

গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় ব্যাপকভিত্তিক টিকাদানের লক্ষ্যে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে জানানো হয়, ৩০ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে যে কেউ জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে গেলে তাকে টিকা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সম্মুখ সারিতে কাজ করা পেশাজীবীদের পরিবারের ১৮ বছরের বেশি বয়সী সদস্যরা টিকা পাবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা টিকা কার্যক্রম মনিটরিং করবেন।
কভিড-১৯ প্রতিরোধে আরোপিত বিধিনিষেধের কার্যক্রম পর্যালোচনা ও টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্যে এ সভার আয়োজন করা হয়। এতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে টিকাদানের পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। তারা সারাদেশে এক সপ্তাহের মধ্যে এক কোটি মানুষকে টিকার আওতায় আনার প্রস্তাব করে।

শহরাঞ্চলে মডার্না এবং গ্রামাঞ্চলে সিনোফার্মের টিকা দেওয়া হবে। টিকা পরিকল্পনায় সারাদেশে ১৩ হাজার ৮০০ ওয়ার্ড, সিটি করপোরেশনের ৪৩৩টি ওয়ার্ড, পৌরসভার এক হাজার ৫৪টি ওয়ার্ডসহ মোট ১৫ হাজার ২৮৭ ওয়ার্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গ্রাম ও পৌরসভার প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে টিকা দেওয়ার জন্য একটি করে টিম রাখা হবে। আর সিটি করপোরেশন এলাকার প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে তিনটি করে টিম থাকবে। গ্রাম ও পৌরসভা এলাকায় চার দিন এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ছয় দিন টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। গ্রাম, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মোট ১৫ হাজার ২৮৭টি কেন্দ্রে প্রতিদিন ২০০ ডোজ করে মোট এক কোটি ৩৪ লাখ ৪২ হাজার ডোজ টিকা দেওয়া হবে।
সভায় জানানো হয়, সারাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির কর্মীদের মাধ্যমে প্রচারাভিযান (ক্যাম্পেইন) চালানো হবে। উপজেলা পর্যায়ে বিদ্যমান সাব-ব্লক অনুযায়ী টিকাদান সেশন পরিচালিত হবে। সারাদেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তিন কোটি ডোজ টিকা সংরক্ষণের ক্ষমতা রয়েছে।

সভায় উপস্থিত থাকা স্বাস্থ্য বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, রাজধানীরসহ বিভিন্ন নগরীর পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও করোনার সংক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। নগরীর মতো গ্রামে চিকিৎসা সুবিধা নেই। তাই গ্রামে করোনার বিস্তার ঘটলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। আক্রান্ত ও মৃত্যু কয়েকগুণ বাড়বে। এ কারণে কম সময়ে গ্রামে ব্যাপকভিত্তিক টিকা কার্যক্রম চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে সভায় অন্যদের মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভা শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, টিকা দেওয়ার বিষয়ে সরকার বেশি জোর দিচ্ছে। ৭৫ শতাংশ পঞ্চাশোর্ধ্ব নারী-পুরুষ করোনায় সংক্রমিত হচ্ছেন। এদের মধ্যে যারা ঢাকা শহরের হাসপাতালে ভর্তি আছেন, তাদের ৯০ শতাংশই টিকা গ্রহণ করেননি। তাদের মৃত্যুহার বেশি। এ কারণে টিকাদান কার্যক্রমে জোর দেওয়া হয়েছে। যারা পঞ্চাশোর্ধ্ব আছেন তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তারা ইউনিয়ন পর্যায়ে টিকা নিতে পারবেন।
জাহিদ মালেক আরও জানান, সোয়া কোটি ডোজ টিকা দেওয়ার পরও সরকারের কাছে এক কোটি ডোজের বেশি টিকা রয়েছে। আগামী মাসের মধ্যেই আরও দুই কোটি ডোজ টিকা দেশে চলে আসবে। আগামী বছর ২১ কোটি ডোজ টিকা পাওয়া যাবে। সুতরাং গণটিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশনা দিয়েছেন। এ জন্য সবাইকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। শুধু নিরাপত্তা বাহিনী বা সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, সমাজসেবীসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করা হবে। যে টিকা আছে তা দিয়েই শুরু হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সম্মুখ সারির যোদ্ধারা নিজ নিজ এলাকায় দায়িত্ব পালন করবেন। যেখানে নৌবাহিনী আছেন, সেখানে নৌবাহিনীর মাধ্যমেই টিকা কার্যক্রম তদারকি করা হবে। যেখানে পুলিশ আছেন, সেখানে পুলিশের মাধ্যমে টিকা কার্যক্রম চলবে। টিকা যারা দিচ্ছেন তারাই তদারকি করবেন, যাতে করে সবাইকে সম্পৃক্ত করা যাবে। তবে সবাইকে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মসনদ নেই, তাদের ‘বিশেষ ব্যবস্থায়’ কভিড টিকা দেওয়া হবে। টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অসুবিধা না হয়, সে ব্যাপারে সরকার পদক্ষেপ নেবে।
ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কোভিশিল্ডের তিন কোটি ডোজ কিনতে গত বছরের ডিসেম্বরে চুক্তি করেছিল বাংলাদেশ। চুক্তি অনুযায়ী জানুয়ারিতে ৫০ লাখ ডোজ পাওয়ার পর ফেব্রুয়ারিতে গণটিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ২০ লাখ ডোজের পর আর টিকা পায়নি বাংলাদেশ।

২৫ এপ্রিল টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সরকার টিকার জন্য চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরে চীন থেকে সিনোফার্মের দেড় কোটি ডোজ কেনার চুক্তি হয়। চীনের উপহার ও কেনা টিকা মিলে সিনোফার্মের ৫১ লাখ ডোজ হাতে পেয়েছে বাংলাদেশ। এর বাইরে টিকার বৈশ্বিক জোট কোভ্যাক্স থেকে ছয় কোটি ৮০ লাখ ডোজ টিকা পাওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ফাইজার বায়োএনটেকের এক লাখ ৬২০ ডোজ; দুই ধাপে মডার্নার ৫৫ লাখ ডোজ এবং জাপান থেকে অ্যাস্ট্রাজেনেকার দুই লাখ ৪৫ হাজার ডোজ পেয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে সাত কোটি ডোজ স্পুটনিক-ভি ক্রয়ের চুক্তিও করেছে সরকার। জনসন অ্যান্ড জনসনের সাত কোটি ডোজ কেনার বিষয়েও চুক্তি হয়েছে। সব মিলিয়ে আগামী বছরের মধ্যে ২১ কোটি ডোজ টিকা পাবে বাংলাদেশ।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, বর্তমানে প্রায় এক কোটি ডোজের মতো টিকা মজুদ রয়েছে। আগামী মাসে আরও দুই কোটি ডোজ আসবে। সুতরাং টিকা নিয়ে সমস্যা হবে না।

শহরের পাশাপাশি গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকাদান কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, টিকার জন্য একটি উৎসের ওপর নির্ভরশীল থাকার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। এ কারণে মাঝখানে টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। শুরুতে ভারতের পাশাপাশি চীন ও রাশিয়াসহ টিকা উৎপাদনকারী সব উৎসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে ভালো হতো। এর পরও সরকারের প্রতি আহ্বান থাকবে, টিকা উৎপাদনকারী সব উৎস যেন খোলা রাখা হয়। তাহলে ভবিষ্যতে সংকটে পড়তে হবে না। একই সঙ্গে টিকা উদ্ভাবনকারী দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে উৎপাদনে যেতে পারলে তা আরও লাভজনক হবে।

এই সংবাদটি 1,231 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •