কুষ্টিয়ায় গড়াই নদী খনন প্রকল্প ৬২৯.৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে খননে বেড়েছে পানির প্রবাহ, কমেছে লবনাক্ততা

প্রকাশিত:শনিবার, ২০ মার্চ ২০২১ ০৭:০৩

কুষ্টিয়ায় গড়াই নদী খনন প্রকল্প ৬২৯.৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে খননে বেড়েছে পানির প্রবাহ, কমেছে লবনাক্ততা

নাদিয়া ইসলাম মিম, কুষ্টিয়া ॥
তৃতীয় ধাপের খননে অনেকটা প্রাণ ফিরেছে দেশের উপকুল ভাগে মিঠা পানির অন্যতম আধার গড়াই নদীতে। প্রথম দুই দফা খননে তেমন সুফল না পাওয়ায় খনন প্রক্রিয়ায় কিছুটা পরিবর্তন আনার ফলে এবারে শুস্ক মৌসুমে গড়াইয়ে পানি প্রবাহ অনেকটাই বেড়েছে। এতে দেশের উপকুলভাগ তথা সুন্দরবন এলাকায় মিঠা পানির সরবরাহ বেড়েছে, কমেছে লবনাক্ততা। পাশাপাশি খুশী নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ।
সুন্দরবনসহ দেশের উপকুলভাগে মিঠা পানির অন্যতম আধার পদ্মা নদীর প্রধান শাখা নদী কুষ্টিয়া থেকে উৎপত্তি হওয়া গড়াই। এক সময় শুস্ক মৌসুমে পদ্মায় পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গড়াই নদীর উৎসমুখ বন্ধ হয়ে যেত। এতে সুন্দরবনসহ উপকূলভাগে মারাত্মক লবানাক্ততা দেখা দেয়। হুমকির মুখে পড়ে উপকুলভাগের জীব বৈচিত্র। এটা অনুধাবন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রথমে ১৯৯৮ ও ২০০৯ সালে দুই দফায় গড়াই নদী খননের উদ্যোগ নেয় সরকার। তবে অপরিকল্পিত খননের ফলে কাঙ্খিত ফল আসেনি বিপুল অর্থ ব্যয়ে। সে সময় এ প্রকল্পে নানা অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছিল। সরকারী এক প্রতিবেদনে এর সত্যতাও মেলে। পরে ২০১৮ সালে খনন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এনে ৬২৯.৪৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরে পুনরায় গড়াই খনন শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছর। এ প্রকল্পের আওতায় মিরপুর উপজেলার তালবাড়িয়ায় নদীর উৎসমুখ থেকে ভাটিতে কুমারখালী উপজেলা পর্যন্ত ২০.৫০ কিলোমিটার এলাকায় খনন করা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ড্রেজার বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (ভেড়ামারা) তাজমির হোসেন জানান, আগের দু’দফায় মাত্র ৪০ মিটার প্রশস্ত করে নদী খনন করা হয়। এ কারণে পদ্মা থেকে খুব বেশি পানি গড়াইয়ে ঢুকতো না। এ কারণে বর্তমান প্রকল্পের আওতায় খনন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ প্রকল্পের অধীনে গড়াইয়ের উৎস মুখে ৩৫০ মিটার এবং বাকী অংশে ১২০ মিটার প্রশস্ততা ধরে খনন কাজ চালানো হচ্ছে। এতে ভাল ফল পাওয়া যাচ্ছে। গড়াইয়ে অন্য যেকোন শুস্ক মৌসুমের তুলনায় পানি প্রবাহ বেশি রয়েছে। এই প্রকৌশলী বলেন, গড়াইয়ে পানি প্রবাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ নদীর উপকুল ভাগে লবনাক্ততা কমতে শুরু করেছে। সুন্দরবনের হিরন পয়েন্টে লবনাক্ততার পরিমান অর্ধেকে নেমে এসেছে। তাজমির হোসেন বলেন, এবারের প্রকল্পের আওতায় কেবল নদী খননই নয়, নদীর তীর সংরক্ষণেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খনন থেকে পাওয়া বালু দুই তীর সংরক্ষণে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর থেকে পাওয়া ভূমিতে বনায়ন করা শুরু হয়েছে।
পরিবেশ বিশ্লেষক প্রফেসর ড. রেজওয়ানুল হক বলেন, ‘পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনার মধ্যে দিয়ে খনন করার ফলে গড়াইয়ে আগের চেয়ে পানি প্রবাহ বেড়েছে। সারা বছর পানি প্রবাহ থাকতে হবে। দীর্ঘমেয়দী পরিকল্পনা নিয়ে খনন কাজ চালিয়ে গেলে নদী বাঁচবে। গড়াই বাঁচলে এ অঞ্চলের জীব বৈচিত্রসহ সুন্দরবন বাঁচবে।
এদিকে, শুস্ক মৌসুমে নদীতে পর্যাপ্ত পানি পেয়ে খুশী এলাকার মানুষ। সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, নদী ঘিরে দুপাড়ের মানুষের মধ্যে প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন রতন আলী, আসলাম, রিপন। কথা হলে তারা বলেন, এখন যথেষ্ট পানি প্রবাহ আছে, মাছও হচ্ছে। প্রতিদিন তাদের ৮০০-১০০০ টাকা রোজগার হচ্ছে। নদী তীরের গ্রাম বোয়ালদহের আক্কাস মন্ডল বলেন, নদীতে গোসল, গবাধি পশুর গা ধোয়ানো সবই চলছে। কিন্তু আগে এই সময়ে নদীতে কোন পানিই থাকত না। তিনি বলেন, নদীর এই অবস্থা যাতে ধরে রাখা যায় সবাই যেন সেই চেষ্টা করে।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৮ সালে এ নদী পুনরুদ্ধারের লক্ষে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়। এ প্রকল্পে কাঙ্খিত ফল না আসায় বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ৯৪২কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষে শুষ্ক মৌসুমে গড়াই আবার নাব্যতা হারায়। সম্প্রতি গড়াই নদী খনন কাজ পরিদর্শনে এসে সন্তোষ প্রকাশ করে পানি সম্পদ মন্ত্রী জাহিদ ফারুক।

 

এই সংবাদটি 1,234 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •