• ২১ জানুয়ারি, ২০২২ , ৭ মাঘ, ১৪২৮ , ১৭ জমাদিউস সানি, ১৪৪৩

গোলান মালভূমি নিয়ে নতুন সংকট

প্রকাশিত এপ্রিল ৫, ২০১৯
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ২৫ মার্চ সিরিয়ায় অবস্থিত গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। গোলান মালভূমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের। ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে আরবদের পরাজয়ে সিরিয়ার গোলান মালভূমি জোরপূর্বক দখল করে নেয় দখলদার ইসরায়েল; কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশ্ব কখনো এই দখলকে মেনে নিতে পারেনি।
গোলান মালভূমি এতটা গুরুত্বপূর্ণ কেন? দক্ষিণ-পশ্চিম সিরিয়ার একটি পাথুরে মালভূমি হচ্ছে গোলান। জায়গাটা যে খুব বেশি বড় তা নয়; কিন্তু কৌশলগতভাবে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। গোলান মালভূমি থেকে মাত্র ৪০ মাইল দূরে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক শহর। তাই সিরিয়া কখনো চাইবে না ইসরায়েল এই এলাকায় কর্তৃত্ব বজায় রাখুক। তাছাড়া গোলান মালভূমি থেকে দক্ষিণ সিরিয়ার একটি বড় অংশ স্পষ্ট দেখা যায়। প্রাকৃতিক পানির একটি বড় উত্স গোলান মালভূমি। জায়গাটি বেশ উর্বরও। সুতরাং এই জায়গার দখলদারিত্ব ইসরায়েল ছাড়বে কোন দুঃখে? এখানকার ৩০টি বসতিতে প্রায় ২০ হাজার ইহুদি বসবাস করে।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইহুদিরা যখন গোলান মালভূমি দখল করে নেয় তখন সেখানে বসবাসকারি আরবেরা পালিয়ে যায়। আর কখনো তারা নিজ বাসভূমিতে ফিরে আসতে পারেনি। ১৯৮১ সালে ইসরায়েল গোলান মালভূমিকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়; কিন্তু বিশ্বের কোনো প্রান্ত থেকেই তারা নিজেদের পক্ষে সমর্থন আদায় করতে পারেনি। তা নাহলে কী হবে! তাদের আর ঠেকিয়ে রাখা গেল কোথায়! সর্বশেষ ২০১৮ সালের ১৬ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গোলান মালভূমির মালিকানা সংক্রান্ত এক ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত ১৫৩টি দেশের মধ্যে ইহুদিবাদী ইসরায়েল এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানকারী যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আর সবাই রায় দেয়, গোলান মালভূমিতে সিরিয়ার মালিকানা স্বীকৃত; কিন্তু সিরিয়া কখনো সেখানে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
ইহুদিরা নিজেদের অন্য সকল মানুষ, বিশেষ করে আরবদের থেকে নিজেদের শ্রেষ্ঠ ভেবে থাকে। ফলে জোরপূর্বক আরব ভূখণ্ড যুগের পর যুগ দখল করে রাখলেও তাদের বিন্দুমাত্র অনুশোচনা তো নেইই, বরং তারা প্রতিদিন আরবদের তাড়িয়ে তাদের জমিতে নতুন নতুন বসতি স্থাপন করে চলছে। এই ইহুদিবাদকে সরাসরি প্রশ্রয় এবং প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অথচ এই ইহুদিরাই পৃথিবীর বুকে একসময় সবচেয়ে বেশি লাঞ্ছনা ভোগ করেছে। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে খ্রিস্টানরা সংঘবদ্ধ হয়ে ইহুদি গ্রামগুলোর ওপর আক্রমণ পরিচালনা করেছে। ইতিহাসে এই জঘন্য ঘটনা প্রোগ্রাম (Program) নামে পরিচিত।
সে সময় ইহুদিরা সর্বোচ্চ পরিমাণ লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার শিকার হলেও দুটো বিষয়ের চর্চা তারা অব্যাহত রাখতে পেরেছিল। প্রথমত, তারা শিক্ষায় নিজেদের এগিয়ে নিয়েছিল বহু দূরে। দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়ী হিসেবে তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিল। ইউরোপের বুকে ইহুদিদের মধ্য থেকে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন এবং কাল মার্ক্সের মতো মনীষীর জন্ম হয়েছিল। বিতাড়িত ইহুদিরা নিজেদের স্বতন্ত্র আবাসভূমির কথা ভাবতে থাকে। তাদের এই ভাবনার পালে এসে জোর হাওয়া বইয়ে দেন হাঙ্গেরির প্রখ্যাত সাংবাদিক থিওডোর হার্জেল। তিনি জোর গলায় প্রচার করতে থাকেন, স্রষ্টার পক্ষ থেকে ইহুদিদের জন্য একটি প্রতিশ্রুত ভূমি রয়েছে। আর সেই ভূমি হলো জেরুজালেম। তার এই মতবাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে অসংখ্য ইহুদি ব্যবসায়ী ও বুদ্ধিজীবী এসে তার পাশে দাঁড়ালেন। ফলে শুরু হয়ে যায় জায়নবাদী আন্দোলন। দলে দলে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে এসে ভূমি ক্রয় করে বসবাস করতে থাকে।
প্রথমদিকে আরবের জনগণ ইহুদিদের আশ্রয় প্রদান করে এবং তাদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু যখন তারা দেখল, ইহুদিরা ব্যাপক হারে তাদের ভূমিতে প্রবেশ করছে এবং দিনদিন আরবরা নিজেদের মাটিতে সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে তাখনই তারা বিরোধিতা শুরু করল। কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে গেছে ঢের। ইতোমধ্যে বিশ্ব রাজনীতিতে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পাশাপাশি হেরে যায় অটোমান সাম্রাজ্য। ফিলিস্তিন অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে শাসিত হয়ে আসছিল। অটোমানদের পতনের পর ব্রিটেন ফিলিস্তিনের শাসনভার গ্রহণ করে। যেহেতু ব্রিটিশরা আগে থেকেই ইহুদিদের ফিলিস্তিনের ভূমিতে বসবাসের অনুমতি প্রদান করে, তাই এবার কয়েক লাখ ইহুদি প্রবেশ করে ফিলিস্তিনে। নতুন করে শুরু হয় সংঘাত; ঝরতে থাকে অগণিত নিরীহ মানুষের রক্ত। আজও এই রক্তপাত অব্যাহত রয়েছে।
মুসলমান, খ্রিস্টান এবং ইহুদি এই তিন সম্প্রদায়ের কাছেই জেরুজালেম পবিত্র ভূমি বলে বিবেচিত। ইহুদিবাদী ইসরায়েল মুসলমানদের জন্য তাদের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাস বন্ধ করে রেখেছে। শুধু তাই নয়, অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে লাখো নিরীহ মুসলমানকে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না জাতিসংঘসহ কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা। এর কারণ হলো, তাদের পেছনে রয়েছে মহা শক্তিধর আমেরিকা। আমেরিকার অর্থনীতির একটা বড় অংশ ইহুদিদের দখলে রয়েছে। সুতরাং তারা চাইলেও সহজে এই মিত্র দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে না।
গোলান মালভূমি ঐতিহাসিকভাবে সিরিয়ার অংশ। যুক্তরাষ্ট্র একক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কখনোই তা ইসরায়েলের বলে স্বীকৃতি দিতে পারে না। তাই এর সমাধান হওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে সবার আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা একমাত্র তাদেরই আছে।
লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

এই সংবাদটি 1,228 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •