নারী, তোমার চলার পথ…

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual8 Ad Code

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, সেনা, নৌ, পুলিশ, বিজিবি, সাহিত্য, শিল্পসহ সর্বোচ্চ বিচারিক কাজেও নারীদের অংশগ্রহণ ও সাফল্য এখন লক্ষণীয়। আমাদের নারীরা খেলাধুলায়ও পিছিয়ে নেই। প্রথম নারী উপাচার্য, প্রথম নারী পর্বতারোহী, প্রথম বিজিএমইএ নারী সভাপতি, প্রথম সংখ্যালঘু নারী মেজর, প্রথম নারী স্পিকার, প্রথম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিগত এক দশকেই সৃষ্টি হয়েছে। নারীদের এই অভূতপূর্ব ক্ষমতায়নে অংশগ্রহণের সুযোগ ও অনুপ্রেরণার যিনি প্রথম ভাগীদার, তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এই সময়ে পরিবর্তন এসেছে নারীর অবস্থা ও অবস্থানেও। বর্তমানে সমাজের প্রায় সব খাতেই নারীর অংশগ্রহণ দৃশ্যমান হচ্ছে। শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে মেয়েদের উপস্থিতি এখন শতভাগ। পোশাক শিল্পের কৃতিত্বের সিংহভাগই নারীর। এর পাশাপাশি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড়ো অংশই নারী। পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে সরকারি-বেসরকারি ও আধাসরকারি অফিস-আদালত, কলকারখানা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল-ক্লিনিক এবং বড়ো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মতো আনুষ্ঠানিক কর্মস্থলেও। সরকার পরিচালনায়, রাজনীতিতে, প্রশাসনে, সামরিক বাহিনীতে, আইনশৃঙ্খলা বিভাগেও নারীর অবস্থান ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছে। এসব পরিবর্তনের ছাপ পড়েছে পথেঘাটেও। কারণ চার দেওয়ালের বাইরে নারীর চলাফেরা এখন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

Manual1 Ad Code

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশই যেখানে নারী, সেখানে অগ্রগতি দৃশ্যমান হচ্ছে খুব অল্পসংখ্যক নারীর মধ্যেই। আমাদের সিংহভাগ নারী এখনো এসব লক্ষণের বাইরে অবস্থান করেন, যাদের তথ্য ও শিক্ষায় অভিগম্যতা নেই, যাদের শ্বশুরবাড়িতে অনেকটা ‘পরবাসী’ হয়ে জীবনযাপন করতে হয়, যারা নিজের সিদ্ধান্তে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন না এবং নিজের বস্তুগত ক্ষমতার পরিসর স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে বাধাগ্রস্ত হন।

মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, ‘আমরা নারীর ক্ষমতায়ন রাজনীতিতে দেখতে পাচ্ছি। কিছু উঁচু পদে তাদের অবস্থান আছে। কিন্তু এটা কোনো সার্বিক চিত্র নয়। জেন্ডার ইকুয়ালিটি বলতে সবক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ, সুবিধা আর অধিকারকে বোঝায়। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য প্রধানত দরকার অর্থনৈতিক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। এই দুটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের নারীরা পিছিয়ে আছে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে মালেকা বানু বলেন, ‘বাংলাদেশে নারীদের ইতিবাচক অগ্রগতি আছে। কিন্তু সেই অগ্রগতি এখনো নারীকে পুরোপুরি স্বাধীন করতে পারেনি। নারী এখনো ঘরের মধ্যে বন্দি। বিচার, সহিংসতা, নির্যাতন প্রশ্নে নারী এখনো অবহেলার শিকার। প্রগতি বা উন্নয়ন সরল পথে হয় না। বাংলাদেশের নারীরা এখনো মজুরি বৈষম্যের শিকার। চাকরির ক্ষেত্রে সমতা নাই। নাই অর্থনৈতিক সমতা। তবে আমরা আশা করি এসব ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের নারীরা এগিয়ে যাবে।’

Manual3 Ad Code

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের সবচেয়ে বড়ো প্রতিবন্ধকতাটি এখনো নারীবিরোধী নেতিবাচক সমাজ মনস্তত্ত্ব। আমাদের সমাজে এখনো প্রচলিত যে, নারীর প্রাথমিক কাজ ঘর-সংসার দেখে রাখা, স্বামী-শ্বশুরের খেদমত করা। এ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনোর আগে-পরে শিক্ষায় ইতি টানতে হয় এবং বয়স হওয়ার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। সম্প্র্রতি বাল্যবিয়ে বন্ধে আইন প্রণীত হয়েছে। কিন্তু আইনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে নানা কারসাজি করে এখনো যে বাল্যবিয়ে হচ্ছে, তা ঐ নারীর ক্ষমতায়নবিরোধী সমাজ মনস্তত্ত্বের কারণেই।

ক্ষমতায়ন হচ্ছে—মানুষের বস্তুগত, দৈহিক, মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ওপর স্বনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, যার সঙ্গে দক্ষতার প্রশ্নটি জড়িত। কাজেই নারীর ক্ষমতায়ন বলতে এমন এক ধরনের অবস্থাকে বোঝায়, যে অবস্থায় নারী তার জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বাধীন ও মর্যাদাকর অবস্থায় উন্নীত হতে পারে। এটি একটি প্রক্রিয়া, যার মানে হলো—একদিনে হঠাত্ করে কারো ক্ষমতায়িত হয়ে ওঠার সুযোগ নেই। এজন্য দীর্ঘ ও অব্যাহত উদ্যোগ দরকার হয়। নারীর ক্ষমতায়নের আওতাকে প্রধানত সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক- এই তিন ভাগে দেখানো হয়। অবশ্য আইনগত, তথ্যগতসহ আরো কয়েক ধরনের ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গ উঠে এলেও মোটা দাগে উল্লিখিত তিন ধরনের ক্ষমতায়নের আওতায়ই সব চলে আসে। সাম্প্র্রতিক বছরগুলোয় অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। অগ্রগতি হয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকেও। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অর্জনের মান নিয়ে নিকট অতীতেও কিছু প্রশ্ন ছিল, সম্প্র্রতি প্রশ্নটি আরো জোরালো হয়েছে।

অধিক জনসংখ্যার বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের একটি দ্রুত উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। বিশ্বের অষ্টম অধিক জনসংখ্যার এই দেশে প্রয়োজনের তাগিদে নারীরা ঘর থেকে বের হয়েছেন। বিভিন্ন কলকারখানা, অফিস-আদালতে নারীর একটি বিশাল অংশ নিজেদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে নিয়েছেন। যেখানে ২০১০ সালে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৬২ লাখ, সেখানে ২০১৭ সালে এর সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ১ কোটি ৮৬ লাখে।

Manual1 Ad Code

দ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী, নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে ১৪৪টি রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭তম। এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় নারীর ক্ষমতায়নের দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে আছে। এক্ষেত্রে ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান ও পাকিস্তানের অবস্থান যথাক্রমে ১০৮, ১০৯, ১১১, ১২৪ ও ১৪৩তম। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে এই সূচকের উন্নয়ন আশার সঞ্চার করে।

বিভিন্ন সূচকের ওপর ভিত্তি করে নারীর ক্ষমতায়ন ঘটে থাকে। ভৌগোলিক অবস্থান, বয়স, অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা, মিডিয়া এক্সপোজার ইত্যাদির ওপর নারীর ক্ষমতায়ন নির্ভর করে। এগুলোর ওপর নির্ভর করে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ, আত্মপ্রত্যয় ও গতিশীলতা। ক্ষমতায়নের সঙ্গে নারীর সুযোগ-সুবিধা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে নারী নিজের জন্য অধিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারছেন, তাকে আমরা ক্ষমতাবান নারী বলতে পারি। এই সুযোগ-সুবিধাগুলো আবার হতে পারে বস্তুগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক, মানবিক, তথ্যগত, মনস্তাত্ত্বিক ইত্যাদি, যা মানুষ তাদের লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োগ করে থাকে। পরিবার থেকেই নারীকে সম্মান ও আত্মমর্যাদা নিয়ে বেড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে, যাতে সে আত্মনির্ভরশীল হয়ে গড়ে উঠতে পারে। এ বিষয়ে মা-বাবা বিশেষ নজর দিলে অবশ্যই একজন নারী সমতার ভিত্তিতে ক্ষমতার দিকে এগিয়ে যাবেন। নারীর উন্নয়ন ঘটলেই একটি জাতির উন্নয়ন ঘটা সম্ভব।

নারীর ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন কোনো বাধা বা সীমাবদ্ধতা ছাড়াই নারীরা শিক্ষা, কর্মজীবন এবং নিজেদের জীবনধারায় পরিবর্তন আনার জন্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধাগুলো ব্যবহারের সুযোগ পান। নারীর ক্ষমতায়নই হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ও সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম চাবিকাঠি।

Manual1 Ad Code

দেখা যাচ্ছে, সংসারের প্রাপ্তি ও জমার ওপর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাখেন কেবল ৯ দশমিক ৫ শতাংশ নারী। ১ কোটি ৮৬ লাখ নারী সরাসরি অর্থ আয়ের সঙ্গে জড়িত থাকলেও মাত্র ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ নারী তার নিজস্ব আয়কৃত অর্থ ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন। ইচ্ছা হলেই যে একজন নারী পছন্দের কিছু কেনাকাটা করবেন, এটা খুব কমসংখ্যক নারীর ভাগ্যে জোটে। সিংহভাগ নারীর কেবল গৃহ ও সন্তানের স্কুলের মধ্যে চলাচল সীমাবদ্ধ থাকে। কেবল ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ নারী বাইরে বেরিয়ে সর্বসাধারণের সঙ্গে কথা বলা ও মেলামেশা করতে পারেন। জনগণের সামনে কথা বলার সুযোগ বা অধিকার খুব কম নারীরই আছে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code