নওগাঁয় গাছিরা ব্যস্ত খেজুর গাছের পরিচর্যা ও প্রস্তুতিতে :  ৮৭৩ টন গুড়  উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ

প্রকাশিত:মঙ্গলবার, ০৯ নভে ২০২১ ১০:১১

নওগাঁয় গাছিরা ব্যস্ত খেজুর গাছের পরিচর্যা ও প্রস্তুতিতে :  ৮৭৩ টন গুড়  উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ

 

এম এম হারুন আল রশীদ হীরা;  নওগাঁ:
                                                                     নওগাঁয় গাছিরা  এখন ব্যস্ত  সময় পার করছেন খেজুর গাছের পরিচর্যা ও প্রস্তুতিতে। এবার জেলা কৃষি বিভাগ ১৭৫ হেক্টর জমির বিপরীতে  ৮৭৩ টন গুড়  উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন।
জেলার পোরশা, মান্দা, মহাদেবপুর, রাণীনগর, আত্রাই, নিয়ামতপুরসহ বিভিন্ন উপজেলার গ্রামীণ সড়ক, জমির আইল,বাড়ির পাশ্বে এবং পুকুর পাড়ে সারি সারি খেজুরগাছের ডাল কেটে পরিষ্কার করতে ব্যস্ত এখন সব গাছিরা। তাদের হাতে দা, কোমরে রশি বেঁধে নিয়ে গাছে ওঠে নিপুণ হাতে গাছ তৈরি করছেন। এরই মধ্যে অনেক স্থানে গাছীরা রস সংগ্রহের জন্য গাছে নলি গাঁথাও শুরু করে দিয়েছেন।
দেশের অন্যান্য স্থানের মতো নওগাঁতেও জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। দিনে সূর্যের তাপে ঠান্ডা কম অনুভূত হলেও  রাত বাড়লে পশ্চিমের সামান্য হিমেল হাওয়ায় ও সকালে সূর্য ওঠার আগে  শীতের আমেজ লক্ষ্য করা যায়।
আর শীতকাল মানেই তো মজার মজার পিঠাপুলির উৎসব। বাংলার ঘরে ঘরে এই সময় তৈরি হয় নানা রকম পিঠা- পায়েস, ফিরনী। সেই পিঠার অন্যতম উপাদান খেজুর রসের লালি ও গুড়।
এ ছাড়া খেজুর গুড়ের তৈরি রসগোল্লা, মোয়া- মুড়কি ও সন্দেশ গ্রামসহ শহরের বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের কাছে রসনার তৃপ্তির ঢেকুর তোলে।
শীতের শুরুতে রস সংগ্রহে গাছ তৈরিতে এখন তাই দম ফেলার সময় পাচ্ছেন না এখানকার সব গাছীরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায়  মোট ১৭৫ হেক্টর জমিতে খেজুর গাছ রয়েছে। চলতি বছর এসব গাছ থেকে  প্রায় গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৭৩ মেট্রিক টন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন স্থানে জমির আইল, রাস্তার পাশ এবং পুকুর পাড়ে সারি সারি খেজুরগাছের ডাল কেটে পরিষ্কার করতে ব্যস্ত । হাতে দা, কোমরে রশি বেঁধে নিপুণ হাতে গাছ তৈরি করছেন তারা। এরই মধ্যে অনেকে রস সংগ্রহের জন্য গাছে নলি গাঁথা শুরু করেছেন।
আর ১০-১৫ দিন পরই রস পাওয়া শুরু হবে বলে জানান জেলার একাধিক গাছি। তারা জানান, খেজুরগাছ থেকে রস পাওয়ার জন্য তৈরি করাকে তারা আঞ্চলিকভাবে ‘গাছ তোলা’ বলেন। প্রথমবার গাছ তোলার সাত দিন পরই হালকা কেটে নলি লাগানো হয়। পরে সেখান থেকে রস সংগ্রহ করে থাকেন তারা।
নওগাঁর পোরশা উপজেলার দীঘিপাড়া এলাকার গাছি আবদুল মালেক সেন্টু জানান, এবার তিনি ৫০ টি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতে চান। তাই এখন থেকেই সব গাছে পর্যায়ক্রমে গাছের ডালপালা কেটে পরিস্কার করে কান্ড চেঁচে নলি তৈরি করতে শুরু করেছেন। এক সপ্তাহের মধ্যে এসব গাছ রস তৈরির জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে যাবে। তবে রস পেতে ১০-১২ দিন অপেক্ষা করতে হবে। তিনি প্রায় ৩০/৩৫ বছর ধরে রস সংগ্রহ করে আসছেন। শুরুতে চার আনা আট আনা সের রস বিক্রি করেছেন। এখন ২০-২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে থাকেন।
মান্দা উপজেলার গাড়িক্ষেত্র গ্রামের গাছি গিয়াস উদ্দিন মন্ডল জানান, তিনি নিজ এলাকা ও প্রসাদপুর গ্রামের কিছু খেজুরগাছ তৈরি ও রস সংগ্রহ করেন। এজন্য প্রথমে খেজুরগাছের মাথার অংশকে ভালো করে কেটে পরিষ্কার করা হয়। পরে পরিষ্কার সাদা অংশ কেটে বাঁশের তৈরি একটি ছোট্র নলি বসিয়ে রস সংগ্রহ করা হয়।
অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে তারা কোমরে রশি বেঁধে গাছে ঝুলে রস সংগ্রহ করেন। এবার তিনি নিজের ২টি সহ আরো ৪০-৫০ টি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করবেন।
তবে আগের মতো তাদের এলাকায় খেজুরগাছ পাওয়া যায় না জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক মালিক গাছ কেটে বিভিন্ন ফলদ গাছ রোপণ করেছেন।  নতুন করে গাছ লাগানো হচ্ছে না। প্রকৃতিগতভাবে যেসব গাছ বেড়ে ওঠছে, সেইসব গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতে হয়। তাছাড়া শীতের সময় রস পাওয়া ছাড়া গাছগুলো থেকে তেমন কিছু আর পাওয়া যায় না। এ জন্য খেজুরগাছের সংখ্যা দিন দিন ব্যাপকহারে কমে যাচ্ছে। আবার অনেকে গাছ কেটে বাড়ি নির্মাণে ব্যবহার করেন।
 তিনি আরো জানান, একটি গাছ থেকে সপ্তাহে পাঁচ দিন পর্যন্ত রস সংগ্রহ করা হয়। বাকি দুই দিন গাছ শুকাতে দেয়া হয়। পরে রস সংগ্রহের স্থানের ওপরের বাকল হালকা চেঁচে তুলে হাঁড়ি বসানো হয়।
তিনি আরও জানান, একটি খেজুরগাছ থেকে প্রতিদিন চার কেজির মতো রস পাওয়া যায়। আর ছয় কেজি রস থেকে ১ কেজি গুড় পাওয়া যায়। লালির ক্ষেত্রে ৩ কেজি রসে মেলে মাত্র ১ কেজি।
তিনি জানান, ‘গত বছর গুড় বিক্রি করেছিলাম ৮০-৯০ টাকা কেজি দরে। আর লালি ৭০-৭৫ টাকা কেজি। এবারও যদি দাম একই থাকে বা বাড়ে তবে প্রতিদিন ৬০০-৮০০ টাকার মতো করে তার লাভ  হবে।’
সাংবাদিক ছায়েদ রায়হান মৃধা বলেন, ২৫-৩০ বছর আগে শীতের  সকালে আম্মা গায়ে চাদর বা আব্বার লুঙ্গি গায়ে পেচিয়ে বেঁধে এক মগ খেজুর রস ও রসের মধ্যে মুড়ি দিয়ে বলতেন, রোদে গিয়ে খেয়েনে। আমরা ছোটবেলায় খুব মজা করে সেই রস গোটা শীত মওসুমে খেয়েছি। তবে এখন গাছে পাখির আনাগোনা বেড়ে গেছে। রসের হাঁড়ির মধ্যে পাখিরা পা ডুবিয়ে মল ত্যাগ করে। এজন্য নিপাহ ভাইরাস হয়ে অনেকে মারা যাযন। তাই নতুন করে এ যুগে আর কেউ খেজুর গাছ রোপণের জন্য ইচ্ছুক নন। তবে অনেকে সখের বসে খেজুর খাওয়ার জন্য সৌদির আজওয়া ও মরিয়ম খেজুর গাছ রোপণ করছেন। যদিও এগুলোর দাম সাধারণের নাগালের বাইরে। ৮০০-৯০০ টাকা দাম।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ি নওগাঁর উপপরিচালক কৃষিবিদ শামসুল ওয়াদুদ বলেন, ‘শীত এলেই গাছিরা প্রস্তুতি নেন। গাছের উপরিভাগের নরম অংশে চাঁছ দিয়ে রস নামানো হয়। একবার গাছে চাঁছ দিলে ২-৩ দিন রস পাওয়া যায়।
‘সাধারণত খেজুরগাছ পূর্ব ও পশ্চিম দিকে কাটা হয়, যাতে সূর্যের আলো সরাসরি ওই কাটা অংশে পড়তে পারে।’
তিনি জানান, জেলায় ১৭৫ হেক্টর জমিতে খেজুরগাছ রয়েছে। সেই হিসাবে গাছের সংখ্যা প্রায় ৮ হাজারের মতো। চলতি বছর ৮৭৩ টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে গত বছরের চেয়ে এবার গাছের সংখ্যা কমেছে। কৃষি অফিস থেকে গাছিদের মাঠপর্যায়ে খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ ও ভালোমানের লালি বা গুড় উৎপাদনের বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

এই সংবাদটি 1,225 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ