দক্ষতার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে আসছে প্রতিবন্ধী নারী

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual1 Ad Code

নিউজ ডেস্কঃ 

চুমকি বিশ্বাস মিতা একজন নারী উদ্যোক্তা। জড়িত আছেন ‘অংকুর হ্যান্ড্রিক্রাফ্ট’-এর সঙ্গে। এই প্রতিষ্ঠানের এমব্রয়ডারি করা পণ্য দেশের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে যাচ্ছে ফ্রান্স, জাপান ও জার্মান বেলজিয়াম। অংকুরের সঙ্গে জড়িত আছেন ৪০ জন কর্মী। এদের ২৫ জন প্রতিবন্ধী এবং ৬ জন গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পরিবারের সদস্য।

মিতা নিজেও একজন প্রতিবন্ধী হয়ে কাজ করছেন নিজের আর প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জীবনমান উন্নয়নে। আফিয়া কবির আনিলা কাজ করছেন একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায়। সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত আনিলা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না। একটি হুইল চেয়ার ও একজন সঙ্গী লাগে তার। তারপরও মূলধারার স্কুলের পড়া শেষ করে দেশের একটি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার পাশাপাশি চাকরি করছেন।

চাকরি করার জন্য তাদের সর্বত্র প্রবেশগম্যতা সহকর্মীর ও প্রতিষ্ঠানের মানসিকতার পরিবর্তন আর তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টির কথা বলেন আনিলা।

আনিলা জানান, একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাকরি করছি বলে আমার বিষয়টি আলাদা কিন্তু অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কর্মে জন্য নেই প্রবেশগম্যতা, প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে কাজ করা এবং তাদের কাজে সুযোগ দেওয়ার মানসিকতা নেই। তারপরও নিজের দক্ষতা দিয়ে পাহাড় সমান প্রতিবন্ধিতাকে পেরিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী নারী দৃশ্যমান। এই অবস্থায় আজ ‘কোভিডোত্তর বিশ্বের টেকসই উন্নয়ন,প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হচ্ছে ৩০তম আন্তর্জাতিক ও ২৩ তম জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস।

Manual4 Ad Code

প্রতিবন্ধী নারীরা কাজ করছেন কোথায়

Manual5 Ad Code

আশরাফুন নাহার মিষ্টি একটি প্রতিবন্ধী নারী উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক। তিনি সংবাদ মাধ্যমকে জানান, প্রতিবন্ধিতার কারণে তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া হয়নি। কারণ তিনি যে বিষয়ে ভর্তি হয়েছেন সে বিষয়ের ক্লাস হয় ৩য় তলায়। এই ভবনের কোন লিফট নেই। যখন চাকরির জন্য চেষ্টা করেন তখন প্রতিবন্ধী হওয়ার করণেই লিখিত পরীক্ষায় মেধার স্বাক্ষর রেখেও ভাইভা পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি পাননি।

Manual5 Ad Code

মিষ্টি জানান, সরকারের ১ম ও ২য় শ্রেণিতে এক শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা এবং ৩য় ৪র্থ শ্রেণিতে এতিমদের সঙ্গে ১০ শতাংশ কোটা আছে। কিন্তু প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং চাকরির ক্ষেত্রের পরিবেশ, যানবাহন, সবক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী নারীর জন্য প্রবেশগম্য না হওয়ায় এই কোটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পূরণ হয় না।তবে প্রতিবন্ধী নারীরা আজ নানা প্রতিবন্ধকতাকে অগ্রাহ্য করে কাজে যোগ দিচ্ছে।

কেয়া গ্রুপে কাজ করছে এক হাজার প্রতিবন্ধী নারী-পুরুষ। সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর প্রতিবন্ধীদের কর্ম সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্যে দক্ষতা উন্নয়ন-এ কাজ করছে।

তিনি জানান, ইউনিসেফের গবেষণা মতে এক শতাংশ প্রতিবন্ধী নারী পড়াশোনা করছে আর কর্মে প্রবেশ করছে এক শতাংশের কম। অবস্থা কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন-এর পরিকল্পনা সমন্বয়ক নাজরানা ইয়াসমিন হিরা।

হিরা বলেন, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে অর্ন্তভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। সরকার ২০১৩ সালে প্রতিবন্ধী অধিকার সুরক্ষা আইন এবং একই বছর নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅ্যাবিলিটি সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন করেছে। দুটি আইনই প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সুরক্ষা ও অধিকারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ। যোগ্যতা থাকলে শুধু মাত্র প্রতিবন্ধিতার করণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না।

হিরা জানান, তার প্রতিষ্ঠান ৬০০ প্রতিবন্ধী নারীর কাজের সুযোগ করার কাজ করেছে। তার জানা মতে, গার্মেন্টস সেক্টরে কাজ করছে ৬০০ প্রতিবন্ধী নারী। সিআরপিরি মাধ্যমে বাংলাদেশ টেকনিক্যাল এডুকেশন-এর আওতাভুক্ত হয়ে ইন্ড্রাট্রিয়াল সুইং মেশিন অপারেটর শিক্ষা নিয়ে কাজ করছে তারা।

Manual1 Ad Code

আছেন প্রতিবন্ধী নারী উদ্যোক্তাও

অ্যাকসেস বাংলাদেশ-এর সহকারী প্রতিষ্ঠাতা মহুয়া পাল নিজেও একজন প্রতিবন্ধী হয়ে কাজ করছেন প্রতিবন্ধীদের ভাগ্য বউন্নয়নে। তিনি জানান, অনেক শিক্ষিত প্রতিবন্ধী নারীরা আজ নিজেরা যেমন আত্মকর্ম সংস্থান করছেন, তেমন অন্যদের জন্য কর্ম সংস্থান সৃষ্টি করে উদ্যোক্তা হচ্ছেন।

নিজের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে মহুয়া বলেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা কারিগরি শিক্ষা নিয়ে অনলাইনে কাজ করে। করোনা তাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। জান্নাতুল ফেরদৌস, মিতা, শেফালী প্রতিবন্ধী নারী হয়ে আজ নারী উদ্যোক্তা, অন্যের অনুপ্রেরণা।

তিনি জানান, কোভিডের সময় ই-কর্মাসে যে বিশাল সংখ্যক নারী যুক্ত হয়েছেন তাদের মধ্যে প্রতিবন্ধী নারী উদ্যোক্তারাও আছেন। তিনি বলেন, যারা কাজ করছেন এখন তাদের কাজের পরিবেশ সৃষ্ট করতে হবে।

প্রতিবন্ধী নারীর কর্ম সংস্থানের জন্য কাজ করছে যারা 

সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অফ দ্য প্যারালাইজ্ড (সিআরপি)-এর পুনর্বাসন উইং ম্যানেজার সেলিম রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, তাদের বেশি দক্ষ প্রতিবন্ধী নারীরা কাজ করছেন গামেন্টস সেক্টরে। বিশ্বের ১০টি গ্রিন ফ্যাক্টরির মধ্যে বাংলাদেশে আছে ৭টি। এই সাতটিতে প্রতিবন্ধী নারীদের কাজ করার সুযোগ আছে। বাকি সাড়ে ৪ হাজার ফ্যাক্টরি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য প্রবেশগম্য নয়।

সিআরপি গত ১৪ বছরে ৩ হাজার ৬৯ জন প্রতিবন্ধী নারী দক্ষতা উন্নয়ন করে তারা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লিওনার্ড চ্যাশায়ার-এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার সুরাইয়া আক্তার জানান, প্রতিবন্ধী নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মে প্রবেশ করাতে ‘আই টু আই’ প্রজেক্ট কাজ করছে। এর মাধ্যমে তারা প্রান্তিক প্রতিবন্ধী নারীদের যুক্ত করেন।‘বিডিজবস ডট কম’কে তারা দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রবেশগম্য করেছেন। তাদের সকল প্রকার সুবিধা তার ৪০ শতাংশ নারীকে অর্ন্তভুক্ত করার কথা। এই সুবিধাভোগীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

সরকারের এটুআই প্রকল্পের প্রতিবন্ধী বিষয়ক পরামর্শদাতা ভাস্কর ভট্টাচার্য সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, সরকারের চাকরি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী নারীর সংখ্যা হাজারের কম। প্রতিবন্ধী নারীদের ই-কর্মাসে যুক্ত করতে সরকার তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। দেশের অন্যতম ই-কর্মাস প্ল্যাটফর্ম ‘একশ শপ’এর জন্য ২০০ প্রতিবন্ধী নারী উদ্যোক্তাদের তথ্য সংগ্রহ করে প্রশিক্ষণে আনা হয়েছে। যাদের মধ্যে কয়েকজন ‘একশ শপ’এ পণ্য নিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ প্রতিবন্ধী। তরুণদের ১০ শতাংশ প্রতিবন্ধী। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে এই বিশালসংখ্যক জনশক্তিকে কাজে না লাগালে প্রতিবছর জিডিপির প্রায় ৩ থেকে ৭ শতাংশ ক্ষতি হয়। তাই তাদের জন্য আরও কাজের সুযোগ তৈরি করারা ওপর জোর দেন বিজ্ঞজনেরা।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code