জলোচ্ছ্বাসের পানিতে সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে শিশুরা

প্রকাশিত:বৃহস্পতিবার, ০৩ জুন ২০২১ ১২:০৬

জলোচ্ছ্বাসের পানিতে সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে শিশুরা

নিউজ ডেস্কঃ  উপকূলে আগে ঘূর্ণিঝড় হলে ঘরচাপায়, গাছচাপায় ও নানাভাবে অনেক প্রাণহানি হতো। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় আম্পান থেকে এই প্রবণতা বদলে অধিক উচ্চতার জোয়ারের পানিতে মানুষের মৃত্যু বেড়েছে। এর প্রধান শিকার হচ্ছে শিশুরা।

২৬ মে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে ঝোড়ো বাতাসের তাণ্ডব না থাকলেও দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ১২ জনের প্রাণহানির বিষয়টি অনেকটা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। ওই ঝড়ের দৃশ্যমান তাণ্ডব না থাকলেও উপকূলে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে জোয়ারের পানিতে ডুবে। একজনের মৃত্যু হয়েছে গাছচাপায়। পানিতে ডুবে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৯টিই শিশু, যাদের বয়স আড়াই থেকে সাত বছরের মধ্যে। বাকি দুজন পূর্ণবয়স্ক। তাঁদের একজন নারী ও অন্যজন তরুণ।

দুর্যোগ প্রশমন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এটা অবশ্যই নতুন অভিজ্ঞতা। ঝড়ের তীব্রতা ছাড়াই ১১ জনের মৃত্যু হলো শুধু পানিতে ডুবে। এটা অবশ্যই ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। তাঁরা বলছেন, এবার ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হওয়ার পর এর গতিপথ ভারতের ওডিশার দিকে থাকায় দেশে আবহাওয়ার সতর্কসংকেত ৩ নম্বরে ছিল। এ জন্য অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্রে যাননি। কিন্তু আবহাওয়া বিভাগ শুরু থেকেই এর প্রভাবে জলোচ্ছ্বাসের সংকেত প্রচার করছিল। এই ঝড় শিখিয়ে গেল, ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ যেদিকেই থাকুক না কেন, জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিটা ভবিষ্যতে ঝড়ের চেয়ে মারাত্মক হবে।

দেশের উপকূলে এক দশক ধরে জোয়ারের উচ্চতা বাড়ছেই। আর এতে ঝড়ের চেয়েও বাড়ছে জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি। কিন্তু জলোচ্ছ্বাসের ব্যাপারে আলাদা কোনো সংকেত প্রচারের ব্যবস্থা নেই।

জানতে চাইলে বরিশাল আবহাওয়া অধিপ্তরের জ্যেষ্ঠ পর্যবেক্ষক আনিসুর রহমান বলেন, জলোচ্ছ্বাসের ব্যাপারে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। একদিকে পূর্ণিমার জোতে জোয়ারের উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল, অন্যদিকে চন্দ্রগ্রহণও ছিল এবং সঙ্গে ছিল পুবালি বাতাস। ফলে
আগে থেকেই অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা ছিল এবং হয়েছেও তা–ই।

বাংলাদেশে প্রতিবছরই ঝড়–জলোচ্ছ্বাস হয়। কিন্তু এবার ঝড় এবং ঝড়–পরবর্তী জলোচ্ছ্বাসে এত শিশুর মৃত্যু নিকট অতীতে আর দেখা যায়নি। পানির তোড় থেকে বাঁচতে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার সময় হুড়োহুড়িতে মায়ের কোল থেকে ইমামুল নামের ‍তিন বছরের এক শিশু ছিটকে পড়ে ভেসে যায়। ঘণ্টাখানেক পর বরগুনার বেতাগী উপজেলার এই শিশুর লাশ মেলে। ২৬ মে সকালে ও বিকেলে বাড়ির পাশের খোলা জমিতে জোয়ারের পানিতে খেলতে গিয়েছিল বাকেরগঞ্জের তিন বছর বয়সী দুই শিশু সুমাইয়া ও আজওয়া। পরে তাদের লাশ পানিতে ভাসতে দেখা যায়। ২৭ মে দুপুরে পটুয়াখালীর দুমকীর সন্তোষদিচর এলাকার হাসিনা (৫৫) লোহালিয়া নদীর পাড়ে হোগলাপাতা কাটতে গেলে তীব্র স্রোতে ভেসে মারা যান। একই দিন দুপুরে কলাপাড়া উপজেলার টিয়াখালী ইউনিয়নে ছায়েবা (৯) নামের আরেক শিশু জোয়ারের পানিতে ডুবে মারা যায়। ঝালকাঠির রাজাপুরে ২৬ মে জোয়ারের পানিতে ডুবে সিয়াম (৮), সামিয়া (৪) নামের দুই শিশু মারা যায়। ২৬ মে লিমা আক্তার (৭) নামের হাতিয়ারচরের আমানউল্লাহ গ্রামের ওই শিশু জোয়ারের পানিতে ভেসে নিখোঁজ হলে দুই দিন পর লাশ উদ্ধার হয়। একইভাবে জিনিয়া আক্তার (৪) নামের অন্য এক শিশুর মৃত্যু হয় বাগেরহাটে। ২৬ মে জোয়ারের পানিতে ভেসে যায় জিনিয়া। ফেনীর সোনাগাজীতে পোনামাছ ধরতে গিয়ে জোয়ারে ভেসে গিয়ে মারা যান হাদিউজ্জামান (৪৫) নামের এক জেলে। ২৭ মে পাথরঘাটা উপজেলার কালমেঘা ইউনিয়নের লাকুরতলা গ্রামে জোয়ারের পানিতে ডুবে মারা যায় দেড় বছরের শিশু আবু বকর।

গত বছরের ২০ মে আম্পানের সময়ও মেহেন্দীগঞ্জে দুই শিশু এবং চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে গরু চড়াতে গিয়ে অধিক উচ্চতার জোয়ারের পানিতে ডুবে সালাউদ্দিন নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছিল।

ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতিকেন্দ্রের বরিশাল আঞ্চলিক উপপরিচালক মো. শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, অধিক উচ্চতার জোয়ার, বাঁধ না থাকা এবং নাজুক বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়া উপকূলে একটি বড় সমস্যা। বাঁধগুলো যদি দ্রুত মেরামত কিংবা জোয়ারের পানি রোধ না করা যায়, তবে যেকোনো ঝড়, এমনকি সামনের অমাবস্যা-পূর্ণিমার জোয়ারও বেশ ভোগাবে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) পরিচালক আমিনুর রহমান বলেন, এ ক্ষেত্রে শিশুদের সাঁতার শেখা, পরিবারের সচেতনতা এবং সরকারিভাবে বিষয়টি প্রতিরোধে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

এই সংবাদটি 1,229 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ