তরুণদের পাথেয়

প্রকাশিত:বৃহস্পতিবার, ০৭ অক্টো ২০২১ ০৯:১০

তরুণদের পাথেয়
ইসলামিক ডেস্কঃ

মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাবান সময় যৌবনকাল। এ সময় যেমন সব বাধা সহজেই মোকাবিলা করা যায় তেমনি দিগ্ভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে। তাই এই তরুণদের প্রতি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষভাবে যতœশীল ছিলেন এবং সুপরিকল্পিতভাবে তাদের বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। যা তরুণদের জন্য চলার পথে আলোকবর্তিকাসম।

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) তরুণদের ইমান, আমল ও আখলাক নিয়ে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি যুবকদের কার্যক্ষমতা ও আত্ম উন্নয়নের পাশাপাশি আকিদায় শক্তিশালী হতে উৎসাহিত করেছেন। হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) কে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে মুয়াজ, তুমি কী জানো বান্দার ওপর আল্লাহর অধিকার কী এবং আল্লাহর ওপর বান্দার হক কী? তারপর তিনি বললেন, ‘বান্দার ওপর আল্লাহর অধিকার হচ্ছে, সে আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত করবে না, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না। আর বান্দার হক হলো যদি তারা নিজেদের শিরক করা থেকে হেফাজত করে তাহলে আল্লাহ তাদের জাহান্নাম থেকে নিরাপদ রাখবেন।’ সহিহ্ বোখারি : ৬৫০০

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) যুবকদের বেশি বেশি আমল ও ইবাদতের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং বলেছেন, ‘তরুণ বয়সের ইবাদতকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। একজন বৃদ্ধের ইবাদতের চেয়ে আল্লাহ বেশি খুশি হন, সে তরুণ ও যুবকদের ইবাদতে যারা যৌবন বয়সে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকে।’ আবু দাউদ

তরুণদের নিজেদের সৎ ও চরিত্রবান করে গড়ে তুলতে রাসুলুল্লাহ (সা.) জোর তাগিদ দিয়েছেন। তারাই প্রকৃত সফলকাম, যারা বয়ঃসন্ধিক্ষণে যৌবনের উন্মাদনা থেকে নিজেদের সম্ভ্রমকে বাঁচিয়ে রাখবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। তাদের এই দুনিয়ার চাওয়া-পাওয়ার চেয়েও অনেক বেশি নিয়ামত দিয়ে সম্মানিত করার ওয়াদা স্বয়ং আল্লাহতায়ালা করেছেন। সম্ভ্রম হেফাজতের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) যুবকদের দৃষ্টি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন ও দ্রুত বিয়ের তাগিদ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে যুবসমাজ! তোমাদের বিয়ে করা উচিত। কেননা, এটা দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সুরক্ষিত রাখে। আর তোমাদের যে লোকের বিয়ের সামর্থ্য নেই সে যেন রোজা রাখে।’ ইবনে মাজাহ : ১৮৪৫

যৌবনকাল একজন মানুষের জীবনের স্বর্ণযুগ ও নেক আমলের মুখ্য সময়। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) তাই যুবকদের তারুণ্যের সর্বোৎকৃষ্ট সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর আদেশ করেছেন। বলা হয়েছে, ‘… তোমরা যৌবনকে কাজে লাগাও বার্ধক্য আসার আগেই।’ সহিহ্ বোখারি ও মুসলিম

তাই তরুণদের উচিত নেয়ামত থাকা অবস্থায় এর সঠিক ব্যবহার করা এবং নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা। এ ছাড়া হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) হুঁশিয়ার করেন, ‘কিয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ছাড়া কোনো আদম সন্তান আল্লাহর সামনে থেকে পা সরাতে পারবে না। … তার জীবনকে কোথায় ব্যয় করেছে। তার যৌবনকে কোথায় ক্ষয় করেছে।’ সুনানে তিরমিজি : ২৪১৬

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) তরুণদের আরও বেশ কিছু উপদেশ দিয়েছেন। যা তাদের পথচলার অন্যতম পাথেয়। সেগুলো হলো

 পৃথিবীতে আল্লাহর পর সবচেয়ে বেশি সম্মানিত মা-বাবা। মা-বাবার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাদের অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি। তারাই আমাদের জান্নাত এবং জাহান্নাম। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তার নাক ধুলায় ধূসরিত হোক, যে বৃদ্ধ অবস্থায় তার মা-বাবা দুজনকে পেল অথবা তাদের একজনকে। কিন্তু (তাদের খেদমত করে) নিজের জন্য জান্নাতের পথ সুগম করতে পারল না।’ সহিহ্ মুসলিম : ২৫৫১

তাই তরুণদের অবশ্যই শত কাজের মধ্যেও মা-বাবার সর্বাত্মক সেবায় যতœশীল হতে হবে।

 নামাজের ব্যাপারে যতœশীল হওয়া এবং সময়মতো নামাজ আদায় করা। কেননা, নামাজ মন্দ ও অশ্লীল কাজ থেকে দূরে রাখে। বিচার দিনে সবার আগে নামাজের হিসাব নেওয়া হবে।

 ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া খেল-তামাশার তুচ্ছ ফাঁদ। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর থেকে তরুণদের সতর্ক থাকতে বলেছেন এবং সবকিছুর থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তোষকে প্রাধান্য দিতে আদেশ করেছেন। হারাম থেকে বেঁচে থাকা, তা যতই চিত্তাকর্ষক হোক না কেন। অপরদিকে, হালাল উপার্জন বরকতেপূর্ণ যদিও তা পরিমাণে কম।

প্রতিনিয়ত আত্মসমালোচনা করা যাতে করে আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর আগেই নিজের ভুলগুলো শুধরানোর সুযোগ পাওয়া যায়।

 কাউকে উপদেশ দেওয়ার আগে নিজে সেটা করে দেখানো। যে মানুষ অন্যকে উপদেশ দেয় কিন্তু নিজে সেটা পালন করে না তার শাস্তি ভয়ানক।

 কোনো খারাপ কাজকেই ছোট করে না দেখা। কেননা, শেষ বিচারের দিনে আল্লাহতায়ালা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সব কাজেরই হিসাব নেবেন।

 কোনো কাজে দীর্ঘসূত্রতা না করা। কারণ আগামীকাল সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। তাই বর্তমান মুহূর্তকে শেষ সময় মনে করে পুরোপুরি কাজে লাগানো।

 গিবত থেকে দূরে থাকা। কেননা, যার গিবত করা হয়েছে সে ক্ষমা না করলে, আল্লাহতায়ালাও ক্ষমা করবেন না।

 আল্লাহর কাছেই সবকিছু চাওয়া, যদি সেটা জুতার ফিতার মতো তুচ্ছ জিনিসও হয়। কেননা, একমাত্র আল্লাহই দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।

 সুখের সময় আল্লাহকে স্মরণ করা, ভুলে না যাওয়া। তাহলে খারাপ সময়েও আল্লাহকে কাছে পাওয়া যাবে। আর সব অবস্থায় আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা এবং তকদির বিশ্বাস করা।

 বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ করা থেকে বিরত থাকা। যার জন্য মুসলিম যুবসমাজ আজ ধ্বংসের পথে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) হুঁশিয়ার করেন, ‘সে ব্যক্তি আমার দলভুক্ত নয় যে ব্যক্তি আমাদের ছেড়ে অন্য কারও সাদৃশ্য অবলম্বন করে। তোমরা ইহুদিদের সাদৃশ্য অবলম্বন করো না আর খ্রিস্টানদেরও না।’ তিরমিজি : ২৬৯০

 তরুণদের মদ, জুয়াসহ সবরকম নেশাজাতীয় দ্রব্য ও গান, বাদ্য-বাজনার মতো হারাম থেকে দূরে থাকতে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আদেশ করেছেন, ‘অবশ্যই আল্লাহতায়ালা আমার উম্মতের জন্য মদ, জুয়া, ঢোল, তবলা ও বীণা জাতীয় বাদ্যযন্ত্রকে হারাম করেছেন।’ আহমাদ : ১৭০৮

কেননা এখনকার যুবকদের চরিত্র হননের অন্যতম হাতিয়ার এসব নিষিদ্ধ জিনিস। যার ছোবল থেকে আমাদের মুসলিম যুবকরাও আজ নিরাপদ নেই।

আমাদের মুসলিম তরুণরা আজ দিশেহারা। কারণ তাদের নেই পূর্বসূরিদের মতো হৃদয় যা আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থায় পরিপূর্ণ, রাসুলের সুন্নত অনুসরণে স্পর্শকাতর এবং নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু আল্লাহতায়ালা যুবকদের দৈহিক শক্তি উদ্ভাবনী মেধা ও চিন্তা-ফিকির করার যোগ্যতা অনেক বেশি দিয়েছেন। দৃঢ় মনোবল, ধৈর্য, তাকওয়া, তাওয়াক্কুল ও তাকদিরে বিশ্বাসের যথাযথ সমন্বয়ের পাশাপাশি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী এই সুবর্ণ সময়ের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারলেই আমাদের মুসলিম যুবকরা সঠিক পথের দিশা পাবে।

এই সংবাদটি 1,232 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •