দুই নদীতে ভাঙনের ফলে জোয়ারের পানিতে ডুবে আছে সুন্দরবন

প্রকাশিত:শনিবার, ২৯ মে ২০২১ ০৭:০৫

দুই নদীতে ভাঙনের ফলে জোয়ারের পানিতে ডুবে আছে সুন্দরবন

নিউজ ডেস্কঃ  সুন্দরবনের বাঘের প্রধান খাবার হরিণ, বন্য শূকর, গুইসাপসহ বেশ কয়েক প্রজাতির প্রাণী মে মাসের দিকে বাচ্চা দেয়। এ বছর ঠিক এই সময়ই আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। এই ঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট জোয়ারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভের প্রায় পুরো অংশ পরপর দুদিন ডুবে যায়। এতে শূকর ও হরিণশাবকদের একটি বড় অংশ ভেসে গেছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া বনের রায়মঙ্গল ও আড়পাঙ্গাশিয়া নদীতে তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। এদিকে সুন্দরবনের পুকুরগুলো লবণপানিতে ডোবায় পানির তীব্র সংকটেরও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ভারতের উপকূলে গত বুধবার আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। তবে এই ঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট জোয়ারের পানি ঢুকে পড়েছে বাংলাদেশের কয়েকটি জেলার উপকূলীয় এলাকায়।

বন বিভাগ সূত্র জানায়, গত ১৪ বছরে সুন্দরবনে আঘাত হানা ঝড়গুলোর মধ্যে এবারই বনের বেশির ভাগ এলাকা ডুবেছে। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর, ২০০৯ সালে আইলা ও ২০২০ সালে আম্পানের আঘাতের সময়ও সুন্দরবনে এত উচ্চতায় জোয়ারের পানি প্রবেশ করেনি। সুন্দরবনের পশ্চিম ও পূর্ব এলাকা মিলিয়ে মোট ৩৩টি বন ফাঁড়ি রয়েছে। এসব ফাঁড়ি ও কর্মীদের বাসস্থানে যাওয়ার জন্য তৈরি মাটির সব কটি রাস্তাও এবার জোয়ারের পানিতে ডুবেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১১টি জেটি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হরিণ, বন্য শূকর, গুইসাপসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী এবার কী পরিমাণে বাচ্চা দিয়েছে, তা দেখতে সপ্তাহ দুয়েক আগে বন বিভাগের একটি দল সুন্দরবনে গিয়েছিল। তারা আশাবাদীও হয়েছিল। কিন্তু এখন বন বিভাগ আশঙ্কা করছে, বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর যে বাচ্চাগুলো তারা দেখে এসেছে এবার, তার একটা বড় অংশ জোয়ারে ভেসে গেছে। রক্তচোখাসহ আরও অনেক সরীসৃপজাতীয় প্রাণীও ভেসে গেছে।

স্থানীয় লোকজন জানান, বনের বিভিন্ন ফাঁড়ি ও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোয় গত বৃহস্পতিবার থেকে হরিণের মৃতদেহ ভেসে আসতে শুরু করেছে। এ পর্যন্ত অন্তত চারটি হরিণের মৃতদেহ উদ্ধার করেছেন স্থানীয় লোকজন। তবে বন বিভাগের কর্মীরা গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত কোনো বাঘের মৃত্যুর তথ্য পাননি।

বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে হরিণের মৃতদেহ ভেসে আসার সংবাদ আমরা জেনেছি। আমাদের সুন্দরবনের সব কটি কার্যালয়ের কর্মীদের এর হিসাব তৈরি করতে বলেছি। তবে করমজল বন্য প্রাণী অভয়াশ্রমের সব কুমির সেখানে রয়েছে। একটিও ভেসে যায়নি।’

বন বিভাগ সূত্র জানায়, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে তীব্র জোয়ারে সুন্দরবনের প্রায় পুরোটাই এবার ডুবে যায়। বাগেরহাটের মোংলার কাছে করমজল বন্য প্রাণী অভয়াশ্রমেও ঢুকে পড়েছিল জোয়ারের পানি। শুধু তা–ই নয়, গত বৃহস্পতিবারও জোয়ারের পানিতে ডুবেছে সুন্দরবনের অনেক এলাকা। রায়মঙ্গল ও আড়পাঙ্গাশিয়া নদীর এক পাশে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় ভাঙন দেখতে পেয়েছেন সুন্দরবনে দায়িত্বরত বন বিভাগের কর্মীরা। এ ব্যাপারে প্রধান বন সংরক্ষকের কার্যালয়ে বন বিভাগের কর্মীরা একটি প্রতিবেদনও পাঠিয়েছেন।

এদিকে সুন্দরবনের ভেতরে প্রধান মিষ্টিপানির উৎস ৫৪টি পুকুরের মধ্যে ৫৩টিই লবণপানিতে ডুবেছে। এই পুকুরগুলো দ্রুত লবণপানি মুক্ত না করলে বন্য প্রাণী ও বনকর্মীরা খাওয়ার পানির তীব্র সংকটে পড়বে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

এসব ব্যাপারে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন সংরক্ষক আবু নাসের মো. মোহসিন বলেন, এবার সুন্দরবনে পরপর দুদিন জোয়ারের পানিতে প্রায় পুরো এলাকা ডুবে গেছে। এতে কত প্রাণী মারা গেল, তার কোনো প্রকৃত হিসাব বের করা যাবে না। কারণ, জোয়ার–ভাটার টানে অনেক প্রাণী ভেসে সাগরে চলে যেতে পারে। তীব্র স্রোতে অনেক এলাকায় ভাঙনও দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে লবণাক্ত হয়ে উঠা পুকুরগুলোকে লবণমুক্ত করার চেষ্টা করছি।’

সার্বিক বিষয়ে সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক এবং আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএন, বাংলাদেশের সাবেক কান্ট্রি ডিরেক্টর ইশতিয়াক উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় ইয়াস এবং আগের বছরের আম্পান থেকে আমরা যে ইঙ্গিতটি পেলাম, সেটি হচ্ছে শুধু ঝোড়ো হাওয়া সুন্দরবনের জন্য বিপদ নয়। অতি উচ্চ জোয়ার এবং জলোচ্ছ্বাসও সুন্দরবনকে বিপদে ফেলতে যাচ্ছে। আর এ ধরনের জোয়ারে ভেসে যাওয়া বনের প্রাণীর প্রকৃত হিসাবও বের করা যাবে না। কাজেই এ ধরনের জোয়ার মোকাবিলায় সুন্দরবনের ভেতরে প্রাণীদের আশ্রয়ের জন্য উঁচু ডিবি তৈরি করা উচিত।’

এই সংবাদটি 1,232 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •