তরুণ সমাজের আইকন অপু

প্রকাশিত:বুধবার, ০৪ অক্টো ২০১৭ ০২:১০

তরুণ সমাজের আইকন অপু

শরীফুল ইসলাম অপু। এই নামটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ফেনীর হাজারো তরুণের সম্পর্ক। তারুন্যই তার শক্তি। একাধারে ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়া সংগঠক, সমাজকর্মী, ক্রীড়া সাংবাদিক, বহুবিধ পরিচিতি। সর্বক্ষেত্রে যিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়ে থাকেন। কিন্তু কী করে এ তরুণ ও তারণ্যের জন্ম হলো-সেটা হয়ত খুব মানুষই জানেন।

 

নতুন ফেনী অনুসন্ধানে সে বিষয়টি উঠে এসেছে। শোনা যাক এই তরুনের উত্থানের কাহিনী। পৈত্রিক গ্রাম ফেনী সদর উপজেলার কাজিরবাগের পশ্চিম সোনাপুর হলেও বড় হয়েছেন ফেনী শহরের পুর্ব ডাক্তার পাড়াস্থ নুরুজ্জামান উকিল সড়ক এলাকার মজুমদার ভবনে। বাবা হুমায়ুন কবির মজুমদার ছিলেন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী আর মা রোকেয়া কবির একজন আদর্শ গৃহীনি। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে অপু জেষ্ঠ্য।

 

শৈশবের অনেকটা সময় কেঁটেছে খেলাধুলা আর ক্রিকেট মাঠে, ক্রিকেট আর ক্রিকেট। কখনো ফেনী পাইলট হাইস্কুল মাঠ, কখনো ডাক্তারপাড়া গার্লস স্কুল মাঠ, আর কখনো শহরে অলিগলির বিভিন্ন মাঠে খেলাধুলায় ব্যাস্ত থাকতেন। হাতে বল-ব্যাট, মাথায় ক্যাপসহ ক্রিকেট সরাঞ্জামগুলো ছিলো যার ধ্যান জ্ঞান। সপ্তম শ্রেণিতে থাকাকালিন ক্রিকেট আয়োজকের খাতায় নাম লেখান অপু। শহরে বিভিন্ন পাড়া ক্রিকেট টিমদের আমন্ত্রণ করে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করেন। মোটকথা, ক্রিকেটে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন অপু। তার মানে শৈশবে কি আর কোন স্বপ্ন ছিল না অপুর। বললেন, মধ্যবিত্ত পরিবারে ছেলেরা যেসব স্বপ্ন দেখতে আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম ছিলন। ছোটবেলা অনেক স্বপ্ন দেখতাম, কখনো ফিল্ম দেখে মনে হতো ফিল্ম স্টার হব, খেলোয়াড়দের খেলতে দেখলে মনে হতো দক্ষ খেলোয়াড় হব, সাংবাদিক দেখলে মনে হতো সাংবাদিক হব। কখনোবা ভালো ব্যাবসায়ী হওয়ার চিন্তা ছিলো। বিশেষ করে টিভি উপস্থাপকদের দেখলে উপস্থাপক হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। এ পেশা নিয়ে আমার এখনো আকাঙ্খা রয়েছে। কিন্তু এসব কিছুই পরবর্তী জীবনে আমাকে স্পর্শ করেনি। সবচেয়ে বেশি টানতো ক্রিকেট। কারণ, ক্রিকেটই ছিলো আমার ধ্যান জ্ঞান।

 

ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নটা বড় ছিলো- কিভাবে এ স্বপ্ন বড় হতে লাগলো শুনুন অপুর মুখ থেকে। যখন ফেনী পাইলট স্কুলে পড়ি ফেনী ক্রিকেটে তখন একজন আলোচিত নাম ছিলো আবুল কালাম আজাদ। যিনি স্বনামধন্য কোচ ও ক্রিকেটে অলরাউন্ডার ছিলেন। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং সর্বক্ষেত্রে দক্ষ। বাম হাতে বল করতেন, যাকে ফেনীর ওয়াসিম আকরাম হিসেবে আখ্যায়িত করা হত। তাকে দেখেই অনুপ্রাণিত হতাম। মনে হতো তাঁর মতো ক্রিকেট খেলতে পারতাম, তাঁর সাথে কথা বলার সাহস হতনা, যখনই তিনি ফেনী কলেজ মাঠে খেলতে নামতেন যেখানেই থাকিনা কেন তাঁর খেলা দেখতে সব ছেড়ে চলে আসতাম। তখন আমি সব ধরনের ক্রিকেট খেলি, পাড়ার ক্রিকেট থেকে শুরু জেলা পর্যায়ের সব ধরনের ক্রিকেট। একটা সময় ফেনী জেলা অনুর্ধ্ব-১৭ তে আমি খেলেছি। বোলার হিসেবে আমি ভালো খেলতাম। প্রচণ্ড উৎসাহ নিয়ে খেলতাম। কিন্তু এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে থাকাকালিন ক্রিকেট খেলতে গিয়ে আকস্মিকভাবে আমি দূর্ঘটনার শিকার হই। আমার ডান হাত ভেঙ্গে যায়, তখন থেকে ধীরে ধীরে আমি খেলাধুলা ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। স্তিমিত হয়ে গেলো আমার স্বপ্ন। কিন্তু তাপরও আমি ক্রিকেট ছাড়তে পারিনি। ভিন্নভাবে নিজেকে উপস্থাপনের চেষ্টা করলাম। আর তাই ক্রিকেটের সাথে নিজেকে অঙ্গাঅঙ্গি জড়িয়ে ফেলি।

 

দক্ষ এ সংগঠক ২০০৪ সালে ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করেন। পর্যায়ক্রমে ২০০৬ সালে ফেনী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসচি ও ২০১২ সালে সমাজকর্ম বিভাগ থেকে অনার্সে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। পরে ২০১৪ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাস্টার্স এবং এবং ২০১৭ সালে ফেনী ‘ল’ কলেজ থেকে এলএলবি পাশ করে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার ইতি টানেন। ২০১৩ সালে ২৬ ডিসেম্বর ফারহান সারোয়ার শান্তুর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বর্তমানে তিনি ওয়াসিল শরীফ মজুমদার ইবাদ নামে একজন পুত্র সন্তানের জনক।

 

স্বপ্নবাজ এ তরুণ অনেকগুলো সংগঠনের সাথে জড়িত। সাধারণ সম্পাদক ফ্রেন্ডশীপ ক্রিকেট ক্লাব, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ‘এপপিএল ফেনী প্রগ্রেসিভ (লিংক)’, সাধারণ সম্পাদক ‘ফেনী জেলা ক্রিকেট আম্পায়ার ও স্কোরার এসোসিয়েশন’, সভাপতি ফেনী কলেজ সমাজকর্ম ‘এলামনাই এসোসিয়েশন’ ছাড়াও সাবেক সভাপতি রোটারেক্ট ক্লাব অব ফেনী সেন্ট্রাল। বর্তমানে তিনি রোকেয়া এন্ড সন্স ও বনিটো কমিউনিকেশন’র চ্যানেল টার্পনার জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন।

 

কালচারাল অঙ্গনেও রয়েছে এই তরুনের পদচারনা। নজরুল একাডেমি ফেনীর সদস্য, ‘ফেনীর ঢোল’ নাম সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মকাণ্ডের সাথেও জড়িত। এ বিষয়ে অপু জানান, সংস্কৃতি মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। একটি জাতির পরিচয়। তাই সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে নিজেদের পরিচয়টা বিশ্বের দরবারে তুলেতে পারলে তবে আমরা জাতি হিসেবে অনেক দুর এগিয়ে যেতে পারবো। এতে কোনো সন্দেহ নেই।

 

ক্রিকেট সংগঠক কিংবা ক্রিটেক কোচ হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডসহ (বিসিবি) বেশ কয়েকটি প্রশিক্ষণে অংশ নেন তিনি। ২০১০ এবং ২০১৫ সালে ডিভিশনাল ক্রিকেট আম্পায়ার ক্রিকেট কোর্স ও ২০১৬ সালে ‘রোটারেক্ট লিডারশীফ’ ট্রেনিংসহ অনেকগুলো প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। আন্তর্জাতিক সেবা সংগঠন রোটারেক্ট ক্লাব’র ডিষ্ট্রিক পর্যায়ে নের্তৃত্ব প্রদানসহ এ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অসংখ্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে ‘ফেনী ক্রিকেট ইনস্টিটিউশন’ নামে একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলেন। সেখান থেকে প্রাথমিভাবে উঠে আসে জাতীয় দলের অলরাউন্ডার সাইফুদ্দিন।

 

স্বপ্ন ছাড়া কি আর মানুষে বাঁচতে পারে? সবারই ভবিষ্যতে হরেক রকমের স্বপ্ন থাকে। শরীফুল ইসলাম অপুরও ভবিষ্যতে কিছু স্বপ্ন রয়েছে। ভবিষ্যৎ স্বপ্ন সর্ম্পকে জানতে চাইলে তিনি ‘নতুন ফেনী’কে জানান, ফেনীকে আমি আমার পক্ষ থেকে ব্রান্ডিং করতে চাই, আমার যতগুলো ক্ষেত্র আছে সবগুলো থেকে চেষ্টা করছি এ কাজটি করার জন্য। তারই ধারাবাহিকতায় একটি ভিন্ন রকমের স্কুল প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করছি। যাতে করে আমাদের ফেনীর ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সংগঠিত করে প্লাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তারা উন্নত প্রশিক্ষণ নিয়ে যাতে তারা দক্ষ একজন উদ্যোক্ত হিসেবে গড়ে তুলতে এ প্রতিষ্ঠান কাজ করবে।

 

‘দেখা হবে বিজয়ে’ নামে একটি ক্যারিয়ার ও কমিউনিটি ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান চালু করতে নিরলসভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তরুন এ সংগঠক। বিষয়টি পরিচর্যার মাধ্যমে তুলে ধরতে পারলে অনেক সৃজনশীল কাজে পেশাদারিত্বে ছোঁয়া পাবে। তিনি আরো বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে ক্রীড়াক্ষেত্রে অবদানের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য বিভিন্ন সময় স্মারক লাভ করেছি। ক্রীড়া বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে লেখালেখি করে আসছি। ফেনীর ক্রীড়ার সমস্যা ও উন্নয়ন গণমাধ্যমে তুলে আনার চেষ্টা করছি। এটিকে আরো জোরালো করতে চাই। আমার নিজস্ব আপন ইভেন্টস নামে একটি অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনার প্রধান হিসেবে কাজ করছি।

 

 

এই সংবাদটি 1,243 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •