গ্রাম-বাংলার পুরাতন ঐতিহ্য

প্রকাশিত:বুধবার, ০৬ অক্টো ২০২১ ০৯:১০

গ্রাম-বাংলার পুরাতন ঐতিহ্য

রফিকুর রহমান লজু
গ্রাম-বাংলার পুরাতন ইতিহাস-ঐতিহ্য আর নানা রকম গ্রাম্য শিল্প এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না। প্রায় হারিয়ে গেছে এইসব শিল্প আর লোকজ ঐতিহ্য। গ্রাম-বাংলার এক সময়ের সমৃদ্ধ শিল্প ইতিহাস ধরে রাখার স্বার্থে ঐগুলো বাঁচিয়ে রাখা দরকার। এইরূপ শিল্পের মধ্যে উল্লেখ করা যায় # ঘাইলছিয়া # ঢেকি # পাটা-পোতাইল # মুর্তা বেত ও গল্লা বেতের বিভিন্ন সামগ্রী # টুকরি # খলই # ধুছইন ঃ

বাঙালি মা-বোনদের পাকঘর-রান্নাঘর এখন প্লাস্টিক সামগ্রী দখল করে নিয়েছে। প্লাস্টিকের সহজলভ্যতা ও টেকসই সামগ্রি হাতের তৈরি লোকজ নানা শিল্পদ্রব্যকে গিলে ফেলছে। ফলে লোকজ শিল্প সামগ্রির কারিগর ও শিল্পীরা বেকার হওয়ার পথে এবং কাজ না থাকায় বেকার হয়ে হাত-পা গুটিয়ে ঘরে বসে থেকে অকর্ম্ম্য হয়ে পড়ছেন। লোকজ ঐতিহ্যবাহী শিল্পের কারিগর ও নির্মাতাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে, তাদের দক্ষ হাতকে চালু রাখতে হবে। এগুলো হারিয়ে গেলে আমাদের এককালের সমৃদ্ধ গ্রাম্য ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির অনেক কিছু হারিয়ে যাবে। আমাদের নিজেদেরই স্বার্থে এই সংস্কৃতি ধরে রাখতে হবে। শুধুমাত্র পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হাজার বছরের প্রাচীন বাংলার লোকজ ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে পারে না।
ঘাইল-ছিয়া ঃ
চিরায়ত বাংলার হাজার বছরের প্রাচীন লোকজ ঐতিহ্য ঘাইল-ছিয়া। সমাজকে কাঠশিল্পীদের একটি অপূর্ব উপহার ঘাইল ছিয়া। এই ঘাইল ছিয়া সাদামাটাও থাকে আবার কারুকাজমন্ডিতও থাকে। ঘাইল-ছিয়া বিভিন্ন কাজে লাগে। ধান ভানতে ঘাইল-ছিয়া লাগে। ঘাইল-ছিয়া দিয়ে ধান ভানতে বেশি সময় লাগে। চিড়া কুটতে ঘাইল-ছিয়া ভালো ফল দেয়। প্রধানত মহিলারাই ঘাইল-ছিয়া ব্যবহার করে। চিড়া কুটতে ৩-৪ জন মহিলা লাগে। ঘাইল মধ্যখানে রেখে দুইজন মহিলা দুইদিকে ছিয়া হাতে দাঁড়ায়। একজন চুলা বা উনুনে ভিজা ধান ভেজে ঘাইলে ছাড়েন। দুইজন মহিলা একসঙ্গে ধান কুটতে থাকেন। তারা ছিয়া দিয়ে ধানকে আঘাত করতে থাকেন। তখন ধান চেপ্টা হয়ে চিড়া হয়ে যায়। ঘাইল থেকে ঢেলে ঝেড়ে নিলে ফ্রেস চিড়া পাওয়া যায়। এই চিড়া তৎক্ষণাত খেতে আলাদা স্বাদ পাওয়া যায়।
ঘাইল-ছিয়া দিয়ে চালের গুড়ি তৈরি হয়। এই গুড়ি দিয়ে নানা রকম পিঠা তৈরি করা যায়। চৈ পিঠা, ভাপা পিঠা, নারকেল পিঠা হয়। এই গুড়ি দিয়ে খুব মজার রুটি পিঠা হয়। অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে নতুন ধান উঠার পর গ্রামে চিড়া পিঠা তৈরির ধুম পড়ে। চৈ পিঠা মধু দিয়ে খেতে অপূর্ব স্বাদ পাওয়া যায়।
ঢেকি ঃ
শহর গ্রামে আজকাল আর ঢেকির নাম শোনা যায় না। অতীতে ধান থেকে চাল করার প্রধান অবলম্বনই ছিলো ঢেকি। ঢেকি বা ঘাইল-ছিয়া দিয়ে মশলাও করা হতো। ঢেকি একজন মহিলায় চালাতে পারে। একজনে চালাতে বেশি পরিশ্রম হয়। তাই দু’জন একসঙ্গে পা দিয়ে ঢেকি মারেন। দু’জন হলে একজন ডান পা ও অন্যজন বাম পা ব্যবহার করেন। গ্রামাঞ্চলে এক সময় মেয়ের বিয়েতে ঘাইল-ছিয়া উপহার দেওয়ার রেওয়াজ ছিলো।
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নের খুশবাস গ্রামের শত মানুষ এক সময় ঘাইল তৈরির কাজ করতেন। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এ শিল্প এখন আর দেখা যায় না।
পাটা-পোতাইল ঃ
এই শিল্পের নির্মাতারা বড় বড় পাথর কেটে পাটা-পোতাইল তৈরি করেন। পাটা-পোতাইল শিল্প তৈরি খুব কঠিন। পাহাড়ের শক্ত পাথর কেটে পাটা-পোতাইল তৈরি করা হয়। পরে এটাকে আরো সংস্কার করে ধার দিতে হয়। ধার দেওয়ার পর পাটা ব্যবহার উপযোগী হয়। ঘরের মা-চাচীর সঙ্গে পাটা-পোতাইলের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে আর তাই পাটা-পোতাইলের স্থান হয় একেবারে অন্দরে রান্নাঘরে পাকঘরে। রান্নার মরিচ-হলুদ-আদা-পেয়াজ-বাখর পাটা-পোতাইলে মিহি করে পিষা হয়। এই পিষা মশলা দিয়ে রান্না অধিকতর মজাদার হয়। চাল ভিজিয়ে পিষে বা গুড়ি করে নানা রকম পিঠা তৈরি করা হয়। মজাদার চিতল পিঠা পিশা চাল ছাড়া তো হয়ই না। শুটকির চাটনি হিদল শুটকি-নাগামরিচ-ধনিয়াপাতা-লবণ পাটা-পোতাইলে পিষে তৈরি করা হয়। নাগার ঝালে চোখে পানি এলেও তা দিয়ে ভাত খেতে আলাদা স্বাদ পাওয়া যায়। গ্রামাঞ্চলে মেহনতি শ্রমিক শুধুমাত্র সিদল শুটকি ভর্তা দিয়ে পেট ভরে ভাত খায়। শহরে কখনো কখনো অভিজাত পরিবারে সিদল চাটনি বা ভর্তা খাওয়া হয়। কাঠাল বিচি পুড়ে পাটা-পোতাইলে ভেঙ্গে গুড়া করে ঝাল মরিচ দিয়ে ভর্তা বানালে ভাত খেতে আহামরি স্বাদ লাগে।
মুর্তাবেত ও গল্লা বেতের সামগ্রি ঃ
এটা আরেক ধরণের লোকজ ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প। কাঠের বা প্লাস্টিকের শিল্পের রাজত্বের মধ্যেও বাঁশ-বেতের সামগ্রি চালু আছে। এই শিল্প সগৌরবে ও সদর্পে এখনো টিকে আছে। এই শিল্পের সঙ্গে শত শত শ্রমিক যুক্ত আছে। সিলেটের শেখঘাট খুয়াইপাড়া, দক্ষিণ সুরমা, বালাগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে বেত শিল্প টিকে আছে।
ডুবা জলাশয়ে মুর্তা জন্মে। বিনা যত্নেই মুর্তা জন্মায়। এই মুর্তা চিরে বেত বের করা হয়। গল্লাবেত জঙ্গলে, টিলা-পাহাড়ে জন্মে। গল্লাবেত কাটায় ভরা থাকে। কাটাওলো খোলস ছাড়াতে বেশ কষ্ট হয়। গল্লাবেত মুর্তাবেত দিয়ে পাটি তৈরি হয়। গল্লাবেতের নকশি পাটি খুব প্রসিদ্ধ। গল্লাবেত দিয়ে চেয়ার, টেবিল, মোড়া প্রভৃতি তৈরি করা হয়। এগুলো বিদেশেও রপ্তানি করা হয়।
টুকরি-খলই-ধুছইন ঃ
বাঁশের বেত দিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি করা হয়। বিশেষ করে রান্নাঘরের দরকারি জিনিস যেমন টুকরি, ধুছইন, খলই, কুলা, ডালা, চাইন বানানো হয়। এছাড়া মাছ মারার পলো, ডরি, কুকা, বিছইন, হেওয়ত প্রভৃতি তৈরি হয়।
এছু ঃ
পুকুর-ডুবায় ও কম পানির জলাশয়ে মাছ ধরার এক রকম যন্ত্র এছু। বাঁশের বেত দিয়ে এছু তৈরি করা হয়। জালের মতো ঠেলে ঠেলে এছু চালাতে হয়।

এই সংবাদটি 1,226 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •